মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪
Online Edition

‘নবযুগে’ নজরুলের সম্পাদকীয়

ড. ফজলুল হক তুহিন

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে একজন অনিবার্য কবি; উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রধান সাহিত্যিক; অসাধারণ সঙ্গীতজ্ঞ; সৃজনশীল সাংবাদিক ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি। উনিশ শতকের শেষে বাঙালি মুসলমানের জাগরণের প্রধান রূপকার নজরুল। পলাশি-উত্তর স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করে নজরুল সমকালে হয়ে উঠেছিলেন নতুন সম্ভাবনা, আশা ও বিপ্লবের প্রেরণাস্থল। স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক ও খেলাফত আলোলনের উৎসাহদাতা। তিনিই প্রথম স্পষ্টভাবে পূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা করেন ‘নবযুগ’ পত্রিকায়। এই পত্রিকার সম্পাদকীয়গুলো ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আছে ভারতের স্বাধীনতা, অধিকার আদায় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অর্জনে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয়-র প্রাসঙ্গিকতা এখনো বিরাজমান। 

‘নবযুগ’ একটি সান্ধ্য-দৈনিক রাজনৈতিক কাগজ হিসেবে প্রকাশ পায় নজরুল ও মুজাফ্ফর আহমদ যুগ্ম সম্পাদনায়। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই কলকাতার ৬ নম্বর টার্ন স্ট্রিট থেকে পত্রিকাটির প্রকাশনা শুরু হয় প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শের-এ-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায়। তবে পত্রিকাটিতে সম্পাদকের নাম থাকার বদলে পরিচালকের নাম থাকতো। নজরুল ও মুজাফ্ফর আহমদ ১৯২০ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিকে ৩২ নং কলেজ স্ট্রীটস্থ ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র অফিসঘরে থাকতেন। তারা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে নিজেরাই পত্রিকা প্রকাশের কথা ভাবছিলেন। এ-সময়ে তাদের প্রধান পরামর্শক ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক ওয়াজেদ আলী; এছাড়া ফজলুল হক শেলবর্ষী ও মঈনুদ্দীন হোসাইন ছিলেন। 

ফজলুল হকের সাথে আলোচনা-পরামর্শ করে শেষে নজরুলের প্রস্তাব অনুযায়ী পত্রিকার নাম রাখা হয় ‘নবযুগ’। যেহেতু নজরুল নতুন যুগের প্রবর্তক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সেহেতু এই নামের পেছনে তাৎপর্য ছিলো। নজরুল প্রধানত কবি; সেজন্য সংবাদপত্রের জন্য সংবাদ লেখার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো নজরুল সংবাদ তৈরির কাজ দক্ষতার সাথে করেছেন; এবং তাঁর দেয়া শিরোনামের অভিনবত্বের গুণে পত্রিকাটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। সেইসাথে নজরুলের লেখা সম্পাদকীয় সরকারের রোষানলে পড়ে। ভারতের স্বাধীনতা, মানবাধিকর ও গণজাগরণসমৃদ্ধ লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার একাধিকবার সতর্ক করে দেয় পত্রিকার মালিকপক্ষকে। তবুও এই জাতীয় লেখা প্রকাশ হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পত্রিকার জামানতের দুই হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত ও পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। অবশ্য পরে দুই হাজার টাকা জামানত দিয়ে ‘নবযুগ’ আবার প্রকাশিত হয়। কিন্তু কিছুদিন পর ফজলুল হকের সাথে মতবিরোধের জন্য নজরুল ও মুজাফ্ফর আহমদ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আবার এক বছরের মধ্যে কাগজটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪২ সালে ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর উদ্যোগে এবং কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় পুনরায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এ-সময় কাজী নজরুল ইসলাম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে খুলনার মাওলানা আহমদ আলী সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দু’বছর পত্রিকাটি চালু থাকার পর, ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে পত্রিকাটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

এই পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়গুলো নজরুলের ‘যুগবাণী’ (১৯২২) প্রবন্ধ-গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলো হলো- আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন?, উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন, কালা আদমিকে গুলি মারা, গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ, ছুঁতমার্গ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় শিক্ষা, ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ, ধর্মঘট, বাংলা সাহিত্যে মুসলমান, বাঙালির ব্যবসাদারি, ভাব ও কাজ, মুখ বন্ধ, মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে?, রোজ কেয়ামত বা প্রলয় দিন, লাট-প্রেমিক আলি ইমাম, লোকমান্য তিলকের মৃত্যুতে বেদনাতুর কলিকাতার দৃশ্য (স্মৃতি), সত্য-শিক্ষা, শ্যাম রাখি না কুল রাখি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রেই শুধু নয় ক্রমাগত কবি নজরুল সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকাটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মুখপত্রে পরিণত হয়। ‘নবযুগ’ বাংলা সংবাদপত্র ও সাহিত্যে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। 

‘নবযুগ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই ‘নবযুগ’ নামে কবি নজরুলের লেখা একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এই কবিতায় স্পষ্ট করেন কবি- ‘নবযুগ’ জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতি কমিটেড ছিল। ‘দৈনিক নবযুগ’কে উদ্দেশ করে লেখা ‘নবযুগ’ কবিতায় কবি বলেন-

তাই নবযুগ আসিল আবার। রুদ্ধ প্রাণের ধারা

নাচিছে মুক্ত গগনের তলে দুর্ম্মদ মাতোয়ারা।

এই নবযুগ ভুলাইবে ভেদ, ভায়ে ভায়ে হানাহানি,

এই নবযুগ ফেলিবে ক্লৈব্য ভীরুতারে দূরে টানি।

একটি স্বাধীন ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আত্মজাগরণকামী সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কবি নজরুল এই পত্রিকায় প্রথমেই সত্যিকার অর্থে এই সম্পাদকীয়গুলো লেখেন। 

জাগরণ ও মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ও সমগ্র জাতিকে জাগরণের জন্য ‘নবযুগ’ নামেই সম্পাদকীয় লেখেন: 

আজ মহাবিশ্বে মহাজাগরণ, আজ মহামাতার মহাআনন্দের দিন, আজ মহামানবতার মহাযুগের মহাউদ্বোধন। আজ নারায়ণ আর ক্ষীরোদসাগরে নিদ্রিত নন। নরের মাঝে আজ তাঁহার অপূর্ব মুক্তি-কাঙাল বেশ। ঐ শোনো, শৃঙ্খলিত নিপীড়িত বন্দীদের শৃঙ্খলের ঝনৎকার। তাহারা শৃঙ্খল-মুক্ত হইবে, তাহারা কারাগৃহ ভাঙিবে। ঐ শোনো মুক্তি-পাগল মৃত্যুঞ্জয় ঈশানের মুক্তি-বিষাণ! ঐ শোনো মহামাতা জগদ্ধাত্রীর শুভ শঙ্খ! ঐ শোনো ইস্রাফিলের শিঙ্গায় নব সৃষ্টির উল্লাস-ঘন রোল! 

একই লেখায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি রক্ষা ও সকল মিথ্যা-সঙ্কীর্ণতা দূর করে একত্রে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ডাক দেন:   

এস ভাই হিন্দু। এস মুসলমান। এস বৌদ্ধ! এস ক্রিশ্চিয়ান। আজ আমরা সব গ-ি কাটাইয়া, সব সঙ্কীর্ণতা, সব মিথ্যা সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না। চাহিয়া দেখো, পাশে তোমাদের মহা শয়নে শায়িত ঐ বীর ভ্রাতৃগণের শব। ঐ গোরস্থান-ঐ শ্মশানভূমিতে-শোনো শোনো তাহাদের তরুণ আত্মার অতৃপ্ত ক্রন্দন। এ-পবিত্র স্থানে আজ স্বার্থের দ্বন্দ্ব মিটাইয়া দাও ভাই। 

জাতীয় সংগ্রামের প্রেক্ষিতে ‘ধর্মঘট’ লেখায় শ্রমিকদের অধিকার ও পশ্চিমে শ্রমিকের সমানাধিকারের চর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন:   

এই মনুষ্যত্ব-বিহীন ভোগ-বিলাসী কর্তার দল ভয়ানক রুষ্ট হইয়া উঠেন, তাঁহারা তখনও বুঝিতে পারেন না যে, এ-অভাগাদের বেদনার বোঝা নেহাৎ অসহ্য হওয়াতেই তাহাদের এ-বিদ্রোহের মাথা-ঝাঁকানি। উন্নত আমেরিকা-ইউরোপেই ইহার প্রথম প্রচলন। সেখানে এখন লোকমতের উপরই শাসন প্রতিষ্ঠিত, এই গণতন্ত্র বা ডিমোক্রাসিই সেদেশে সর্বেসর্বা; তাই শ্রমজীবীদলেরও ক্ষমতা সেখানে অসীম। তাহারা যে রকম মজুরি পায়, তাহাদের স্বাস্থ্য-শিক্ষা, আহার-বিহার প্রভৃতির যে রকম সুখ-সুবিধা, তাহার তুলনায় আমাদের দেশের শ্রমজীবীগণের অবস্থা কশাইখানার পশু অপেক্ষাও নিকৃষ্ট। তাই এতদিন নির্বিচারে মৌন থাকিয়া মাথা পাতিয়া সমস্ত অত্যাচার-অবিচার সহিয়া সহিয়া শেষে যখন আজ রক্তমাংসের শরীরে তাহা একেবারে অসহ্য হইয়া উঠিল, তখন তাহারাও মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইল। 

আলোচিত ‘মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে?’ লেখায় ইংরেজের আগ্রাসী পদক্ষেপ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কবি লেখেন:  

সামান্য খুঁটিনাটি ধরিয়া ছল করিয়া গায়ে পড়িয়া তাহাদের সাথে গোলমাল বাধাইলে, হত্যা করিলে? আবার হত্যা করিলে আমাদেরই ভারতীয় সৈন্য দ্বারা? যাহাকে হত্যা করিলে, তাহাকে হত্যা করিয়াও ছাড়ো নাই, তাহার লাশ তিন দিন ধরিয়া আটকাইয়া রাখিয়া পচাইয়া গলাইয়া ছাড়িয়াছ! মৃতের প্রতিও এত আক্রোশ, এত অসম্মান কেবল তোমাদের সভ্য জাতিই একা দেখাইতে পারিতেছে! তোমাদেরি কিচনার-লর্ড কিচনার মেহেদির কবর হইতে অস্থি উত্তোলন করিয়া ঘোড়ার পায়ে বাঁধিয়া ঘোড়দৌড় করিয়াছে, তোমাদের এই সৈন্যদল যে তাহারই শিষ্য।

‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ সম্পাদকীয়তে বাঙালি মুসলিম লেখকদেরকে সাহিত্যে সর্বজনীনতা সৃষ্টির প্রতি তাগিদ দিয়ে বলেন: 

এই বিশ্ব-সাহিত্য সৃষ্টি করিতে পারিয়াছেন বলিয়াই আজ রবীন্দ্রনাথ এমন জগদ্বিখ্যাত হইয়া পড়িয়াছেন। যাহা বিশ্ব-সাহিত্যে স্থান পায় না, তাহা স্থায়ী সাহিত্য নয়, খুব জোর দু’দিন আদর লাভের পর তাহার মৃত্যু হয়। আমাদিগকেও তাই এখন করিতে হইবে সাহিত্যে সর্বজনীনতা সৃষ্টি। অবশ্য, নিজের জাতীয় ও দেশীয় বিশেষত্বকে না এড়াইয়া, না হারাইয়া। যিনি যে দেশেরই হউন, সকলেরই অন্তরের কতকগুলি সত্য আছে, সূক্ষ্মতম ভাব আছে, যাহা সকল দেশের লোকের পক্ষেই সমান; সাহিত্য-সৃষ্টির সময় ভিতরের এইসব সূক্ষ্মদিকে দৃষ্টি রাখিতে হইবে। এইদিকে লক্ষ্য রাখিয়া জীবনের গূঢ় রহস্যকে বিশ্লেষণ করিয়া সত্যের সৌন্দর্য ও মঙ্গল ফুটাইয়া তুলিতে হইবে, এই মহাশক্তি আমাদের তরুণ লেখক সম্প্রদায়কে অর্জন করিতে হইবে। সত্য যদি লক্ষ্য হয়, সুন্দর ও মঙ্গলের সৃষ্টি সাধনা ব্রত হয়, তবে তাঁহার লেখা সম্মান লাভ করিবেই করিবে। 

পরাধীন সমাজে নি¤œবর্ণ মানুষের প্রতি সাম্য বা মানব প্রত্যয় প্রতিষ্ঠার জন্য ‘ছুঁৎমার্গ’ লেখায় অভিমত ব্যক্ত করেন: 

মানুষ হইয়া মানুষকে কুকুর-বিড়ালের মতো এত ঘৃণা করা-মনুষ্যত্বের ও আত্মার অবমাননা করা নয় কি? আত্মাকে ঘৃণা করা আর পরমাত্মাকে ঘৃণা করা একই কথা। ... হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগনতলের সীমা- তারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া-মানব। -তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদিম বাণী ফুটাও দেখি! বলো দেখি, ‘আমার মানুষ-ধর্ম।’ দেখিবে, দশদিকে সার্বভৌমিক সাড়ার আকুল স্পন্দন কাঁপিয়া উঠিতেছে। এই উপেক্ষিত জন-সঙ্ঘকে বুক দাও দেখি, দেখিবে এই স্নেহের ঈষৎ পরশ পাওয়ার গৌরবে তাহাদের মাঝে ত্যাগের একটা কি বিপুল আকাক্সক্ষা জাগে। এই অভিমানীদিগকে বুক দিয়া ভাই বলিয়া পাশে দাঁড় করাইতে পারিলেই ভারতে মহাজাতির সৃষ্টি হইবে, নতুবা নয়। মানবতার এই মহা-যুগে একবার গ-ি কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বলো যে, তুমি ব্রাহ্মণ নও, শূদ্র নও, হিন্দু নও, মুসলমান নও, তুমি মানুষ-তুমি সত্য।

‘উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন’ সম্পাদকীয়তে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতি ও উপেক্ষিত জনসমাজের শক্তির প্রতি লক্ষ্য করে উল্লেখ করেন: 

আজ আমাদের এই নূতন করিয়া মহাজাগরণের দিনে আমাদের সেই শক্তিকে ভুলিলে চলিবে না-যাহাদের উপর আমাদের দশ আনা শক্তি নির্ভর করিতেছে, অথচ আমরা তাহাদিগকে উপেক্ষা করিয়া আসিতেছি। সে হইতেছে, আমাদের দেশের তথাকথিত ‘ছোটলোক’ সম্প্রদায়। আমাদের আভিজাত্য-গর্বিত সম্প্রদায়ই এই হতভাগাদের এইরূপ নামকরণ করিয়াছেন। কিন্তু কোনো যন্ত্র দিয়া এই দুই শ্রেণীর লোকের অন্তর যদি দেখিতে পারো, তাহা হইলে দেখিবে, ঐ তথাকথিত ‘ছোটলোক’-এর অন্তর কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ এবং ঐ আভিজাত্যগর্বিত তোমাদের ‘ভদ্রলোকের’ অন্তর মসীময় অন্ধকার। 

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও জনশক্তির স্থায়ীত্ব সম্পর্কে নিয়ে ‘আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন?’ লেখায় কবি বলেন: 

এ-প্রশ্নের সর্বপ্রথম উত্তর, আমরা চাকরিজীবী। মানুষ প্রথম জন্মে তাহার প্রকৃতিদত্ত চঞ্চলতা, স্বাধীনতা ও পবিত্র সরলতা লইয়া। সে-চঞ্চলতা চির-মুক্ত, সে-স্বাধীনতা অবাধ-গতি, সে-সরলতা উন্মুক্ত উদার। 

মানুষ ক্রমে যতই পরিবারের গন্ডি, সমাজের সঙ্কীর্ণতা, জাতির-দেশের ভ্রান্ত গোঁড়ামি প্রভৃতির মধ্য দিয়া বাড়িতে থাকে, ততই তাহার জন্মগত মুক্ত প্রবাহের ধারা সে হারাইতে থাকে, ততই তাহার স্বচ্ছপ্রাণ এইসব বেড়ির বাঁধনে পড়িয়া পঙ্কিল হইয়া উঠিতে থাকে। এ-সব অত্যাচার সহিয়াও অন্তরের দীপ্ত স্বাধীনতা ফুটিয়া উঠিতে পারে, কিন্তু পরাধীনতার মতো জীবন-হননকারী তীব্র হলাহল আর নাই। অধীনতা মানুষের জীবনী-শক্তিকে কাঁচা-বাঁশে ঘুণ ধরার মতো ভুয়া করিয়ে দেয়। 

কবি সর্বাত্মকভাবে স্বাধীন মনোভাবের অধিকারি; কোনোভাবেই বিদেশি শক্তির অধীনতা মেনে নিতে উচ্ছুক নন। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের ব্যাপারে আপসহীন; জাতি-বর্ণ-ধর্ম সকল মানুষকে মানবিক দৃষ্টিতে কবি দেখেছেন এবং সবাইকে দেখতে উদ্বুদ্ধ করেন। বিশেষভাবে বাঙালি মুসলমানের জাগরণ, বিদ্রোহ, শৃঙ্খল-বন্ধন-পরাধীনতা থেকে সার্বিক মুক্তি, আত্মগঠন-আত্মআবিষ্কার, জাতি গঠনের জন্য আড়ষ্টতা ভেঙে নতুন জগৎ নির্মাণে কবি নজরুলের ভূমিকা অনন্য। আর এই সম্পাদকীয়গুলো একদিকে ঐতিহাসিক; অন্যদিকে জাতীয় জীবনের জন্য প্রেরণা ও উজ্জীবনের স্মারক। এই মহামূল্যবান লেখাগুলোয় নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গি যেমন প্রতিফলিত, তেমনি বর্তমানে নয়া উপনিবেশিক বিশ্বে প্রাসঙ্গিক।    

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ