শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি প্রসঙ্গে

দেশব্যাপী বোরো ধান তোলার কাজ শুরু হয়েছে। এবার আবহাওয়া অনুকূল থাকায় সর্বত্র বাম্পার ফলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং আশাতীত উৎপাদনে কৃষকরা খুবই খুশি। তবে হাট-বাজারে ধানের দাম তাদের ব্যাপকভাবে আশাহত করছে বলে জানা গেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরানুযায়ী শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাসমূহে ধানের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে মোটা জাতের প্রতিমণ ধান মণপ্রতি ৫০০ টাকা এবং চিকনজাতের ধান ৫৪০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে বেপারী ফড়িয়া ও মজুদদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় তাদের সুবিধা অনুযায়ী তারা ধানের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের কর্মসূচি অনেকটা পরিত্যক্ত হওয়ায় বাজারের স্থিতিশীলতাও সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংবাদ মাধ্যমের খবরে আরো জানা গেছে যে, সরকারি দলের পৃষ্ঠপোষকতায় একশ্রেণীর নব্য ফড়িয়া মজুদদার সিন্ডিকেট করে ধানের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এক্ষেত্রে অভাবী কৃষকরা বাধ্য হয়ে পানির দামে তাদের কাছে ধান বিক্রি করছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এ বছর সরু, মোটা নির্বিশেষে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে কৃষকদের খরচ পড়েছে গড়ে কমপক্ষে ২৩ টাকা। সেক্ষেত্রে তারা ১৪-১৫ টাকা কেজি দরে ধান বিক্রি করে ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। বলা বাহুল্য সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক, পারিবারিক শ্রম ও অন্যান্য পরিচর্যা বাবত একর প্রতি আট সহস্রাধিক টাকা ব্যয় ছাড়াও বর্তমানে প্রতি বিঘা জমির ধান কাটতে তাদের কমপক্ষে ১৫০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে এবং এই উৎপাদন ও ফসল কাটার ব্যয়ভার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ধার-কর্জ করে মিটান এবং পরবর্তীকালে ফসল বিক্রি করে ধার শোধ করেন। অন্যান্য বছর সরকারের সংগ্রহনীতির অধীনে ধান ও চালের মূল্য নির্ধারিত হওয়ায় এবং খাদ্য বিভাগ থেকে ধান-চাল ক্রয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ থাকায় কৃষকদের ন্যূনতম একটি ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির পরিবেশ ছিল যা তাদের উৎপাদন ব্যয়ের সাথে কিছুটা হলেও সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। কিন্তু এ বছর সরকারিভাবে ধান-চালের মূল্য নির্ধারণ না করে দেয়ায় খাদ্যশস্যের বাজার সম্পূর্ণভাবে ব্যাপারী, ফড়িয়া ও সরকারদলীয় ক্যাডারদের হাতে চলে যায়। এখন তারাই মুনাফা লুটছে; কৃষকরা কিছুই পাচ্ছেন না। এই অবস্থাকে আমরা দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের পথে একটি বিরাট অন্তরায় বলে মনে করি। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে কৃষকরা কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে। আমরা এর আগেও একাধিকবার বলেছি যে, বাংলাদেশের কৃষকদের সামনে দু'টি প্রধান সমস্যা রয়েছে। এর প্রথমটি হচ্ছে উৎপাদনের সমস্যা। এর মধ্যে রয়েছে সময়মতো ও ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত বীজ, সার, কীটনাশক, বালাইনাশক, সেচের পানি ও প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাব। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতায় এবং পারিবারিক উদ্যোগে কঠোর পরিশ্রম করে কৃষকরা এ সমস্যার কিছুটা সমাধান করতে সক্ষম হন। কিন্তু দ্বিতীয় সমস্যা তথা ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির সমস্যাটির সমাধান করা তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভবপর হয় না। এই সমস্যাটির সমাধান করতে হলে সরকারের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। ফসলের মওসুমে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এর দাম কমে আসে, আর ক্রেতারা যদি সিন্ডিকেট গঠন করে তাহলে তো এই দাম আরো কমে এবং কৃষকদের সর্বনাশ ঘটে। সরকার যদি ফসলের উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ করে কৃষকদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক একটি মার্জিন যোগ করে মূল্য নির্ধারণ করে দেন এবং সরকারি গুদামে কৃষকরা যাতে ধান-চাল সহজে সরবরাহ করে তার বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য গ্রহণ করতে পারেন তাহলে এ সমস্যার একটি সহজ সমাধান হতে পারে। অতীতের বছরগুলোতে এর কিছুটা সুযোগ থাকলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কৃষকরা এই সুযোগ পাচ্ছেন না এবং এর ফলে বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। বাজারে খাদ্যশস্যের ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে খাদ্যশস্য চলাচলে বিধি-নিষেধ না থাকায় প্রতিবেশী দেশে ধান-চাল চোরাচালান হয়ে চলে যাচ্ছে বলেও জানা গেছে। অবিলম্বে সরকারি সংগ্রহনীতি ঘোষণা ও কঠোরভাবে তা কার্যকর করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে বলে আমরা মনে করি। দ্বিতীয়ত, কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির জন্যে ফসল ধরে রাখতে সক্ষম হন এবং ফসল উঠার সাথে বিক্রি করতে বাধ্য না হন তার ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন। এর একমাত্র ব্যবস্থা হচ্ছে দেশের কৃষক সমবায় সমিতিগুলো বিশেষ করে BRDB-এর অধীনে স্থাপিত উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতিগুলোকে সক্রিয় করা এবং যেখানে যেখানে প্রয়োজন তাদেরকে মূলধন সরবরাহ করা যাতে করে তারা উৎপাদন ঋণের পাশাপাশি কৃষকদের গুদাম ঋণও সরবরাহ করতে পারেন। সমবায়ী কৃষকরা তাদের গুদামে ফসল জমা দিয়ে বাজার মূল্যের ৮০-৯০ ভাগ ঋণ হিসেবে নিতে পারেন এবং ২/৩ মাস পর ফসলের দাম বৃদ্ধি পেলে ফসল বিক্রি করে অথবা তাদের সমিতিগুলোর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে ঐ ঋণ শোধ করতে পারেন। এতে কৃষকরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমনি মুনাফারও অংশীদার হতে পারবেন। সরকার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবেন বলে আমরা আশা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ