বুধবার ২৪ জুলাই ২০২৪
Online Edition

হাসলো চড়ুই ছানা

আব্দুস সবুর

ভারী সুন্দর এক বন। সবুজ গাছগাছালিতে ভরা। কত ধরনের যে পশুপাখি থাকে এ বনে! সুঠাম দেহের সিংহ, লম্বা শিংওলা হরিণ, বাঘমামা, পণ্ডিত শেয়াল আরও কত পশু! পাখিদের মধ্যে রয়েছে দোয়েল, শালিক, কোকিল, টিয়া আরও নাম না জানা কত পাখি! এ বনের গর্তেও থাকে ছোট বড় নানান প্রাণী। যেমন পিপীলিকা, সাপ, ইঁদুর , উঁইপোকা ইত্যাদি । আরও আছে বাহারি ফুলের মেলা। হলুদ গাদা, রক্ত গাদা, কমলা গাদা, মিষ্টিগোলাপ ও সন্ধ্যামালতি। ঐ যা ভুলেই গেছি! এ বনে আরও একজন থাকে । আর সে হলো ছোট্ট ছানা চড়ুই। চিনলে না বুঝি! ওই যে সবার মন জয় করতে পারত নিমিষেই যে ছানাটি! ওর নামই তো চড়ুই। সে-ই তো মাতিয়ে রাখত সারা বন। সবসময় থাকত হাসিখুশি। ওর সামনে কেউ মন খারাপ করে থাকতেই পারত না। কারো মন খারাপ হলে ঠিকই তার মন ভালো করত। বনের সবার খোঁজখবরও নিত সে । কেউ অসুস্থ হলো কিনা সে ব্যাপারে খুব খেয়াল রাখত। ঐ তো সেদিন এক শালিক ছানা জ্বরে মরে যাচ্ছিল যাচ্ছিল অবস্থা । তাকেও সুস্থ করে তুলেছিল এই ছোট্ট চড়ুই ছানাটিই। সবাই ওকে ভালোবাসে খুব করে। ঠিক যেমন ও সবাইকে ভালোবাসে। কিন্তু এখন আর চড়ুই ছানাটি আগের মতো হাসিখুশি থাকে না। কথা বলে না মুখ ফুটে। সবসময় মন খারাপ করে থাকে। কখনও আবার কাঁদেও। সেদিন এক কোকিল এসেছিল চড়ুই এর কাছে। একটুখানি কথা বলবে বলে কত উড়ল ওর পাশে পাশে! কিন্তু চড়ুই? একটুখানি সাড়াও দিল না । মিষ্টি কোকিলের দিকে চেয়েও দেখল না ওকে । হঠাৎ করেই কেন বদলে গেল চড়ুই ছানাটা? তবে কেন সে অমন মন খারাপ করে থাকে সবসময় ? হাসে না মন খুলে? কথা বলে না মুখ ফুটে? কেনই বা থাকবে না সে অমন মন খারাপ করে? এই তো গত সপ্তাহে শনিবার দিন। ঐদিনটায় তো পাল্টে দিল ওকে। 

 সেদিন বিকেলে ওর মা যখন খাবার খুঁজে নিয়ে বাসায় ফিরছিল! তখনই তো ঘটল দুর্ঘটনাটি। কয়েকটি হিংস্র শকুন এসে ঠুকরে ঠুকরে মেরেই ফেলল ওর মাকে । কে জানে কী দোষ করেছিল ওর মা! বিনা দোষেই এমন জুলুম করল হিংস্র শকুনের দল। কত আদর যতœ করত মা ওকে! নিজ হাতে খাইয়ে দিত, ঠিক মতো গোসল করিয়ে দিত। আরও কত খোঁজ-খবর রাখত ওর! মা মারা গেলে কার আবার মন খারাপ থাকে না বলো? তাইতো মন খারাপ ছোট্ট চড়ুই ছানার। কিন্তু চড়ুই ছানা অমন মন খারাপ করে বসে থাকলে যে পুরো বনটাকেই মরা মরা লাগে। না, না। যে করেই হোক চড়ুই ছানার মন ভালো করতেই হবে। মনে মনে ভাবল মিষ্টি কোকিল। বিকেলে বনের সব পশুপাখিরা পরামর্শে বসল। কে ভালো করতে পারবে চড়ুই ছানার মন? সবাই নিজ নিজ মত প্রকাশ করল। কেউ বলল, চালাক শেয়ালকে এ দায়িত্ব দেয়া হোক। কেউ বলল, বাঘমামা ভালো পারবে এ কাজ। কেউ বলল, টিয়ে পাখির কথা। কেউ আবার দুষ্ট ইঁদুরের কথাও বলল। অবশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হল টিয়ে পাখিই যাবে চড়ুইয়ের মন ভালো করতে। সেমতে পরদিন সকালে টিয়েপাখি গেল চড়ুই ছানার কাছে। দেখল আগের মতোই সে মন খারাপ করে বসে আছে। টিয়েপাখি বলল, এই যে চড়ুই মা। আর কত মন খারাপ করে থাকবে হ্যাঁ? চড়ুই কোনো সাড়া দিল না। টিয়েপাখি এবার বলল, দেখ চড়ুই মামণি! এই পৃথিবীতে কেউ চিরদিন বাঁচে না। সবাইকে একদিন না একদিন ঠিকই চলে যেতে হয় পৃথিবী ছেড়ে। আজ তোমার মা'র মৃত্যুতে এত ভেঙে পড়ছ কেন তুমি ? এই যে আমার দিকে তাকাও, আমার মাও কিন্তু বেঁচে নেই। চলে গেছেন পরপারে। তখন আমি তোমার থেকেও ছোট। আমি কিন্তু তোমার মতো এত হতাশ হইনি। ধৈর্য ধারণ করেছিলাম। তাহলে তুমি কেন এত হতাশ হচ্ছ বল? চড়ুই ছানাটি একটুখানি মাথা উঠাল এবার। টিয়েপাখি বলেই যাচ্ছে । এই যে গত রবিবারেই তো শালিকছানার মা' মারা গেল। তোমার মায়ের মৃত্যুর ঠিক একদিন পরে। কই সে তো এখন ঠিকই মন খুলে হাসে। সে তো তোমার মতো ধৈর্যহারা হয়নি? তাহলে তুমি কেন এত মন খারাপ করে থাকবে? দেখ চড়ুই তুমি হাসিখুশি থাকলে পুরো বন হাসিখুশি থাকে। প্লিজ একটু হাসো মামুনি। এবার মন ভালো হলো চড়ুইয়ের। সে বুঝতে পারলো টিয়েপাখি যা বলছে ঠিকই বলেছে। তাই চড়ুই ছানা আর মন খারাপ করে থাকল না। হেসে উঠল মন খুলে। মুখ ফুটে কথাও বলল। সারা বনজুড়ে আবার সুখ ফিরে এল। এখন সবার মন আনন্দে ভরপুর। সবাই ধন্যবাদ জানাল টিয়েপাখিকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ