শুক্রবার ২৪ মে ২০২৪
Online Edition

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, চোরাচালান ও ভারতীয় পণ্য বর্জন

ড. মো. নূরুল আমিন

॥ ৩য় কিস্তি ॥

গত কিস্তিতে আমরা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি সাধারণ চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের গঠন ও অবস্থা, তাদের আচরণ, স্থল সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া তৈরী ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ফ্লাড লাইট স্থাপনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের প্রয়োজনীয় তাপ ও আলোর ভারসাম্য বিনষ্টকরণ, করিডোর নির্মাণ, অবৈধভাবে পণ্য ও মানব পাচার প্রভৃতি সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করেছিলাম। আমরা দেখাতে চেষ্টা করেছিলাম যে, আমাদের সীমান্তবাসীরা সুখে নেই।

একটি বিষয় আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, আমাদের তথা, ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের স্বাধীনতার ভিত্তি বছর ১৯৪৭ সাল। ঐ সময় তিনটি দেশের যে সীমানা লর্ড মাউন্ট বেটেন ও তার সহযোগীদের দ্বারা গঠিত বাউন্ডারী কমিশন নির্ধারণ করে দিয়েছিল সেই সীমানা এখনো বলবৎ আছে। বিশেষ করে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর ভারত-পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে যে সীমানা ছিল সেই সীমানাকেই নবগঠিত বাংলাদেশের সীমানা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই সীমানা ও ভূখ-ের বয়স প্রায় সাতাত্তর বছর। আমরা ৭৭ বছর দুই পর্যায়ে স্বাধীন দেশের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি। কিন্তু সীমান্তবাসীরা এই সুখ ও সুযোগ ভোগ করতে পারেনি বা পারছে না। যে কোনো বিরোধ, যুদ্ধবিগ্রহ সীমান্তরক্ষী ও বিচ্ছিন্নবাদী বা অপরাধী চক্রের সকল নেতিবাচক কর্মকা-ের ফলাফল তাদেরই ভোগ করতে হয়। শিক্ষাদীক্ষা অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা স্বাধীন চলাচল সব কিছু থেকেই তারা বঞ্চিত। এখন আগের আলোচনায় ফিরে আসি।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার দিক থেকে আমাদের মতো এত দুরবস্থার মধ্যে আর কোন দেশ দুনিয়ায় বিরল। আমাদের এই অবস্থাকে কূটনীতির ভাষায় Tyranny of Geography বা ভূগোলিক অত্যাচার বলে অনেকে অভিহিত করে থাকেন। ভারতের জন্যও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যে সহজ তা বলা যায় না। আগেই বলেছি, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সীমানা ৪১৫১ কিলোমিটার। পক্ষান্তরে ভারতের চিরশত্রু বলে কথিত পাকিস্তানের সাথে তার বর্ডার হচ্ছে ২৯১০ কিলোমিটার। তবে এ ক্ষেত্রে বিএসএফ এর অবস্থা বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের তুলনায় (BGB)  অনেক ভালো ও উন্নত। তাদের সৈন্য সংখ্যা ও অস্ত্রশস্ত্রের পরিমাণ বেশি ও অত্যাধুনিক। এমনকি উন্নতমানের ইসরাইলী অস্ত্র ও গোয়েন্দা সামগ্রীও তারা ব্যবহার করতে পারে। কাঁটাতারের বেড়ার পাশাপাশি তারা লিংক রোডও তৈরি করেছে যার ফলে কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে গাড়ি নিয়ে অতি দ্রুত তারা অকুস্থলে পৌঁছতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্ডার গার্ডদের ঐ সুবিধা নেই। পায়ে হেঁটে কষ্ট করে অকুস্থলে পৌঁছাতে হয় এবং প্রতিপক্ষের হাতে প্রাণও হারাতে হয়।

একথা স্বীকার করতেই হবে যে, যত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই থাকুক না কেন দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিধান এবং বেআইনি কর্মকা- বন্ধ করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো সীমান্ত মাদক ও মানব পাচারের জন্য বিখ্যাত। অনুরূপভাবে দুই কোরিয়ার সীমান্তের অবস্থাও সর্বদা দুর্যোগে পরিপূর্ণ কিন্তু ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের ন্যায় এত ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক সীমান্ত বিশে^ বিরল। যদিও এই দুটি দেশ সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারত। অনেকে বলে থাকেন বাংলাদেশে ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞের পর ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের যথেচ্ছাচার ও সীমান্ত এলাকায় লুটপাট হত্যাযজ্ঞ অনেক বেড়েছে। চোরাচালানও বেড়েছে। বিডিআর এর নাম পরিবর্তন করে বিজিবি রাখা হয়েছে এবং ভারতের তরফ থেকে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ-বিজিবি যৌথ টহল ও পাহারার উদ্যোগ এবং প্রস্তাবও এসেছে, কিন্তু তাতে ফলপ্রসূ কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। বিবিসির একজন সংবাদদাতার মতে যে পদ্ধতিতে ইহুদি সৈন্যরা আরব ফিলিস্তিনীদের গুলী করে হত্যা করে অবস্থা দেখে মনে হয় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা ইসরাইলী সৈন্যদের মাতলামিতে আসক্ত হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে একই ধরনের আচরণ করছে। তার কথাটা তাৎপর্যপূর্ণ। বিডিআর বাহিনীর দুর্বল অবস্থান ও বিজিবি’র প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশের সমুদ্র ও নদীবন্দর ব্যবহার, সেভেন সিস্টারস নামে কথিত ভারতের ৭টি রাজ্যের সাথে রেল, সড়ক ও নদীপথে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহারের অনুমতি, ফেনী নদীর পানি নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের খাবার ও সেচ চাহিদা পূরণের সুযোগ প্রদান প্রভৃতি ভারতের জন্য প্রকৃতপক্ষে আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করেছে; এতে তাদের লাখ লাখ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

ইতোপূর্বে আমি বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যাবলীর বরাত দিয়ে বলেছিলাম সীমান্ত এলাকায় অবৈধ চোরাচালানের মাধ্যমে আমাদের বার্ষিক প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়।

ভারত থেকে বর্তমানে প্রতি বছর আমাদের আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার (#১৩.৮৩ বিলিয়ন ডলার)। পক্ষান্তরে তারা বাংলাদেশ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য আমদানি করে। এর অর্থ আমাদের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বব্যাপী ডলার সংকট দেখা দেয়ার পর ভারতও বাংলাদেশ সরকার ডলারের পরির্বতে রুপীতে পণ্য আমদানি রফতানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তাদের নিজ নিজ অংশে রুপীতে লেনদেন তথা এলসি খোলার জন্য কয়েকটি ব্যাংককে দায়িত্ব প্রদান করে। ভারতীয় অংশে দু’টি ব্যাংক দায়িত্ব প্রায়। এগুলো হচ্ছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং আই সি আই সি আই ব্যাংক। অন্যদিকে বাংলাদেশ অংশে প্রথমে দুটি ব্যাংক তথাক্রমে সোনালী ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে এর সাথে আরো দু’টি ব্যাংক তথা ইসলামী ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংককে যুক্ত করা হয়। ২০২৩ সালের জুলাই মাসের ২৩ তারিখে রুপী ও টাকার লেনদেনের একটি চুক্তি হয়। যদিও ঐ বছর ১১ জুলাই মঙ্গলবার বাংলাদেশে রুপীতে বাণিজ্য শুরু হয়েছিল। বিবিসির এক রিপোর্ট অনুযায়ী এই বাণিজ্যের অগ্রগতি শুধু মন্থর নয় বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিকূলও। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র দুটি কোম্পানি রুপীতে আমদানি রফতানির কাজ করছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী এ ব্যাপারে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও মজার ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশ ভারতে যা রফতানি করে ভারতও রুপীর মাধ্যমে তা পরিশোধ করে। প্রায় ২বিলিয়ন ডলারের সমমূলের পণ্য যাতে করে তা দিয়ে তারা ভারত থেকে পুনরায় পণ্য আমদানি করতে পারে। কিন্তু ভারত থেকে বাংলাদেশ যা আমদানি করে (প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার) তার সম্পূর্ণ মূল্য বাংলাদেশকে ডলারে পরিশোধ করতে হয়। এই অবস্থা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থকে ক্ষুণœ করছে এবং দুদেশের বন্ধুত্বেও ফাটল ধরাচ্ছে। 

নবীনরা হয়ত জানেন না। পাঠকদের মধ্যে যারা প্রবীণ তাদের হয়ত মনে আছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবার পর বেশ কিছু দিন আমাদের দেশে অর্থনৈতিক লেনদেন ভারতীয় মুদ্রায় পরিচালিত হয়েছে। ভারতের টাকশালে বাংলাদেশী মুদ্রা ও নোট ছাপা হয়েছে। এই সুযোগে ঐ দেশটির অসাধু কর্মকর্তারা সেই দেশে অতিরিক্ত নোট ছেপে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব করে দিয়েছিল। ফলে এখানে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তাৎকালীন সরকার একশ টাকার নোট ডি মনিটাইজেশনের সিদ্ধান্ত নেন। সারা দেশের ব্যাংকসমূহ অচল ঘোষিত নোটে ভর্তি হয়ে যায়। সরকার এই নোটগুলো কিছু অংশ পরবর্তী কালে ফেরত দিয়েছে। অবশিষ্ট ফেরত দেয়া হয়নি। সরকারী কর্মচারীরাও এক মাসের বেতন পায়নি। এই অর্থ পরবর্তীকালে ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি সরকার রক্ষা করতে পারেনি। এই ক্ষতি ও অচলাবস্থা আমাদের বন্ধুত্বের প্রতিফল। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে রুপীতে আমাদানি রফতানি বাণিজ্যে যাওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে বলেই বিবিসি তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছে।

পরবর্তী কিস্কিতে আমরা সীমান্তে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন, স্বাধীন হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ভারত ভিত্তিক বাংলাদেশ বিরোধী গ্রুপসমূহের কিছু তৎপরতা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ