বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪
Online Edition

দেশে আবার বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা 

 

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের অন্যান্য স্থানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির আভাস মিললেও উত্তরাঞ্চলে ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার এমন পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানির সমতল হ্রাস পাচ্ছে, যা অব্যাহত থাকতে পারে।

গঙ্গা নদীর পানির সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে পদ্মা নদীর পানির সমতল স্থিতিশীল আছে। আগামী তিনদিন উভয় নদীর পানির সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীসমূহের পানি সমতল সার্বিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী দুই দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে আগামী তিনদিনে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এতে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদী সংলগ্ন নি¤œাঞ্চলের বন্যার পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে আগামী একদিনে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীর পানির সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে, ফলে ধরলা ও দুধকুমারের পানির সমতল কিছু পয়েন্টে বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হতে পারে।

আগামী তিনদিনে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীর পানির সমতল সময় বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আত্রাই নদীর পানি সমতল বাঘাবাড়ী পয়েন্টে হ্রাস পেয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার নি¤œাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিও উন্নতি হতে পারে। একই সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন নি¤œাঞ্চলের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। 

টাঙ্গাইলে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত 

টাঙ্গাইলে যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৯ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এখনও নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি কোথাও অপরিবর্তিত আবার কোথাও অবনতি হয়েছে।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্যমতে, ঝিনাই নদীর পানি জোকারচর পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৯১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি পোড়াবাড়ি পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, ধলেশ্বরী নদীর পানি এলাসিন পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্য সব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। এ কারণে জেলার কয়েকটি উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদের বাড়ি-ঘর, হাট-বাজার, ফসলী জমিসহ অন্যান্য স্থাপনা এখনও বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে।

জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য মতে, জেলার ৬টি উপজেলার ৪৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ফটিকজানি নদীর পানি নলচাপা ব্রিজ পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার, বংশাই নদীর পানি কাউলজানী পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার, মির্জাপুর  পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার, মধুপুর পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, এসব নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

অপরদিকে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, দেলদুয়ার, নাগরপুর ও বাসাইল উপজেলার ৫ টি গ্রামীণ সড়ক বন্যার পানিতে ভেঙে নতুন নতুন কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল রাতে বাসাইল উপজেলার আন্দিরাপাড়া এলাকায় একটি গ্রামীন সড়ক ভেঙে গেছে। ফলে ওই এলাকার মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনে বন্যার পানিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় সাড়ে ৬ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এছাড়াও যমুনাসহ তিনটি নদীর পানি কমতে শুরু করলেও নদীর তীরবর্তী নি¤œাঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বর্তমানে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গো খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. কায়ছারুল ইসলাম জানান, এবছর বন্যায় যেসব মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন তাদের পাশে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।

বন্যার পানি কমছে 

দীর্ঘদিন পানিতে থাকায় অনেকের পায়ে ঘা ধরেছে

গাইবান্ধা থেকে জোবায়ের আলী: গাইবান্ধায় সবকটি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। পানি কমলেও গাইবান্ধা সদরসহ সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চল ও নি¤œাঞ্চলের বন্যা কবলিত মানুষদের দুর্ভোগ এখনও কমেনি। তবে সবগুলো নদীর পানি বিপদসীমার নিচে নামলেও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি এখনও বিপদসীমার ৪৬ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার বন্যা কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদী তীরবর্তী এলাকার রাস্তা-ঘাট ও বেশিরভাগ বাড়ি-ঘর ও উঠান থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। তবে পানি নেমে গেলেও অনেক বাড়ির আঙ্গিনায় কাঁদা দেখা গেছে। রাস্তা-ঘাটগুলো কদমাক্ত। ফলে ওইসব এলাকার মানুষ এখন চলাফেরা করতে ভোগান্তিতে রয়েছেন। তবে একেবারেই নিচু এলাকার বাড়ি-ঘরগুলোতে এখনও পানি রয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক যাদের জীবন-জীবিকা চরম বেকায়দায় পড়েছেন তারা। পানি নেমে গেলেও বন্যার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়ায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন দিনমজুর এই পরিবারগুলো। বন্যাকবলিত এসব মানুষের জন্য বরাদ্দ দেয়া ত্রাণও জোটেনি বলে অভিযোগ ছিল এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষের।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাট এলাকার তারাজুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়িতে পাঁচদিন ধরে বন্যার পানি ছিল। গত দুই-তিন দিন ধরে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে পানি কমলেও আমাদের দুর্ভোগ কিন্তু কমেনি। তিনি আরও বলেন, বন্যা এসে কর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। আয়-রোজগার না থাকায় অনেক কষ্ট করে দিন যাচ্ছে। পাঁচদিন পানিতে ডুবে থাকলাম কোনো মেম্বার-চেয়ারম্যান খোঁজ নেয়নি।

একই এলাকার সাহেরা বেগম বলেন, বেশিরভাগ বাড়ি থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও আমার বাড়ি থেকে এখনো পানি নেমে যায়নি। পানিতে থাকতে থাকতে পায়ে ঘা ধরেছে। আমরা গরিব মানুষ কোনো ত্রাণ পায়নি।

কামারজানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বলেন, চারদিন থেকে পানি কমে বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে এখনো চরাঞ্চলের বেশ কিছু বাড়ি ঘরে পানি রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩৬৫ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ৯ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তা বিতরণ করা হয়েছে। এনজিওরাও সহযোগিতা করেছে।

গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ হাফিজুল হক বলেন, চলমান বন্যায় সদর, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলার ২৯টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। গত চারদিন থেকে পানি কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আশা করা যায় আগামী সপ্তাহেই বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ