শুক্রবার ১২ জুলাই ২০২৪
Online Edition

জাতিসংঘ ও মানব উন্নয়ন

 বিশ্বশান্তি, বিভিন্ন জাতিরাষ্ট্র তথা দেশের মধ্যে সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিবাদ মীমাংসা করার মহতি উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর বিশ্বের ৫১টি রাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদ স্বাক্ষর করার মাধ্যমে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দীর্ঘকালের পরিক্রমায় এই বিশ্বসংস্থা স্বীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে কতখানি সফল হয়েছে তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

বিশেষ করে জাতিসংঘ মানব উন্নয়নে কতখানি সাফল্য দেখিয়েছে সে বিষয়টি এখনবশ্বিক আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সার্বিক দিক পর্যালোচনায় আন্তর্জতিক সংস্থাটি সে লক্ষ্য অর্জনে খুব একটা সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্বসহ চলমান নানা সঙ্কট নিরসনে ২০১৫ সালে ১৭টি বিস্তৃত ক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করে জাতিসংঘ। এরমধ্যে রয়েছে চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিরসন, পানীয় জলের অ্যাক্সেস প্রদান, লিঙ্গ বৈষম্য দূর এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। নাম দেওয়া হয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণ করার প্রতিশ্রুতিতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে খোদ এই বিশ^সংস্থাটি।

লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য সম্প্রতি নিউইয়র্কে সদর দপ্তরে জরুরি বৈঠকে বসেছিল জাতিসংঘ। সাধারণ পরিষদের এ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন বিশ্ব নেতারা। সেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে মানবতার উন্নতির জন্য মূল লক্ষ্যগুলো পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। খসড়া অনুসারে মানুষ, গ্রহ, সমৃদ্ধি, শান্তি ও অংশীদারত্বের জন্য সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন তারা। অধিবেশনে দাবি করা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারি চরম দারিদ্র্য মোকাবিলায় অগ্রগতি অনেকটা স্থবির করে দিয়েছে। একই গতিতে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের পরও সাড়ে ৫৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বাস করবে। আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চল বেশির ভাগই এ দুর্দশার সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মূলত, করোনা মহামারি বৈশ্বিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। দারিদ্র্যের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটাই। যা ২০০৫ সালের পর আর দেখা যায়নি। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোও ক্রমবর্ধমান ধ্বংসাত্মক মাত্রা দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে বর্তমানে ১১০ কোটি মানুষ শহরাঞ্চলের বস্তিতে বসবাস করছে। ২শ কোটির বেশি মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। হাজারে ৩৮ শিশু তাদের পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগেই মারা যায়।

 কোভিড মহামারি থেকে শুরু করে ইউক্রেনের যুদ্ধ সব কিছুর ভারেই পঙ্গু হয়ে পড়েছে বিশ্বের অর্থনীতি। ঋণের ভারে ভেঙে পড়ছে অনেক দেশ। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৫০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তর অর্থনীতি ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-২০-এর শীর্ষ সম্মেলনে তার পরিকল্পনা ইতিবাচক সমর্থন পেয়েছে।

দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, শিক্ষার, সুপেয় পানি ও সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা এবং শান্তিতে বসবাস এসব উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো মূলত পরস্পর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো বেশির ভাগ উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোকে ক্ষুণ্ন করছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফসল নষ্ট হয়, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে। এজন্য ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। ইউএনডিপির প্রধান আচিম স্টেইনারের মতে, ‘আমরা যদি দারিদ্র্য দূর করার কথা চিন্তা করি, তাহলে আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টিও ভাবতে হবে।’ কারণ বিদ্যুৎ সরবরাহের দিকে মনোযোগ দিলে কার্বন নিঃসরণের হার কমানোর সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য দূর করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াও সম্ভব। এসব বিষয়ে জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বরাবরই আশার বাণী শোনালেও তা রীতিমত কথামালার ফুলঝুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

খোদ জাতিসংঘের আত্মস্বীকৃতিতেই প্রমাণ হয়েছে, মানব উন্নয়নে বিশ্বসংস্থাটি যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করেছে তা প্রায় ক্ষেত্রেই সফলতার মুখ দেখেনি। তাই এ বিষয়ে নতুন করে কার্যকর ও ফলপ্রসূ দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সেসব যথাযথভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ এসেছে বিশ্বের আত্মসচেতন মানুষের পক্ষ থেকে। অন্যথায় মানব উন্নয়নে জাতিসংঘ গৃহীত পদক্ষেপ নিষ্ফলাই থেকে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ