শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪
Online Edition

তুষ ও হারিকেন পদ্ধতিতে হাঁসের ডিম ফুটিয়ে স্বাবলম্বী মদনের  ইয়াছিন মিয়া

 

জাকির আহমেদ, মদন (নেত্রকোনা) : প্রাকৃতিক উপায়ে হাঁসের ডিম ফুটিয়ে স্বাবলম্বী মদনের ইয়াছিন মিয়া। তার হাত ধরে দেশ বিদেশের শত শত নারী পুরুষ একই প্রদ্ধতিতে এখন ডিম ফোটানোর কাজে নিয়োজিত। উপজেলার তিয়শ্রী ইউনিয়নের কোঠুরীকোণা গ্রামের মৃত আক্কল আলীর ছেলে ইয়াছিন মিয়া। বর্তমানে গ্রামটি হাঁস হ্যাচারি পল্লী নামে স্বীকৃতি লাভ করেছে। তুষ ও হারিকেনের আলোতে হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর কাজে নিয়োজিত এ গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবার। এ পদ্ধতিতে প্রতিদিনেই  ফুটছে হাঁসের লক্ষাধিক বাচ্চা। আর এই হাঁসের বাচ্চা দেশে-বিদেশে বিক্রি হচ্ছে।  করোনার কারণে এ শিল্পটি কিছু দিন ধস নেমেছিল। এলাকার বাইরে তাদের ফোটানো বাচ্চা বিক্রি করতে পারেনি। ফলে খামারিরা আর্থিক সংকটে পড়েছিল। করোনার সংকট কাটিয়ে আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন খামারিরা। বর্তমানে প্রতিদিনেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রেতারা ভিড় জমায় হ্যাচারি পল্লীতে। প্রযুক্তিগত দিক দিয়েও পিছিয়ে নেই হ্যাচারি পল্লীর লোকজন। অনলাইনে অর্ডার করলেও নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছে যায় হাঁসের বাচ্চা।

প্রাকৃতিক উপায়ে মুরগী ডিমে তাপ দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। সেখান থেকেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডিম ফোটানোর যন্ত্র ইনকিউবেটরের আবিষ্কার। ব্যবসার জন্য এক সঙ্গে অধিক পরিমাণে ডিম ফোটানোর ক্ষেত্রে ইনকিউবেটরের বিকল্প নেই। এর জন্য প্রয়োজন বিদ্যুৎ।

কিন্তু কোঠুরীকোনা হ্যাচারি পল্লী হাওরাঞ্চল হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং হতেই থাকে। তাছাড়া অনেকের এই যন্ত্রটির কেনার সামর্থ্য না থাকায় তারা এটি ব্যবহার করতে পারছেন না। তাই তারা তুষ ও হারিকেনের আলোতে হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে ভাগ্যের চাকা বদল করেছেন। প্রথমে ভালো জাতের হাঁসের ডিম সংগ্রহ করেন হ্যাচারি খামারিরা। ডিম সংগ্রহের পর সেগুলো পানিতে পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়।

এর পর বাছাই করা ডিম মাটি বা ইটের তৈরি পাকা ঘরের মধ্যে বাঁশের মাচায় সারিবদ্ধভাবে রেখে তোশক বা মোটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। মাচার নিচে হারিকেন বসিয়ে পরিমাণ মতো তাপ দেওয়া হয়। ২৫ দিন পর ডিমগুলো ফুটতে শুরু করলে কাপড়ের আবরণ তুলে নেওয়া হয়। ২৮ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়। প্রতিটি একদিন বয়সের হাঁসের বাচ্চা ২০-৩০ টাকায় বিক্রি হয়। উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের সংখ্যা একেবারে কম নয়। ছোট হলেও এসব উদ্ভাবন দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। এগুলো মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনেও সহায়ক বলে মনে করছেন সচেতন মহল।  এক সময় ওই গ্রামের লোকজন কাজের সন্ধানে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতেন। অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটত পরিবার গুলোর। ১৯৯০ সালের দিকে কোঠুরীকোনা গ্রামের সফল চ্যারির মালিক ইয়াছিন মিয়ার বড় ভাই হাদিস মিয়া প্রথমে নিজ বাড়িতে তুষ ও হারিকেনের আলোর পদ্ধতিতে ডিম থেকে হাঁসের বাচ্চা ফুটানোর কাজ শুরু করেন। পরে গ্রামের শতাধিক লোকজন হাদিস মিয়ার সহযোগিতায় ওই পদ্ধতি অবলম্বন করেন। এ গ্রামে বেকার বলতে কাউকে চোখে পড়ে না। প্রত্যেকটি পরিবারে ছেলে-মেয়েরা ওই পেশায় নিয়জিত রয়েছেন। এরি মধ্যে স্বাবলম্বী হয়েছেন গ্রামের অধিকাংশ পরিবার। হ্যাচারি পল্লী কোঠুরীকোনার ইয়াসিন মিয়া এ পদ্ধতি শিখে স্বপ্ন জয় করেছেন।

 সফল হ্যাচারির মালিক ইয়াছিন মিয়া বলেন, দেশের বেকারত্ব ও আত্মসামাজিক উন্নয়নের লক্ষে বিগত ১৯৯০ দশকে সর্ব প্রথম স্থানীয়ভাবে পরিকল্পিত উদ্দ্যোগে তুষ ও হারিকেন পদ্ধতিতে ২০০০ হাঁসের ডিম দিয়ে হাঁসের বাচ্চা ফুটানোর এক পদ্ধতি আবিষ্কার আমার ভাই হাদিস মিয়া। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটার পর একদিন বয়সের বাচ্চাগুলো স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি করে। ১৫-২০ দিনের মধ্যে ভাইয়ের এই সফলতা দেখি। পওে আমিও এ কাজে নিয়োজিত হই। বর্তমানে নিজ এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অগণিত নারী পুরুষ  আমার নিকট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এ কাজ করছেন। আমি এ পর্যন্ত  নিজ উপজেলায় ১৪০০ জন এবং প্রতিবেশী ভারতের মেঘালয়ে ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেই। এ সময় আমার কিছুই ছিল না। এ পেশায় নিয়োজিত থেকে ছেলেদেরকে পড়াশোনা করিয়েছে। বড় একটি বাড়ি করেছি। জমি কিনেছি। মাশাল্লাহ সংসার ভালই চলছে। 

আমার স্থাপিত হ্যাচারি জেলা প্রশাসক,  প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা,ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ইউরোপিয় ইউনিয়ন দেশ বিদেশ থেকে আসা সাংবাদিকসহ সরকারি বেসরকারি প্রতিনিধি দল পরিদর্শন করেন। 

উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা তাইরান ইকবাল বলেন, এ গ্রামে দেড় শতাধিক পরিবার হাঁস হ্যাচারি শিল্পের সাথে জড়িত। ইয়াছিন মিয়াসহ সবাই স্বাবলম্বী হচ্ছে। আমরা প্রায়ই হ্যাচারি গুলো পরিদর্শন করে হাঁসের রোগ প্রতিরোধের টিকা দিয়ে যাচ্ছি। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ