শুক্রবার ২৪ মে ২০২৪
Online Edition

আমাদের জীবন বাংলা সন-তারিখ অনুযায়ী চলে না

এম এ কবীর

আমাদের জীবন বাংলা সন-তারিখ অনুযায়ী চলে না। ইংরেজিতে তারিখ দিলে বাংলা তারিখ দেয়া না-দেয়া অপশনাল, কিন্তু বাংলা তারিখ দিলে ইংরেজি তারিখও সঙ্গে দিতেই হবে। বাংলা নববর্ষ ১৪৩১ শুরু হয়েছে। মানে হলো বাংলা সালের গণনা শুরু হয়েছে আরবি সাল প্রবর্তনের সোয়া’শ বছর পর। অনেকের ধারণা, গৌড়ের রাজা শশাংক বাংলা বর্ষের গণনা শুরু করেন। কিন্তু পহেলা বৈশাখকে বছর গণনার প্রথম দিন বিবেচনা করার কৃতিত্ব দেয়া হয় স¤্রাট আকবরের যিনি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সুবিধার জন্য হিজরির বদলে বাংলা তারিখকে প্রাধান্য দেন। হিজরির তারিখ চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় তিনি বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী একটি স্থির তারিখ নির্ধারণ করে দেন পহেলা বৈশাখ। তখন কৃষকরা জমি থেকে ধান তুলে বিক্রির পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল থাকে বিধায় আকবর উপায় বের করেন যে তখনই হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের শ্রেষ্ঠ সময়।

 স¤্রাট আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ সিরাজিকে হিজরি চন্দ্রবর্ষপঞ্জিকে সৌরবর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব দেন। ফতুল্লাহ সিরাজির সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত ফার্সি বর্ষপঞ্জির অনুকরণে ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ সালে স¤্রাট আকবর হিজরি সৌরবর্ষপঞ্জির প্রচলন করেন। স¤্রাট আকবর তার সিংহাসনে আরোহণের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ৯৬৩ হিজরি সালের মহররম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। এজন্য বৈশাখ মাস বঙ্গাব্দ বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১ বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়। মূল হিজরি পঞ্জিকা চন্দ্রমাসের ওপর নির্ভরশীল। সৌর বছর ৩৬৫ দিন এবং চন্দ্র বছর ৩৫৪ দিন হওয়ায় সৌর বছরের চেয়ে চন্দ্র বছর ১১ দিন কম হয়।

  সংস্কৃতি একটি দেশের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের সাক্ষ্য বহন করে। বাংলাদেশে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালন করা হয়, যার মধ্যে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে, ঢাকার চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ইউনেস্কো ‘মানবতার স্পর্শাতীত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষিত মঙ্গল শোভাযাত্রার এবারের স্লোগান হচ্ছে ‘আমরা তো তিমিরবিনাশী’।

 সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২০১৬ সালের ৩০ নবেম্বর মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।  চারুকলা থেকে এই শোভাযাত্রার শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। তখনকার সেই শোভাযাত্রার একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিজ-নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছিলেন অনেক শিল্পী-সাহিত্যিক। চারুকলা অনুষদের ডিন, নিসার হোসেন বলেন, তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার বিপরীতে সব ধর্মের মানুষের জন্য বাঙ্গালি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তারাই মূলত: এই আয়োাজনটি করে। তবে এটিই যে এ ধরনের শোভাযাত্রার একদম শুরু তা নয়। ১৯৮৫ সালে যশোরে চারুপীঠ নামের একটি সংগঠন এ ধরনের একটি শোভাযাত্রা করে। যার উদ্যোক্তারা ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনে ভূমিকা রাখেন এবং সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চারুকলায়ও মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু হয়। শুরুতে অবশ্য আয়োজনের নামটা মঙ্গল শোভাযাত্রা ছিল না। প্রথমবার সেটির নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল বা ১৩৯৬ বঙ্গাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ কর্তৃক আয়োজিত প্রথম শোভাযাত্রার প্রসঙ্গ ধরেই এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে শিল্পী ইমদাদ হোসেন ও ওয়াহিদুল হক অন্যান্য শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরামর্শ করে নামকরণ করেন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। 

মঙ্গল শোভাযাত্রার এই অনুষঙ্গগুলো আসলো কোথা থেকে? “লোকসংস্কৃতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ উপাদানগুলো বেছে নেয়া হয়েছিল। সোনারগাঁয়ের লোকজ খেলনা পুতুল, ময়মনসিংহের ট্যাপা পুতুল, নকশি পাখা, যাত্রার ঘোড়া এসব  নেয়া হয়েছিল”। হালখাতা,মেলা, পিঠা-পুলি বানানো নানাভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। ১৯৬৬ সালে বাংলা বর্ষের গণনা সংস্কার করা হয়, এবং যার পর থেকে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন হয়ে আসছে ১৪ই এপ্রিল। নববর্ষ উদযাপনের নানা উৎসবের মধ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রাটি একেবারেই নবীন। তাহলে জাতিসংঘের-ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা, ইউনেস্কো একে বিশ্ব সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতি দিল কেন? বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশে ইউনেস্কো কমিশনের সচিব মঞ্জুর হোসেন বলেন, বাচনিক ঐতিহ্য বা সামাজিক চর্চাসহ প্রাকৃতিক বা বৈশ্বিক চর্চার বিষয়গুলো বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এখানে দীর্ঘদিনের প্রথা হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত তিনটি বিষয়কে অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং জামদানি বুনন শিল্পকে স্বীকৃতি দিয়েছে সংস্থাটি। এর আগে ২০০৮ সালে স্বীকৃতি দেয়া হয় বাংলাদেশের বাউল সঙ্গীতকে। তবে মঙ্গল শোভাযাত্রাও যে সবসময় বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল তা নয়। এই আয়োজন নিয়ে আগে থেকেই অনেকের আপত্তি ছিল। কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মুফতি ফায়জুল্লাহ তাদের আপত্তির কারণ হিসেবে বলেন, “এখানে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তির সাথে পেঁচার মূর্তিও বহন করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে। আমরা মনে করি এটি নিছক একটি হিন্দু ধর্মীয় রীতি এবং এটি মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক করার অধিকার কারো নেই”। কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজকরা বলছেন, মঙ্গল শোভাযাত্রার সাথে কোন ধর্মীয় বিষয়ের সম্পর্ক নেই এবং যেকোন ধর্মের উৎসবের বাইরে বাঙ্গালি হিসেবে সার্বজনীন একটি উৎসব হিসেবেই সূচনা হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রার।

অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় বিভিন্ন শোভাযাত্রা অনেক আগে থেকেই হচ্ছে। “আমাদের মহররমের সময় একটা শোভাযাত্রা হয়। জন্মাষ্টমীতে একটি শোভাযাত্রা হয়। কিন্তু যেহেতু সেগুলো ধর্মভিত্তিক শোভাযাত্রা, সেখানে ধর্মীয় বিষয়গুলোই থাকে। শোভাযাত্রার প্রথাটা বহু প্রাচীন। কিন্তু সব ধর্মের মানুষকে মেলানো যাচ্ছিল না। শোভাযাত্রার বিষয়টা এখানে নতুন না, নতুন হচ্ছে সার্বজনীনতা”। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শিল্পী আবুল বারক আলভী বলেন, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ১৯৮৯ সাল থেকে নিয়মিত হয়ে আসছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটে কিছু তরুণ শিক্ষার্থীর উদ্যোগে সর্বপ্রথম এখনকার আঙ্গিকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। আর এদের মূলে ছিলেন তরুণ ঘোষ নামের কলকাতার একজন শিক্ষার্থী। তরুণ ঘোষের নেতৃত্বে কিছু শিক্ষার্থী পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নবতর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তরুণ ঘোষ কলকাতায় যেভাবে দেখেছেন, ঠিক তারই আদলে দেব-দেবীর বাহন, বিভিন্ন জীব-জন্তুর মুখোশ সেই শোভাযাত্রায় তারা বহন করত। শোভাযাত্রা শুরুর অন্যতম উদ্যোক্তা নিসার হোসেন জানান, ১৯৮৫-৮৬ সালের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা। তিনি জানান, এরা ১৯৮৮ সালের বন্যায় কিছু কাজ করেছিল। সেই সময় তাদের চারুশিল্পী সংসদ সহায়তা করেছিল। শিক্ষকেরা পেছনে ছিলেন, কিন্তু সব কাজ হয়েছে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। 

 ইউনেসকো ২০০৩ সালে সারা বিশ্বের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’, অর্থাৎ মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণের জন্য একটি সমঝোতা চুক্তি অনুমোদন করে। এর আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো ঐতিহ্যবাহী মনোগত সাংস্কৃতিক উপাদান বিশ্বের নানা প্রান্তের নানা জাতিগোষ্ঠীর ভেতরেই রয়েছে। চুক্তিতে সই করা দেশগুলো ইউনেসকোর স্বীকৃতির জন্য আবেদন করলে সংস্থাটি যাচাই-বাছাই করে সেই বিষয়গুলো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। ইউনেসকোর এ স্বীকৃতির ফলে ওই সাংস্কৃতিক উপাদান ওই দেশের নিজস্ব বলে বিশ্ব দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ এই স্বীকৃতির ফলে মেনে নেয়া হয়, ওই বিশেষ সাংস্কৃতিক উপাদানের জন্মস্থান হলো নির্দিষ্ট দেশটি। নিয়ম অনুসারে, চুক্তিতে সই করা দেশগুলো প্রতিবছর একটি সাংস্কৃতিক উপাদানের স্বীকৃতির জন্য ইউনেসকোর কাছে আবেদন করতে পারে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার স্বীকৃতি চেয়ে ইউনেসকোতে আবেদন করে। স্বীকৃতি দেয়ার মূল কাজটি করে ‘ইন্টার গবর্নমেন্টাল কমিটি ফর দ্য সেফগার্ডিং অব দ্য ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’। কয়েক ধাপ পর্যালোচনার পর ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত কমিটির একাদশ সম্মেলনে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে এ স্বীকৃতি দেয়া হয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রার আরেকটি বিশেষ দিক হচ্ছে, এটি আয়োজন করার ক্ষেত্রে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেয়া হয় না। নিসার হোসেন বলেন, ‘চারুকলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা চিত্রশিল্পীদের অনেকে তাদের চিত্রকর্ম বিক্রি করে যে অর্থ পান, তা-ই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনের মূল উৎস। সবার অর্থে এটা হচ্ছে, কারও একক অর্থে হচ্ছে না। ইউনেসকো আমাদের যেসব বিষয় উৎসাহিত করেছ, তার মধ্যে এটিও একটি যে আমরা কারও একক অনুদান নিয়ে এই অনুষ্ঠান করি না।’ আগে শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত মুখোশ বা নানা উপকরণ নিলামে তোলা হতো। সেখান থেকে যে অর্থ পাওয়া যেত, তা পরবর্তী সময়ে শোভাযাত্রায় খরচ করা হয়ে থাকে।

বঙ্গাব্দ প্রচলন পরবর্তী সুদীর্ঘকাল থেকে গ্রাম-বাংলায় ঐতিহ্যগতভাবে পহেলা বৈশাখ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এসব মেলায় আসবাবপত্রসহ গৃহস্থালি ও কৃষি কাজে ব্যবহৃত পণ্যের বিপুল সমারোহ দেখা যায়। এর বাইরে মেলায় মাটি,বাঁশ ও কাঠের তৈরি বিভিন্ন ধরনের খেলনা এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিজাতীয় খাবার যেমন জিলাপি, বাতাসা, কদমা, মুড়ি ও চিঁড়ার মোয়া, গুড় মিশ্রিত খই, খাজা, গজা এবং দেশীয় ফলফলাদি প্রভৃতির পসরা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

 গ্রামীণ অর্থনীতি ক্রমে শহরমুখী হয়ে উঠলে পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করে শহরের বিভিন্ন স্থানে এরূপ মেলার আয়োজন প্রত্যক্ষ করা যায়। এরূপ মেলায় উল্লিখিত খাবার ছাড়াও চটপটি, ফুসকা, বিভিন্ন ধরনের পিঠা, খিচুড়ি, বিরিয়ানি, বিভিন্ন ভর্তাসমেত পান্তা-ইলিশ প্রভৃতির সমারোহ পরিলক্ষিত হয়। পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করে দীর্ঘকাল যাবৎ আমাদের বাংলা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা পুরনো পাওনার হিসাবনিকাশ চুকিয়ে নতুন হিসাব খোলার জন্য যে খাতার প্রচলন করেন সেটি হালখাতা নামে অভিহিত। হালখাতা উৎসবে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনাদারদের মিষ্টিমুখ করার ব্যবস্থা রাখেন। ব্যবসায়ীরা সম্পূর্ণ বকেয়া পাওনা আদায়ের উদ্দেশে এ উৎসবের আয়োজন করলেও দেনাদাররা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দেনা পরিশোধ করে থাকেন। আর তাই নতুন করে হালখাতা খোলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাতে পুরনো হিসাবের রেশ থেকেই যায়।

বিগত শতকের অষ্টম দশকের শেষ বছর অর্থাৎ ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ঢাকঢোল বাজিয়ে নেচে-গেয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামক একটি উৎসব পালিত হয়ে আসছে। এখানে দেয়ালচিত্রে প্রাধান্য পায় আমাদের দেশের বরেণ্য শিল্পীদের লোকজ ঐতিহ্যভিত্তিক মোটিফগুলো। পাশাপাশি থাকে কান্তজির মন্দিরের টেরাকোটা, কালীঘাটের পট,বটতলার ছাপাই ছবি থেকে নানা কাহিনী, কখনো রণকৌশল এবং ছবির বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়। বাংলার লোকঐতিহ্য,পরম্পরাভিত্তিক চিত্ররীতি, বাংলার সরাচিত্র, পটচিত্র, শীতলপাটি, নকশিকাঁথা, শখের হাঁড়ি, বাংলা-বিহার-ওড়িশার নানা লোকচিত্র ধারা, মধুবনী চিত্রকলা আর এ সময়ের রিকশা পেইন্টিংসহ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দিয়ে শোভাযাত্রার মোটিফ নির্বাচন করা হয়।

শোভাযাত্রাটিতে শুরু হতেই যেসব প্রতীক ব্যবহৃত হয়ে আসছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্যাঁচা, বাঘ, সিংহ, ময়ূর, ইঁদুর, হাতি, হাঁস, ষাঁড়, প্রজাপতি, সূর্য, বিভিন্ন ধরনের মুখোশ ও মঙ্গল প্রদীপ। তবে হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী প্যাঁচা হলো ধনসম্পদ ও ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর বাহন। একই ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী দেবী দুর্গার বাহন হচ্ছে বাঘ ও সিংহ। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দেব সেনাপতি কার্তিকের বাহন হচ্ছে ময়ূর। হিন্দু ধর্মীয় দেবতা দুর্গার ছেলে গণেশের বাহন হচ্ছে ইঁদুর। ধর্মীয়শাস্ত্র মতে, গণেশের মুখাবয়ব হাতির সদৃশ। তাদের ধর্মীয় প্রথা ও বিশ্বাস অনুযায়ী হাঁস হচ্ছে বিদ্যাদেবী সরস্বতীর বাহন। দেবতা শিবের বাহন হলো ষাঁড়। তাদের রীতি ও সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রজাপতি হলো বিয়ের দেবতা। গাভী রামের সহযাত্রী। ময়ূর কার্তিকের বাহন। ক্ষ্যাপা ষাঁড় শিবের বাহন।  হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে সূর্যকে বলা হয় সৌরদেবতা। ধর্মীয় বিবরণ অনুযায়ী সূর্যই হলো একমাত্র দেবতা যার উপস্থিতি প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করা যায়। শোভাযাত্রায় যেসব মুখোশ ব্যবহৃত হয় সেগুলো মানুষসহ দৈত্যদানব ও বিভিন্ন জীবজন্তুর প্রতিচ্ছবি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঙ্গল ও শুভ কামনায় প্রদীপ জ্বালিয়ে যে বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয় সেটিকে বলা হয় মঙ্গলপ্রদীপ। পহেলা বৈশাখের আরো একটি অনুষঙ্গ পান্তা-ইলিশ খাওয়া, এটিও মূলত হিন্দু সংস্কৃতির অংশ। তারা আশ্বিন মাসের শেষে রান্না করে এক ধরনের উপবাস করে। কার্তিক মাসের সকালে পূজা করে আগের দিনের রান্না করা পান্তাভাত খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করে। তবে মঙ্গল শোভাযাত্রার যারা আয়োজক এবং এ শোভাযাত্রায় যারা অংশগ্রহণ করেন তারা সবসময় নিজেদের অসাম্প্রদায়িক এবং উৎসবটিকে সর্বজনীন দাবি করেন।  

আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীরা পহেলা বৈশাখ যাতে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করতে পারে সে লক্ষ্যে সর্বশেষ ঘোষিত জাতীয় বেতন স্কেলে বৈশাখী ভাতার প্রবর্তন করা হয়েছে। সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে গুটি কয়েক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বৈশাখী ভাতা চালু হলেও অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক এটি দিয়ে অনীহ। দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের চাওয়া হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ উদযাপন হোক। তবে সেটি হওয়া উচিৎ বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কহীন সর্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতির উৎসব। 

আর মুসলিম হিসেবে সকলের বিশ্বাস যে, মঙ্গল এবং অমঙ্গলের মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা। আল্লাহ ছাড়া পৃথিবীতে যত কিছু আছে সব আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহর প্রত্যেক সৃষ্টিই আল্লাহর মুখাপেক্ষী। 

 

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ