বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪
Online Edition

স্মৃতিঘেরা স্কুলবেলা

হাবিবুর রহমান 

এই তো সেদিনের কথা, যা এখনও স্মৃতিতে দোল খায়। মায়ের হাতটি ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্কুলে যাওয়ার মুহূর্তটা। আমার যেন দ্বিতীয়বার জন্ম হয়েছিলো তখন। নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ; সবকিছুতে খুব আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম। সেই ছেলে বেলার স্কুল জীবন ছিলো আনন্দের ছোট্ট বাগান। যা ছিলো মধুতে ভরপুর। 

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়েও সেই ছোট্ট বেলার স্মৃতিগুলো মনে দাগ কেটে যায়। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। এক হাতে খাতা বই আর অন্য হাতে লাটিম, মার্বেল পাথর, পটকা নিয়ে স্কুলে যাওয়া। ম্যামের বকুনির ভয়ে সেসব ক্লাসের বাইরে রেখে ক্লাস করা। ছুটির ঘন্টা বাজতেই ঊর্ধ্বশ্বাসে সেসব নিয়ে বাড়ির পানে ছুট দেওয়া। মায়ের শাসনের ভয়ে খেলনাগুলো স্কুল ব্যাগে লুকিয়ে রাখা ছিলো অভিনয় এক পদ্ধতি।

বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রথম বেঞ্চে বসার প্রতিযোগিতা, একসাথে মারামারি, হুড়োহুড়ি। ছিলো অবাধ স্বাধীনতা, তবে ছিলো না কোন স্বেচ্ছাচারিতা। প্রকৃতির রাজ্যে বিচরণ ছিলো আমার ছেলেবেলার আনন্দ। স্কুল পালিয়ে ধানক্ষেত মাড়িয়ে ছুটতাম ঘুড়ি উড়িয়ে দিগন্তের ওপারে। তালগাছের ডোঙ্গায় বা কলাগাছের ভেলায় ভাসতাম পাল্লা দিয়ে। পরের দিন সালাম স্যারের ক্লাসে শাস্তির ভয়ে বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করাতাম। কখনো বা গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ধরাতাম। কখনো বা নানি দাদির মৃত্যু নিয়ে উপস্থিত হতাম। 

পরীক্ষার আগের দিনে মায়ের বকুনি খাওয়া সত্ত্বেও সেই সন্ধ্যা পর্যন্তই খেলাধুলায় মত্ত থাকা। সন্ধ্যার পরেই হাত পা ধুয়ে মায়ের পাশে বসে পড়তাম বই নিয়ে। মা তার নকশিকাঁথার গাঁথুনির ফাঁকে ফাঁকে তদারকি করতো আমার পড়াশোনার। পরের দিন পরিপাটি করে ফুল বাবুটির ন্যায় স্কুলে নিয়ে যেত মা। আমার থেকে মায়ের উদ্বিগ্ন বেশি, পরীক্ষা কেমন হবে আমার! ফল প্রকাশের খবরটা মা-ই আগে পেতো। আমি বরাবরই ছাত্র হিসেবে মোটামুটি ভালো ছিলাম। তাই মায়েরও বিশ্বাস ছিলো আমার রেজাল্ট ভালো হবে। হতোও তাই। 

জ্যৈষ্ঠের দিনে গ্রামীণ স্কুলগুলো ফুলে ফলে ভরে উঠে, চারিদিকে মৌ মৌ করে। তখন স্কুল পালিয়ে আম লিচুর বাগান, বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো ছিলো স্কুল জীবনের অন্যতম সেরা একটা আনন্দের মুহূর্ত। তাই তো এ বয়সেও এসে বলতে হয়,,

মনে পড়ে সেই জ্যৈষ্ঠের দিনে পাঠশালা পলায়ন!!

সে দিন চলে আমার অতীতের কোলে, সোনালী সূর্য হয়ে। এখনও যেন তার রশ্মি লেগে আছে আমার অন্তর দেহ, গায়ে। আমার স্কুলবেলা ছিলো সোনায় মোড়া। স্বর - ব্যঞ্জন এখনও লেগে আছে ঠোঁটে, যে স্বাদ অমৃত। সে ছুটির ঘন্টা, যার জন্য প্রতীক্ষা করতাম অনুক্ষণ। আমি ছুটে যেতে চাই সে শৈশবে, আমার স্কুলজীবনে। সে স্বেচ্ছাচারহীন অবাধ স্বাধীনতায়। সে শিক্ষকের পদতলে, যার বেতের ভয়ে থাকতাম জড়োসড়ো হয়ে। যেখানে স্কুল পালিয়ে নদীতে মাছ ধরায় আনন্দ খুঁজে পেতাম। স্কুলের পাশেই করিম চাচার লিচুর বাগানে পাখির মতো বিচরণ করতাম। বাঁদুড় হয়ে কেটে কুটিকুটি করে দিতাম অপরিপক্ক লিচু। 

কথায় আছে, যা গেছে তা কি আর আসে ফিরে! আমার স্কুলবেলাও গেছে সে অতীতের পানে, তার স্মৃতি জেগে ওঠে বর্তমানে। মুহূর্ত অতীত হলেও স্মৃতি বর্তমান। আমি বর্তমানেই আমার সেই ছেলেবেলার স্কুল পালানোর স্মৃতিকে খুঁজে ফিরি। যা আমায় দেয় নিষ্পাপ সুখ, অনাবিল আনন্দ। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ