শুক্রবার ২৪ মে ২০২৪
Online Edition

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ চায় যুক্তরাষ্ট্র-ডোনাল্ড লু

গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক শেষে মিডিয়ায় ব্রিফিং করেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্র সচিব ডোনাল্ড লুু -সংগ্রাম

 

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল তা যুক্তরাষ্ট্র কাটাতে চায় বলে জানিয়েছেন ঢাকায় সফররত দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। বিশ্বাসের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে চান জানিয়ে লু বলেছেন, আমরা আর পেছনে তাকাতে চাই না, সামনে এগোতে চাই। এদিকে বৈঠকে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু’র সঙ্গে র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে কথা হয়েছে। সেটি আমাদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছিল। এটি প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে এটির প্রক্রিয়াটি একটু লম্বা।

গতকাল বুধবার বিকেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর বিফ্রিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। ডোনাল্ড লু বলেন, আমরা চেয়েছিলাম বাংলাদেশে একটি অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। নির্বাচনের আগে এসব বিষয় চিন্তায় থাকলেও আমরা এখন সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করতে চাই। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে চাই। আমরা পেছনে ফিরে তাকাতে চাই না। গত বছর বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অস্বস্তি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। আমরা এখন সামনের দিকে তাকাতে চাই, পেছনে নয়। লু জানান, এই সফরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক ও আস্থা নতুন করে তৈরি করতে এসেছেন।

ডোনাল্ড লু বলেন, গত দুদিন আমি বাংলাদেশ সফর করছি। দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতেই আমার এ সফর। গত বছর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অনেক উত্তেজনা ছিল। এখানে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। এখন আমরা নতুন একটি অধ্যায় প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে আমরা একটি উপায় বের করতে চাচ্ছি। সম্পর্কের অস্বস্তিকর বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতেই আমি আজ মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমাদের মধ্যে অনেকগুলো অস্বস্তিকর বিষয় আছে, র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, শ্রম আইন সংশোধন, মানবাধিকার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কার ইত্যাদি। লু বলেন, অস্বস্তিকর বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি আমরা ইতিবাচক বিষয়গুলো নিয়েও সহযোগিতা বাড়াতে চাই। আমরা নতুন বিনিয়োগ নিয়ে কথা বলেছি। বাংলাদেশের আরও বেশি শিক্ষার্থী যাতে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিয়েও কথা বলেছি। কীভাবে এ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা যায়, তা বলেছি। তিনি বলেন, এ ছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে কীভাবে একসঙ্গে লড়াই করতে পারি, মন্ত্রীর সঙ্গে সে বিষয়ে আমি আলাপ করেছি। সরকারে স্বচ্ছতা ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়াতে অনেক কাজ করার বাকি আছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে সে সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আছে। যেমন র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, শ্রম আইনের সংস্কার, মানবাধিকার এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কার। এ সম্পর্ক জোরদার করার জন্য আমাদের ইতিবাচক দিক নিয়ে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। লু বলেন, আমরা নতুন বিনিয়োগের কথা বলেছি। অধিক সংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করবে, এটা নিয়ে আলোচনা করেছি। ক্লিন এনার্জি নিয়ে কথা বলেছি। সর্বশেষ যে বিষয়টি নিয়ে আমি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি, সেটা হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হবে। আমরা যেটা করতে পারি সরকারের স্বচ্ছতা, সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার মাধ্যমে। আমরা করসীমা বাড়ানোর কথা বলেছি, যাতে বাংলাদেশ সেখান থেকে উপকৃত হতে পারে। এর আগে বিকেল সোয়া তিনটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেন লু। এরপর বিকেল সাড়ে তিনটায় বৈঠক শুরু হয়। আধাঘণ্টার বেশি সময় চলে বৈঠক। পরে তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। 

এর আগে দুপুরে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। এছাড়া সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গেও বৈঠক করেন ডোনাল্ড লু। বৈঠক শেষে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, সামনের দিকে সম্পর্ককে কীভাবে আরও সুদৃঢ় করব সেটা নিয়ে ডোনাল্ড লুর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিন দিনের সফরে গত মঙ্গলবার ১৪ মে ঢাকায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। 

ঢাকা সফরের প্রথম দিন তিনি প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দেওয়া এক নৈশভোজে যোগ দেন। এদিন তিনি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন। সফরের দ্বিতীয় দিন বুধবার তিনি প্রথমে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ও পরে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। পরে তিনি বসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সফর করবেন ডোনাল্ড লু। তার এই সফরের মাধ্যমে দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হবে বলে প্রত্যাশা করছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র যে একটি মুক্ত, অবাধ ও সমৃদ্ধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল দেখতে চায়, ডোনাল্ড লু’র সফরে সেটাই গুরুত্ব পাবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে দেশটির সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু’র সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে ডোনাল্ড লু’র এই সফর। তাই বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক ঠিক রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সহযোগিতা চেয়েছি। যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ৪০টি আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগের জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। যা শ্রম আইন সংশোধনের পর হবে। এ বিষয়ে আমাদের ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনের মাধ্যমে অর্থায়ন করতে চায়। যাতে করে, রিজার্ভ শক্তিশালী হয়। ড. হাসান মাহমুদ বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। গাজায় শান্তি ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে একমত হয়েছে। স্থায়ী যুদ্ধবিরতি তারাও চায়। সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, নির্বাচন ও মানবাধিকার নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়েও কোনো আলাপ হয়নি বৈঠকে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রক্রিয়া যেমন সময় সাপেক্ষ ছিলো, উঠবেও সেভাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশি ছাত্ররা যাতে যুক্তরাষ্ট্রের পড়াশোনার জন্য ব্যাপকভাবে সুযোগ পায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি (ডোনাল্ড লু) এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম স্টাবলিশ করা যায় কিনা।

বৈঠকে মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমার সঙ্গে মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়নি। সে প্রসঙ্গ আসেনি। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। তিনি (ডোনাল্ড লু) একমত হয়েছেন, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, ডোনাল্ড লু’র সফরের ফলে সেটির উন্নতি হয়েছে কি? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, এটি আপনার ভাষায় তিক্ততার সম্পর্ক, আমি এভাবে দেখতে চাই না। কারণ, বিভিন্ন দেশের নানান কনসার্ন থাকে, তারা সেসব কনসার্ন ব্যক্ত করেছিল। দেশে অত্যন্ত সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪২ শতাংশ। আওয়ামী লীগের অনেক প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। এমনকি মন্ত্রীও পরাজিত হয়েছেন। সে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়নি। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু ইস্যুতে সহায়তা করতে চায়। ভিসানীতি ইজ ডরমেন্ট নাউ (ভিসানীতি এখন সুপ্ত)। সুতরাং এটি নিয়ে আলোচনা হয়নি।

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরে যুক্তরাষ্ট্র অক্লান্ত কাজ করছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদকে জানিয়েছেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘গাজায় শান্তি স্থাপনের বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তিনি (ডেনাল্ড লু) বলেছেন ইউএস অত্যন্ত টায়ার্ডলেসলি (অক্লান্তভাবে) কাজ করছে যাতে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তিনি আমাকে যেটুকু বলেছেন- আমরা আশাবাদী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছি গাজায় যে মানবতাবিরোধী অপরাধ হচ্ছে, নিরীহ শিশুদের, নারীদের হত্যা করা হচ্ছে। ৩৫ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তার মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী ও শিশু। এটি আসলে মেনে নেওয়া যায় না। আমি বলেছি টেলিভিশনে যখন এগুলো দেখি তখন টেলিভিশন দেখা কন্টিনিউ করতে পারি না। সেখানে শান্তি স্থাপন করা দরকার। তিনিও (ডেনাল্ড লু) একমত যে সেখানে শান্তি স্থাপন করা দরকার। তিনি জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে অক্লান্তভাবে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। আমাদের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক খুবই চমৎকার। আমাদের বহুমাত্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্র রয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের গত ৫৩ বছরের অভিযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যে কারণে ডোনাল্ড লুকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তিনি সম্পর্ককে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। সেই অভিপ্রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। আমাদের আলোচনা সে লক্ষ্যেই হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ