শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

‘যেতে নাহি দিব, তবু চলে যায়'

শেষ কথা হয়েছিল গত শনিবার বিকালে। সেদিন কিন্তু মনেই হয়নি তিনি চলে যাবেন দু'দিন বাদে। ভাষায় কিছুটা অতৃপ্তি ধ্বনিত হলেও চেহারার দীপ্তি অপসারিত হয়নি মোটেও। একটা ঔজ্জ্বল্য এবং সপ্রতিভ ভঙ্গি সবসময় যেন তাকে অনুসরণ করতো। কি সংগ্রামে, কি প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে। তার এই সপ্রাণ উপস্থিতি আমাকে প্রাণিত করতো বরাবর। তিনি প্রায়ই আমার কামরায় এসে বসতেন। কথা বলতেন ধীরে-সুস্থে। বলতেন সংসারের কথা, আলোচনা করতেন লেখার বিষয় নিয়ে, পরামর্শ দিতেন পরামর্শ নিতেন। দেশ, রাজনীতি ও ঘোরাফেরা করতো আমাদের তাৎক্ষণিক আড্ডায়। বেশ ক'জন তরুণ কবির উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে উঠেছিল রুমটি। এমন সময় উড়ে এলো তার কণ্ঠ। সাজজাদ একটু আসবেন। এভাবে খুব কম সময়ই ডাকেন, নিজেই উপস্থিত হন, কথার জড়তা ভাঙ্গেন। আমাদের কামরাগুলো কফিরঙের কাচে ঢাকা থাকায় বাইরের দৃশ্য তেমন নজরে আসে না। দু'জন প্রায় মুখোমুখি রুমে বসি তিন-চার ফুট দূরত্বে। অনেক সময় কথা হয় চেহারা না দেখেই। সম্পাদকীয় বিভাগটি তখন ফাঁকা, আমি আর আজিজুল হক বান্না ব্যতীত। এই অড সময়টাতে এমনই থাকে। কিছুটা তফাতে সম্পাদকের কামরায় সম্পাদকের উপস্থিতি ঠাহর করা যাচ্ছিল। হয়তো অল্পক্ষণ বাদেই আমাদের ডাক পড়বে তার সামনে হাজির হবার। প্রতিদিনই এমনটা হয়। আগামীদিনের বিষয় নিয়ে আলোচনা আর প্রকাশিত পত্র-পত্রিকার খবর লেখালেখি নিয়ে পর্যালোচনা এবং আড্ডা। এটি সম্পাদকীয় বিভাগের প্রতিদিনকার রুটিন। তার আহবানে সাড়া দিয়ে হাজিরা দিয়েছিলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা হয়েছিল মিনিট দশেক। তার মনোবেদনা এবং অতৃপ্তির সংবাদ আমাকে জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে আমার সহৃদয় সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিলেন। আমিও তাকে আশ্বস্ত করে ফিরে এসেছিলাম রুমে। বান্না আমাকে বরাবরই সুহৃদ ভাবতেন। তাই সুখ-দুঃখের অনেক কথাই আমার সাথে শেয়ার করতেন। গত শনিবারের সেই শেষ বিকালটিই ছিল সচল আজিজুল হক বান্নার সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ এবং শেষ কথোপকথন। সকাল এগারটা নাগাদ হবে আমি তখন বাসায় সাংবাদিক আবাসিক এলাকা, মিরপুরে। কবি রেদওয়ানুল হক ফোনে জানালো, বান্না ভাই ইন্তেকাল করেছেন, এর বেশি আর কোন তথ্য দিতে পারলো না সে। কবি রেদুয়ানের ফোন আমাকে বাকরুদ্ধ করে দিল। বিশ্বাস রাখতে পারছিলাম না তার সংবাদে। আসাদ ভাইকে ফোন করলাম তিনি বললেন যা শুনেছেন তা সত্য। এবার আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। আজিজুল হক বান্নার তেমন কোন জটিল অসুখের খবরও জানা ছিল না। তার চেহারা স্বাস্থ্যে এমন কোনো লক্ষণও স্পষ্ট হয়নি কখনো। সদা হাস্যোজ্জ্বল জনাব বান্নার ইন্তেকালের খবরটি তাই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই মনে হচ্ছে। ধারণা, এমনটাই হবে আর সব সাংবাদিক কমিউনিটি এবং কাছের মানুষজনদের। আজিজুল হক বান্না সাংবাদিকতার জীবন শুরু করেছিলেন দৈনিক সংগ্রামে প্রবেশ করে, সাবেক পাকিস্তান আমলে। শেষ প্রস্থানও হলো সংগ্রাম থেকেই। মধ্যবর্তী সময়ে তিনি অনেক পত্রিকায়ই সুনামের সাথে উপস্থিত ছিলেন। একজন জনপ্রিয় কলামিস্ট হিসেবেও পাঠকের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বিপুল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সাংবাদিক বান্না তার যোগ্যতাকে প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন লেখায়। দেশপ্রেম-স্বজাত্যবোধ এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন সজাগ এবং অনিবার। আজিজুল হক বান্না ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবেও বরিত হয়েছিলেন বেশ কিছু সময়, সভাপতির ভারও বহন করেছেন। এটিও জনাব বান্নার সাংবাদিক জীবনের যোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তার আরো একটি সরব উদাহরণ। হয়তো অনেকেরই অজানা ‘ফতেহ আলী টিপু' নামেও তিনি পত্রিকায় প্রতিবেদন লিখতেন। এই প্রতিবেদনগুলো পাঠ করলে যেকোন পাঠকই উপলব্ধি করতে পারতেন প্রতিবেদকের দেশপ্রেম আর স্বজাত্যবোধ কতটা পুক্ত। মহিশূরের টিপু সুলতানের মতোই মনোভঙ্গি এবং সাহস তাকে উদ্দীপ্ত করতো, অনুপ্রাণিত করতো। সুলতান টিপুর প্রতীক ছিল বাঘ। সাংবাদিক বান্নাও তার মনে একটি বাঘ পুষতেন। টিপুর মতো তিনিও ছিলেন দেশপ্রেমিক এবং দুঃসাহসী। হয়তো এ জন্যেই তিনি ছদ্মনাম হিসেবে ফতেহ আলী টিপুকেই পছন্দ করেছিলেন। বিডিআর মেসাকার নিয়ে আজিজুল হক বান্নার তথ্যবহুল এবং সাহসিক বেশ ক'খানা লেখা এখনো পাঠককে আলোড়িত করে। কবি নজরুলের ভাষায় বলা যায় ‘জান দেগা নেহি দেগা আমামা' সাংবাদিক বান্না ছিলেন সেই প্রকৃতির লোক। দেশ, ধর্ম, ঐতিহ্য ছিল তার জীবনের সাথে একাত্ম। তাই তার প্রতিটি লেখায়ই এই সত্যটি স্পষ্ট হতো। ফতেহ আলী টিপু নামের আড়ালে আজিজুল হক বান্নার এখানেই ছিল সার্থকতা। বয়সের ব্যবধান তেমন ছিল না আমার আর বন্ধু বান্নার, প্রায় সমবয়সী বলতে গেলে। তবে তিনি সংবাদপত্রে প্রবেশ করেছিলেন আমার বছর দু-এক আগে, মফস্বল সংবাদদাতা হিসাবে। আমি অবশ্য সাংবাদিকতায় যুক্ত হই তেহাত্তর সালে। ‘দেশ বাংলা' পত্রিকায়। তখন পত্রিকাটি ছিল অর্ধ সাপ্তাহিক। পরবর্তী সময় সম্ভবত আটাত্তর সালে সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন পুনর্বার, হিসাব বিভাগে। তখনো কিন্তু তার লেখালেখি ক্ষান্ত হয়নি। প্রায়ই প্রতিবেদন প্রকাশ পেত পত্রিকায়। যদিও সেই সময়ে আমার সাথে তার আন্তরিকতা জন্মায়নি। বলাবাহুল্য তখন থেকে আমিও সম্পাদকীয় বিভাগে যুক্ত ছিলাম। জনাব বান্না যখন সংগ্রামের সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেন নতুনভাবে তখন থেকেই তার সাথে আমার হৃদ্যতা দৃঢ় হয়। আত্মীয়তা বাড়ে। মনে আছে, তার বড় মেয়ের বিয়েতে আমাকে দাওয়াত করেছিলেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন সিলেট। দাওয়াত কবুল করেছিলাম আনন্দের সাথে। সিলেট সফরের বাসনা ছিল মনে অনেকদিন থেকে। কারণ আমার শৈশবের কতকটা সময় কেটেছে সিলেট। তাই পুলক অনুভব করলাম এবং যথাসময় সঙ্গ দিয়ে ছিলাম। সেই যাত্রাপথে এবং ফিরতিপথে উন্মোচিত হয়েছিল তার আরো একটি পরিচয়। সারল্য এবং অন্তরস্পর্শী আতিথেয়তা। জানি এই সারল্য এই অন্তরস্পর্শী ভালবাসা যে লোকটি পোষণ করতেন হৃদয়ে দিবস রজনী, তার দীপ্র উপস্থিতি আর কখনো আমরা অনুভব করবো না। যার চির অবসান এবং চির প্রস্থানই মহাসত্য হয়ে প্রতিভাত হবে, প্রকটিত হবে অন্ত সময়। সম্পাদক ফোনে জানিয়েছিলেন বেলা ৩টা সংগ্রাম চত্বরে প্রথম জানাযার পর প্রেসক্লাবে দ্বিতীয় জানাযা হবে আজিজুল হক বান্নার। যে ক্লাব এক সময় মুখর থাকতো তার সরব উপস্থিতিতে। কত সবল সময় কত অলস সময় তিনি কাটিয়েছেন প্রেসক্লাবে। সেখানে তার সাংবাদিক বন্ধুরা তাকে অন্তিম অভিবাদন জানাবেন। তার আত্মার মাগফেরাত এবং দোআ রাখবেন মহা শক্তিধর আল্লাহর দরবারে। তেমনটাই হয়েছিল সেদিন প্রেসক্লাবে। অশ্রুসিক্ত নয়নে হাজির হয়েছিলেন তার এককালের বন্ধু সুহৃদগণ। বৃষ্টি উপেক্ষা করে আজিজুল হক বান্নার লাশ এসে পৌঁছল তার কর্মস্থল সংগ্রাম অফিসের উঠানে। তখন বৃষ্টি ঝরছিল, তাই লাশ বারান্দায় তোলা হলো জানাযার জন্য। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে তার ভক্ত অনুরক্তরা বৃষ্টি ভেদ করে ছুটে এলেন এক নজর দেখার জন্যে তাদের প্রিয়জনকে। বৃষ্টির কারণে জানাযা অনুষ্ঠিত হলো অফিসের খোলা বারান্দায়। উভয় জানাযায় বিপুল উপস্থিতি প্রমাণ করে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং সমাজ-সম্পৃক্ততা কতটা প্রশস্ত ছিল। স্মরণযোগ্য তৃতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব বাড্ডা মসজিদে তার আবাস এলাকায়। আজিজুল হক বান্নাকে এক নজর দেখার জন্য উন্মুখ ছিলাম। এই তো শেষ সাক্ষাৎ বন্ধু বান্নার সাথে। উন্মুক্ত করা হলো মুখটি। কী আশ্চর্য! তখনো এক চিলতে প্রশান্ত হাসি ঝুলে আছে তার ঠোঁটে। যেমনি করে হাসতো সাক্ষাতের পর। সাংবাদিক বান্না গাড়িতে উঠলেন স্পন্দনহীন, গন্তব্য প্রেসক্লাব। এটাই তার শেষ যাত্রা। আর কোনদিন সংগ্রামে ফিরবে না আজিজুল হক বান্না। গাড়ি গেইট পার হচ্ছে, আমি আর সম্পাদক আসাদ ভাই তাকিয়ে আছি পলকহীন। দু'জনার চোখে টলটল করছে পানি। লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সটি দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। দু'তলায় উঠে এলাম দু'জন। একবুক বেদনা নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে। আমার তখন রবীন্দ্রনাথের কবিতার কটি পঙক্তি বারবার মনে আন্দোলিত হচ্ছিল অন্তরে ‘‘সবচেয়ে পুরাতন কথা/সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন/‘‘যেতে নাহি দিব’’/হায়, তবু যেতে দিতে হয়/তবু চলে যায়।’’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ