মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪
Online Edition

ফিলিস্তিনী যুবকেরা ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে উত্থিত হবে

এম এ কবীর

গাজায় ইসরাইলী হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। অনেকে বিধ্বস্ত বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চাপা পড়ে আছেন। ৭ অক্টোবর ইসরাইলের ভেতরে বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রায় ৫ হাজার রকেট ছোড়ে হামাস। এই ভূখন্ডের নারী-শিশুসহ নিরপরাধ মানুষ হত্যার খবর নতুন নয়, ইসরাইলী সেনার গুলিতে ফিলিস্তিনীদের খুন হওয়ার সংবাদ শুনতে শুনতে আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। অবরুদ্ধ গাজার বাসিন্দা হামাসের এক হাজার যোদ্ধা কীভাবে ইসরাইলের সার্বক্ষণিক নিñিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে এই আক্রমণ চালাল- তা বিশ্ববাসীর নিকট অবিশ্বাস্য। দ্বিতীয়ত গাজার এক চিলতে ভূখন্ডের মধ্যে হামাস ইসরাইল এবং মিশর দ্বারা অবরুদ্ধ, দুটি দেশই তাদের চলাফেরায় নজরদারি করে থাকে। এই অবস্থায় এমন অতর্কিত আক্রমণে ইসরাইলও হতভম্ব।

 ইসরাইলের যুদ্ধকালীন জরুরি সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হামাসকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, ‘প্রতিটি হামাস সদস্য এখন একজন মৃত মানুষ’। গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনীরা বিদ্যুৎ, পানি এবং জ্বালানির জন্য ইসরাইলের ওপর নির্ভরশীল, ইসরাইল সব বন্ধ করে দিয়েছে। হামাস যাতে অন্য কোন দেশ থেকে সহয়তা না পায় তা নিশ্চিত করতে ভূমধ্যসাগরে আমেরিকা এবং ব্রিটেনের যুদ্ধজাহাজ ও জঙ্গি বিমান টহল দিচ্ছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ইসরাইলে গমন করে তাদের সাহস জোগাচ্ছেন, পাশে থাকার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসলিম দেশগুলোতে গিয়ে তাদের শান্ত রাখার চেষ্টা করেছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ ইউরোপের সব নেতা ইসরাইলের পাশে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে হামাসের কর্মকান্ডের নিন্দা প্রস্তাবে রাশিয়া ভেটো দিয়েছে। রাশিয়া এবং চীন নিরপেক্ষ ভূমিকা নিলেও উভয় দেশ স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। তুরস্কের  প্রেসিডেন্ট রজব তায়্যেব এরদোগান হামাসের হামলার জবাবে ইসরাইলের মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করছেন। ইসরাইলের সঙ্গে জর্ডানের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, ইসরাইলের প্রতি তাদের নমনীয় মনোভাব সব সময় ছিল। পার্শ্ববর্তী দেশ সিরিয়ায় এখনো গৃহযুদ্ধ চলছে, তাই ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ করার শক্তি সিরিয়ার নেই।

হামাসকে সমর্থন করে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া নজির স্থাপন করেছে, তারা ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে। কলম্বিয়া ফিলিস্তিনীদের ওপর ইসরাইলের নৃশংস বোমা হামলাকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ৫৭টি মুসলিম দেশের মধ্যে একমাত্র ইরানই হামাসের অকৃত্রিম বন্ধু। কিন্তু তারা যুদ্ধে জড়াবে বলে মনে হয় না। কোন মুসলিম দেশ হামাসের হয়ে যুদ্ধ করবে না, এমনকি পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষও নয়। অবশ্য ইসরাইলের সঙ্গে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের যুদ্ধ করার সক্ষমতা একেবারেই নেই। ইরাকে মোকতাদা আল-সদরের নেতৃত্বে মুসলমানদের বৃহত্তর গণজমায়েত হয়েছে, অন্যান্য মুসলিম দেশেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণজমায়েত হচ্ছে। ১৯৪৮ সাল থেকে বিগত ৭৫ বছরে ফিলিস্তিনীদের মুক্তি আনতে পারেনি। গাজায় ইসরাইলের লাগাতার পাল্টা হামলার ঘটনায় ফিলিস্তিনীদের পক্ষে আমেরিকার ইহুদিরাও বিক্ষোভ করছে, এমনকি ক্যাপিটল হিলে ঢুকে তারা ইসরাইলের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদও করেছে।

ইসরাইল কর্তৃক অবরুদ্ধ এতদিনকার সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত জিন্দানখানা গাজা এখন সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত গোরস্থান। এই বিধ্বস্ত উপত্যকায় অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২১ অক্টোবর ২০২৩ প্রথম দফায় ১৬টি ও পরে আরও ৪ ট্রাক ত্রাণসামগ্রী রাফা ক্রসিং পেরিয়ে গাজাতে পৌঁছেছে। এর একটি ট্রাক কেবল কফিনে বোঝাই। ত্রাণ হিসেবে কফিন প্রাপ্তি নির্মম রসিকতা মনে হতে পারে। কিন্তু চারদিকে শিশুর লাশ কফিনকেই স্বাগত জানিয়েছে, মৃত মানুষের আহারের কী দরকার? গাজা তার মৃতদের ধারণ করার মতো যথেষ্ট প্রসারিত কোনো ভূখন্ড নয়। বোমা হামলায় নিহত মানুষের লাশের সংখ্যা দ্রুতই বেড়ে যাচ্ছে, বিদুৎহীন গাজার হাসপাতালগুলো অন্ধকার মর্গে পরিণত হয়েছে।

৩৬৫ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত গাজা স্ট্রিপ ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৬ থেকে ১২ কিলোমিটার প্রশস্ত। ইসরাইলের সঙ্গে এর সীমান্ত ৫১ কিলোমিটার আর মিসরের সঙ্গে ১১ কিলোমিটার। এই ভূখন্ডের পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিমে মিসর আর উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে ইসরাইল। গাজাতে রয়েছে চারটি শহর, আটটি শরণার্থী ক্যাম্প ও এগারোটি গ্রাম এবং প্রায় আড়াই মিলিয়ন মানুষ। ১৯৪৮-এর পর গাজা মিসরভুক্ত হলেও ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর তা ইসরাইলী দখলে চলে যায়। ১৯৯০-এর দশকে অসলো চুক্তির পর প্যালেস্টাইন অনেকাংশের দখল ফিরে পায়। হামাস (হারাকাত আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া) গাজা শহর নিয়ন্ত্রণকারী ইসলামি রাজনৈতিক দল। ২০০৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আল ফাতাহকে হারিয়ে অধিকাংশ আসন জিতে ২০০৭ সালের জুন থেকে গাজা ভূখন্ড শাসন করে আসছে। ইসরাইলী অবৈধ দখলদারির বিরুদ্ধে প্রথম ইন্তিফাদার মধ্য দিয়ে ১৯৮৭ সালে হামাসের আবির্ভাব। তারা ইসলামের সুন্নি অনুসারীদের একটি সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শুরুতে হামাস মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের প্যালেস্টাইন শাখা হিসেবেই পরিচিত ছিল। ইয়াসির আরাফাত অনুসারী ফাতাহ ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল অধিকৃত ভূমি থেকে ইসরাইলী সৈন্যদের প্রত্যাহারকে সমর্থন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল এবং প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের মধ্যে ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিমতীর এবং গাজা উপত্যকার কিছু অংশের ওপর সীমিত প্যালেস্টাইন কর্তৃত্ব অর্জিত হয়। এই কথিত শান্তিচুক্তি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার এনে দিলেও সমস্যার কসমেটিক ট্রিটমেন্ট কেবল করেছে, ভেতরের সমস্যা মেটায়নি। হামাস মনে করেছে এই চুক্তিতে প্যালেস্টাইনের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। হামাস এবং ফাতাহ দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকটিত হয়। এই দ্বন্দ্ব প্যালেস্টাইনের স্বার্থকে বিঘিœত করে। ফাতাহ ও হামাসের বিরোধ এবং সশস্ত্র লড়াই প্যালেস্টাইন আন্দোলনের পৃষ্ঠদেশে মারাত্মক ছুরিকাঘাত করে। ফাতাহ ও হামাসের দ্বন্দ্ব ২০০৭-এর জুনে তুঙ্গে ওঠে। গাজা উপত্যকায় তাদের সশস্ত্র সংঘাতই গাজার যুদ্ধ, তাতে হতাহত অনেক নাগরিক।

১৯৪৮ থেকে লাগাতার প্যালেস্টাইনি বঞ্চনা অব্যাহতই রয়েছে, নিপীড়ন ও উৎপাটন চলছে টানা ৭৫ বছর। পশ্চিম প্রতারণামূলক মানবাধিকারের গীত গেয়ে ইসরাইলকে বিশে^র অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছে। এখন কার্যত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ জায়োনিস্ট স্বার্থের কাছে বন্দি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল নীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ সদ্য পদত্যাগকারী স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা জস পল মূলত রাষ্ট্রীয় সমর্থনে মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের ইসরাইলপ্রীতির প্রতিই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। প্যান-ইসলামিজমের হাঁকডাক যতই দেয়া হোক না কেন, এটা মানতেই হবে যে, ২৩টি আরব দেশ, ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র এবং ২০০ কোটি মুসলমান মিলে অবরুদ্ধ গাজায় মৃত্যু-উন্মুখ মুসলমানদের বাঁচাতে তিন সপ্তাহে এক বোতল পানি পাঠাতেও সমর্থ হয়নি। ৫৭টি মুসলিম দেশে কার্যত তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠেনি। ২৩ লাখ জন-অধ্যুষিত ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের গাজা উপত্যকা এখন যমপুরী। গাজা মূলত পাখির খাঁচা। দু’দিকে ইসরাইল, এক দিকে ভূমধ্যসাগর। অন্যদিকে মিসর দিয়ে অবরুদ্ধ।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ও চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভ ছাড়া গোটা পৃথিবীর নীরব ভূমিকা কেবল দুঃখজনক নয়, লজ্জাজনকও বটে। মুসলমানরা আজ অভিভাবকহীন। মুসলমানের শত্রু মুসলমান। জাতিসংঘ ও ২০০ কোটি মুসলমানের প্রতিনিধিত্বকারী ওআইসি কাগুজে বাঘ। ফিলিস্তিন ভূখন্ডের সাথে যুক্ত মিসরের জনগণের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে এটি প্রতিভাত হয়, নিকট ভবিষ্যতে সিরিয়া ও লেবাননে ইসরাইলীরা সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নতুন ভূখন্ড দখল করে নেবে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ক্রমবর্ধমান ইহুদিদের বসতি স্থাপনে তাদের জায়গা প্রয়োজন। সিরিয়া ও লেবানন আক্রান্ত হলে বর্তমান মিত্র চীন ও রাশিয়া তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে বলে মনে হয় না। ইরাক ও আফগানিস্তান রক্ষায় তাদের কোনো মিত্র এগিয়ে আসেনি। মক্কা-মদিনাসহ মধ্যপ্রাচ্যের এক বিরাট ভূখন্ড নিয়ে স্বপ্নের এক ইসরাইল গড়ার যে পরিকল্পনা জায়নবাদী পন্ডিতদের আছে, তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে চায় ইহুদিরা।

 

পৃথিবীতে কোনো রক্ত বৃথা যায় না। গাজার নিরীহ শিশু ও মহিলাদের আত্মদানও বৃথা যাবে না। মৃত্যু ও ধ্বংসের মধ্যেও হামাস যোদ্ধারা নতুন স্বপ্ন দেখছে। নতুন ইতিহাস গড়ায় মুমিনদের এগিয়ে যেতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানবতাবাদী মানুষের সমর্থন রয়েছে ফিলিস্তিনের অসহায় মানুষদের প্রতি। এ মুহূর্তে এটিই বাস্তবতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ