বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪
Online Edition

ব্রিটিশ আমলে সংবাদপত্র দলন নীতি

সোলায়মান আহসান

B efore he will bow, cringe or fawn to any of his op- pressors… he would com- pose ballads and sell them through the streets of Calcutta.

কথাগুলো ভারতের প্রথম সাংবাদিক জেমস অগাস্টাস হিকির। সম্ভবতঃ কলকাতার প্রথম মুদ্রাকরও তিনি। হলহেডের ‘এ গ্রামার অব দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ নিশ্চয়ই ভারতের এই এলাকায় যথার্থই প্রথম মুদ্রিত বই। ছাপা বইয়ের পাতায় সেই প্রথম বাংলালিপির মুখদর্শন। বাঙালীর কাছে এ-বইয়ের গুরুত্ব অবশ্যই ঐতিহাসিক।

১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে এ দেশের প্রথম সংবাদপত্র হিকিস বেঙ্গল গেজেট অর দি অরিজিনাল ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভারটাইজার প্রকাশের আগে, ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ তাঁকে দিয়ে কাউন্সিলের কার্যবিবরণী এবং সেনাবাহিনীর জন্য নিয়মাবলী ছাপিয়েছিলেন। উইলিয়াম হিকি নামে সমসাময়িক একজন লিখেছেনÑ জেমস অগাস্টাস নাকি নিজের ছাপাখানার জন্য কিছু হরফও তৈরি করেছিলেন কলকাতায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় সে-সব সরকারি কাজ বাবদ প্রাপ্য হিকি পাননি। তাঁর প্রাপ্য হয়েছিল ৩৫০৯২ সিক্কা টাকা। চূড়ান্ত হয়রানির শেষে ষোল বছর পরে হিকি পেয়েছিলেন ৬৭১১ সিক্কা টাকা। অথচ ওই সময়ে আদি প্রাপ্যের সুদই হওয়ার কথা ৮৪২২ টাকা ১ আনা ৮ পাই!

ভারতের প্রথম মুদ্রাকর এবং প্রথম সম্পাদক জেমস অগাস্টাস হিকিকে তাঁর ন্যায্যমূল্য দেওয়া হয়নি কারণ তিনি তৎকালীর ব্রিটিশ সরকারের কাছে অবাঞ্ছিত ছিলেন। তিনি তাঁর ‘মন এবং আত্মার স্বাধীনতার’ জন্য অনেক মূল্য দিয়েছেন। তার ‘বেঙ্গল গেজেট’ ছিল- ‘রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সাপ্তাহিক। প্রতিশ্রুতি ‘ছিল সমস্ত দলের জন্য খোলা এর পাতা, কিন্তু প্রভাবিত নয় কারও দ্বারা।’ প্রথম থেকেই হিকির কাগজ সরকারি কর্তাব্যক্তিদের কোপানলে পড়ে। হিকির দুঃসাহসী কলমের সামনে উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ ছিল না। হেস্টিংস, ইম্পেÑ কেউ নন সমালোচনার ঊর্ধ্বে। এমনকি ইংরেজ সরকারের দোসর ভারতীয় ভুঁইফোঁড় ধনীক ও জমিদার গোষ্ঠীর ব্যাপারেও হিকি ছিলেন সোচ্চার। ফলে হিকিকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আদালতে রুজু হলো একের পর এক মানহানির মামলা। সশস্ত্র হামলা চালানো হলো তার ছাপাখানার ওপর। হিকি নিক্ষিপ্ত হলেন কারাগারে! বেপরোয়ার মতো সেখানে বসেই তিনি ছাপিয়ে চললেন তার কাগজ। কিন্তু বেশিদিন তা সম্ভব হলো না। হিকি ঘোষণা করেছিলেনÑ পাঠক, আমার হারাবার জিনিস আছে মাত্র তিনটি। প্রথমÑ আমার পত্রিকা, আমার সম্মান; দ্বিতীয়Ñ আমার স্বাধীনতা এবং তৃতীয়Ñ আমার জীবন। শেষের দু’টিকে আমি হেলায় বিসর্জন দিতে পারি প্রথমটির জন্য। শেষ দু‘টিকে সত্যই বিসর্জন দিয়েছিলেন হিকি। জেল, জরিমানা এবং নানা যন্ত্রণায় জর্জরিত তাঁর জীবন। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দের মার্চেই বন্ধ হয়ে যায় হিকির ‘ বেঙ্গল গেজেট’। 

কলকাতার প্রথম মুদ্রাকর এবং ভারতবর্ষের প্রথম সম্পাদকের এই পরিণতি তাৎপর্যপূর্ণ। রাজশক্তি সবই করেছিলেন সুরুচির দোহাই দিয়ে। কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না এÑলড়াই ছিল মূলত: ক্ষমতার লড়াই। তলোয়ার বনাম কলমের লড়াই। এ লড়াই সেই থেকে বর্তমান কাল অবধি (২৪২ বছর) চলছে।

ছাপাখানাকে ইংরেজিতে বলে ‘Press’। ইংরেজিতে ‘Press’ অর্থ আবার খবরের কাগজ। ছাপাখানার কাছে লুকোচুরি চলে না। ছাপা মানেই রটিয়ে দেওয়া। প্রকাশ করে দেওয়া, ঢাক পিটিয়ে খবর করা। ‘প্রেস’ আর খবরের কাগজ তা-ই বুঝিবা সমার্থক। বাংলায় বলা হয় ‘ছাপা’। এসেছে ‘চাপা’ থেকে। ‘চাপ’ দিয়ে ছাপ তোলা থেকেই ছাপা এসেছে। ছাপাখানায় ছাপা মানে লুকোছাপা নয়, চতুর্দিকে ছাপিয়ে কূলকিনারা ভাসিয়ে আলোর বন্যা বইয়ে দেওয়া। স্বভাবতই ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিলেন সেই বানকে ঠেকাতে। মানুষের বোধের মাত্রাকে সীমিত রাখতে। আর সেজন্য যে ওয়ারেন হেস্টিংস ছাপাখানার উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রাজন্যবর্গকে বলেকয়ে, তিনিই চাইলেন মতামতের স্বাধীনতা রোধ করতে। একদল চান ছাপতে, অন্যদল চান চাপতে। হিকি জানিয়ে গেলেন নিয়তি কোন দিকে ধাবিত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) শেষ হলো। কিন্তু জানা গেল যুদ্ধ এখানেই শেষ নয়। সামনে আবার রণক্ষেত্র। হলহেডের ব্যাকরণ ছাপা হওয়ার পরপর উইলকিনসের প্রস্তাব অনুসারে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হলো প্রথম সরকারি ছাপাখানা এবং উইলকিনসের পরিচালনাধীন। ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টের জর্জ হজসন (Geo, Hodg-son) নানা সরকারি দপ্তরকে জানিয়ে দেন কোন্ ভাষায় কী ছাপতে খরচ পড়বে কত। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দেই লর্ড ওয়েলেসলি সরকারের একটি নিজস্ব ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা দেখিয়ে এক বিশদ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তাঁর বক্তব্যÑ এদেশে ছাপাখানার সংখ্যা বাড়ছে। সেটা বিপজ্জনক। রাজনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে সরকারি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা খুবই যৌক্তিক। সরকারের খরচ বাঁচবে। ‘ প্রেস’ বলতে ওয়েলেসলি শুধু সরকারি ছাপাখানা নয় একটি সরকারি কাগজ চালু করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। সরকারের এও এক রণকৌশল, এক কাগজের বিরুদ্ধে আর এক কাগজকে লেলিয়ে দেওয়া। এক কাগজকে মোকাবিলা করতে অন্য কাগজের পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা গ্রহণ করা। সে জায়গায় নিজস্ব কাগজ থাকলে আরও ভালো। ওয়েলেসলি সে পথ অবলম্বন করলেন। হিকির গেজেট প্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে লবণের গোলদার পিটার রীড আর থিয়েটারওয়ালা বি, মেসিঙ্কের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার দ্বিতীয় কাগজ ‘ইন্ডিয়া গেজেট’। তার পৃষ্ঠপোষক ইংরেজ শাসক। চার বছর পরে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় সরকারি কাগজ ‘ক্যালকাটা গেজেট’। তারপর আরও। কলকাতার কাগজ প্রকাশের ধারা দেখতে দেখতে অন্য এলাকায়ও এসে সূচনা ঘটালো। ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তিনখানা কাগজ : ‘বেঙ্গল জার্নাল’ ‘ওরিয়েন্টাল ম্যাগাজিন’ এবং ‘মাদ্রাজ ক্যুরিয়ার’। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে আবির্ভূত হলো ‘ক্যালকাটা ক্রনিকল’। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে প্রকাশিত হলো ‘বোম্বে ক্যুরিয়ার; ১৭৯১- এ ‘ বোম্বে গেজেট’। হিকির গেজেটের পর কয়েক বছরের মধ্যে দেশে প্রকাশ হলো অনেকগুলো কাগজ। এগুলোর মধ্যে কয়েকখানা কাগজ সরকারের বশংবদ। এটা ছিলো ওয়েলেসলির চালাকি। নিছক একটা সরকারি কাগজ দিয়ে সামলানো যাচ্ছিল না ভিন্নমতের কাগজগুলোকে। তাই ইংরেজ আশীর্বাদপুষ্ট কায়েমী স্বার্থের ধারক বাহকদের কাজে লাগানো হতো। এ ধারা এখনো বিদ্যমান।

 ওয়েলেসলি কলকাতা আসার আগেই এটা সরকারি রণনীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। ওয়েলেসলি গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব গহণ করেন ১৭৯৮ খ্রীস্টব্দে। তিনি এসে কাগজের ওপর সেন্সার আরোপ করেন। ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা থেকে বহিষ্কৃত হন ‘বেঙ্গল জার্নাল’ - এর সম্পাদক উইলিয়াম দুনে (William Dune)|। তাঁর অপরাধ তিনি খবরের নামে লর্ড কর্নওয়ালিস সম্পর্কে গুজব ছাপিয়েছিলেন। তখন মারাঠাদের সাথে যুদ্ধ চলছিল ইংরেজদের। কর্নওয়ালিস গেছেন যুদ্ধ পরিচালনা করতে। ‘বেঙ্গল জার্নাল’ এক ফরাসী সূত্রের উল্লেখ করে লিখল, তিনি মারা গেছেন ব্যস, আর যায় কোথায়! কর্নওয়ালিসের হুকুমে সম্পাদককে পাকাড়াও করে জাহাজে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হলো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ফরাসীদের অনুরোধে সেবারকার মতো রেহাই দেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু তিন বছর পরে আবার বিপত্তি। আদালতের লোকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে আক্রমণ করে তাঁর বাড়ি। তারপর সম্পাদকের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে হাজির করে তাঁকে কাঠগড়ায়। অপরাধ, দুনে নাকি দেনা করে পরিশোধ করেননি। দুনে লিখলেন তাঁর কাগজে, এসব বাজে কথা। আসলে ওই আদালতের চালচলনের সমালোচনা করেছিলেন তিনি। তিনি কাগজে লড়াই চালিয়ে গেলেন। কর্নওয়ালিসের জায়গায় ইতোমধ্যে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন স্যার জন শোর। দুনে স্থির করলেন তিনি নতুন গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে কথা বলবেন। জানাবেন খোলামেলা সকল ঘটনা। কিন্তু গভর্নর জেনারেলের মুখোমুখি হবার আগে তাঁর অফিসের লোকেরা আটক করলো তাঁকে। বন্দী সম্পাদককে রাখা হলো প্রথমে কেল্লায়। তারপর তুলে দেওয়া হলো জাহাজে। সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ বিচারকরা মাথা চুলকে রায় দিলেনÑ দ- আইনসম্মত। তার মানে অন্যান্য কাগজকে সতর্ক করা হলো সরকারের বিরোধিতা করা যাবে না। করলে দুনে’র মতো পরিণাম ভোগ করতে হবে। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে          ‘টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় জনৈক সরকারি কর্মচারিকে ছদ্মনামে চিঠি লেখার অপরাধে চাকুরিচ্যুত করা হয়। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে এক ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে লেখার অপরাধে বিতাড়িত হন চার্লস ম্যাকলিনস।

পরের বছরেই এলো কুখ্যাত সংবাদপত্র শাসন ‘আইন।’ এতোদিন পর্যন্ত সংবাদপত্র শাসনে শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ছিল সম্পাদকদের দেশান্তরী করা। তবে অন্য কৌশলও অবলম্বন করা হতো। কথায় কথায় ধমক, রক্তচক্ষু প্রদর্শন এবং নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হতো। অপছন্দের কাগজকে সরকারি নোটিশ বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি সরবরাহ করা হতো না। বিজ্ঞাপনদাতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিজ্ঞাপন দান করা হতো। ডাকযোগে কাগজ পাঠাবার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেওয়া হতো। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজে এক সম্পাদকের উদ্দেশে এক ধরনের সেনসারশিপ জারি করা হয়, কাগজ ছাপাবার আগে মিলিটারি সেক্রেটারিকে দেখিয়ে নিতে হবে। তবে অষ্টাদশ শতকে কলকাতায় সরকারের হাতে মোক্ষম অস্ত্র ছিল ‘লাইবেল’ বা মানহানির অভিযোগে সম্পাদককে টেনে এনে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া। তারপর দরকার হলে জাহাজে তুলে দওয়া। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে থমদ্রে নামে এক সম্পাদক পালিয়ে যান জাহাজ থেকে। 

ওয়েলেসলি তাঁর আইন জারি করেন শেষ প্রহরে, ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে। এ আইনের পিছনে সামনে সমূহ উপলক্ষ ছিল ‘এশিয়াটিক মিরারের’ সম্পাদক ব্রুস সাহেবের একটি প্রবন্ধ। তিনি এদেশে ইংরেজ ফৌজ আর ‘নেটিভ’ জনশক্তির একটি তুলনামূলক আলোচনা প্রকাশ করেছিলেন। ওয়েলেসলি তখন মহীশূরের ব্যাঘ্র টিপুর সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ। 

লক্ষ্য করার বিষয়, ভারত শাসন আইন-১৯১৯ প্রণীত হবার অনেক আগেই সংবাদপত্রের কন্ঠরোধের জন্য ‘সংবাদপত্র শাসন আইন’ জারি করা হলো। ওয়েলেসলির জীবনীকার পিয়ার্স সাহেবের মতে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের স্টার চেম্বারের কঠিন কঠোর বিধানের মতই ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের কলকাতার কানুন কোম্পানির ডাইরেক্টাররা এই আইন অনুমোদন করলেন বটে, কিন্তু সে- সম্মতির কথা বোর্ড অব কনট্রোলের সামনে পেশ করতে সাহসী হলেন না। কারণ, ব্রিটেনে তখন সংবাদপত্র কার্যত স্বাধীন। সম্পাদক দলন প্রচলন ঘটেনি।

ওয়েলেসলির আইনে সম্পাদকদের জন্য ছিল পাঁচ দফা নির্দেশ, সেন্সারের জন্য আট দফা। সম্পাদকদের জানিয়ে দেওয়া হলোÑ

১. এবার থেকে কাগজে মুদ্রাকর এবং প্রকাশকদের নাম দিতে হবে।

২. প্রত্যেক সম্পাদক এবং কাগজের মালিককে নাম ঠিকানা ছাড়াও তাঁদের সম্পর্কে যাবতীয় জ্ঞাতব্য তথ্য সরকারকে সরবরাহ করতে হবে।

৩. রোববার ‘প্রভুর দিন’ সেদিন ধর্ম কর্ম বন্ধ রেখে কাগজ ছাপা চলবে না।

৪. কোনও কাগজই ছাপা চলবে না যদি না আগে থেকে সেন্সারকে দিয়ে সব অনুমোদন করিয়ে নেওয়া না হয়।

৫. যদি কেউ এসব আদেশ-নির্দেশ পালনে শৈথিল্য দেখান তবে অবধারিত শাস্তিÑ দেশান্তর। সেন্সার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হলো কোনও কাগজ যেন এসব খবর ছাপা না হয়ঃ ১ সরকারি ধন-ভান্ডার সম্পর্কিত কোনও খবর। ২ সৈন্য বাহিনী বা তাদের রসদ বিষয়ক কোনও খবর। 

৩ কোন্ জাহাজ কোথায় আছে, কবে কোথায় থাকবে, কোন্ দিকে যাত্রা করবে সে-সব তথ্য। ৪ সামরিক বা অসামরিক কোনও বিভাগের কোনও কর্মীর কোনও কাজের বা আচরণের সমালোচনা। ৫ ব্যক্তিগত কেচ্ছা কেলেঙ্কারি। ৬ কোম্পানি এবং দেশীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে যুদ্ধ বা শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে কোনও আলোচনা। ৭ এমন কোনও সংবাদ যা শত্রুপক্ষকে সাহায্য করতে পারে কিংবা কোম্পানির অধীন প্রজাবর্গের মনে অসন্তোষ জাগাতে বা আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে। ৮ ইউরোপের সংবাদপত্র থেকে এমন কোনও উদ্ধৃতি, যা শাসন কর্তৃপক্ষের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারের পক্ষে বিঘœ সৃষ্টি করতে পারে। খবরের কাগজে এসব থাকা চলবে না। আর তা বাদ দিয়ে যদি কাগজ হয় তবে ওয়েলেসলির তাতে আপত্তি নেই।

তথ্য: দুই শতকের বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশন-চিত্তরঞ্জন বন্দোপাধ্যায় সম্পাদিত (জুন ১৯৮১)

এ আইন সঙ্গতকারণেই ভারতে সংবাদপত্রের আকাশে কালোমেঘ জমাট হয়ে দেখা দিলো। একটা একটা করে সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ হতে থাকে। এ সময়ই শ্রীরামপুর মিশনারিদের ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ থেমে গেলো, স্বভাবত : কলকাতায় মিশনারিদের ছাপাখানা বসাবার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। জে. সি. মার্শম্যান লিখেছেন, কলকাতায় সংবাদপত্রের অনেক কলম তখন তারকাখচিত হয়ে বের হতো। সেন্সার নির্মমভাবে কলম চালাত বলে সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করা সম্ভব হতো না।

ব্রিটিশদের  সংবাদপত্র দলনের কাহিনী আরও রয়েছে। এক্ষণে বিশদ আলোকপাত করা সম্ভব নয়। সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের ওপর স্পষ্টভাবে সাংবাদিক দলন ও নির্যাতনের ইতিহাস আজও গতিমান। জামাল খাশোগির মৃত্যুর ঘটনার মতো কিছু সাড়া জাগানো খবর বিশ^কে কিছু দিনের জন্য নাড়া দেয় বৈকি, কিন্তু বিবেক জাগ্রত করতে পারে না। জামাল খাশোগি একজন সৌদী সাংবাদিক ছিলেন। রাজপরিবারের উত্তরাধিকার হয়েও তিনি সৌদী শাসকদের সাথে মত বিরোধে যান। লেখার মাধ্যমে। বিশেষ করে ক্রাউন প্রিন্স সালমানের তিনি ছিলেন কঠোর সমালোচক। সালমানের ব্রিটিশ-মার্কিন-ইউরোপ কানেকশনের তিনি বিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন। পরিণাম হলো তুরস্কে অবস্থান করেও আততায়ীদের হাতে মৃত্যু। আজও কিনারা হয়নি এ হত্যা রহস্য। যেভাবে হয়নি আমাদের দেশে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুণির হত্যার রহস্যভেদ এবং হন্তারকদের চিহিৃতকরণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ