শুক্রবার ১২ জুলাই ২০২৪
Online Edition

ডাক্তারের সিরিয়ালে ভোগান্তি

অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল বিন আমীন 

চিকিৎসা মহান পেশা। এ পেশায় ইচ্ছে করলেই আসা যায় না। আসার জন্য কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যাবসায় প্রয়োজন হয়। যারা মেধাবী তারাই কেবল সুযোগ পায় মহান পেশায়। কেউ কেউ ডাক্তার হওয়ার পর আর সে কথা আর মনে রাখেন না। ভুলে যান নীতি নৈতিকতার কথা, ভুলে যান মানবতার কথা। ফলে সেখানে মানবিকতা বিপর্যস্ত হয়। ডাক্তারের সিরিয়াল, ডাক্তারের ব্যবহার ও ডাক্তারের বাণিজ্যিকরণ বিষয়গুলো এখন ওপেন সিক্রেট। সব ডাক্তার খারাপ তা আমি বলছি না। ভালো ডাক্তার নিশ্চয় আছেন, তা না হলে অবস্থা তো আরও খারাপ হয়ে যেত। 

একজন রোগী বুকভরা আশা নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। কিন্তু মন খুলে কথা বলতে পারেন না। চেম্বারের ভেতরে যেতে আর আসতেই সময় পার। কম সময়ে বেশি রোগী দেখার প্রবণতা বন্ধ না হলে রোগীদের ভোগান্তি কমবে না। একজন ডাক্তারকে সিরিয়াল দিয়ে দেখাতে কত যে ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় তা ভুক্তভোগী রোগী ব্যতীত অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারবে না। অথচ বুকফাটা কষ্ট আর মর্মবেদনা নিয়ে বহু রোগীকে ফিরে আসতে হয়। একজন ডাক্তারের ভালো ব্যবহার একজন অসুস্থ রোগীকে সুস্থ করে তোলতে ওষুধের মতো কাজ করে। অথচ কিছু কিছু ডাক্তারের ব্যবহার সন্তোষজনক নয়।

চিকিৎসার ধর্ম সেবা করা; বাণিজ্য করা নয়। অথচ সর্বত্র বাণিজ্যের ছড়াছড়ি। কাক্সিক্ষত মানের সেবা পাওয়া মানে সোনার হরিণ। ফলে জ্বর কিংবা ঠান্ডা সারতে অনেকে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশের সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে। দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হলেও সেবার মান বাড়েনি; বরং ভোগান্তি পিছু ছাড়ছে না। বিশেষ করে ডাক্তারের সিরিয়াল বিড়ম্বনা। ভালো ডাক্তার না হলেও প্রচার প্রচারণায় বহু ডাক্তারের সুনাম যখন তুঙ্গে উঠে যায় তখন তারা সিরিয়াল ব্যতীত রোগী দেখেন না। এতে  রোগীদের ভোগান্তি বাড়ে। অনেকে সিরিয়াল দিতে পারেন না। কারণ নির্দিষ্ট সময়ে সিরিয়াল দিতে হয়। সপ্তাহে ১ দিন মাত্র সিরিয়াল। সময় সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে  সিরিয়াল নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু একসাথে সবাই ফোন করার কারণে সে সময় মোবাইলে সংযোগ পাওয়া যায় না। ভাগ্যক্রমে পাওয়া গেলেও নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে জীবন শেষ। ফলে রোগীদের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। এ বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। যেসব ডাক্তারের সিরিয়াল পেতে দিন কিংবা মাস পার হয়ে যায় সেসকল ডাক্তার বর্জন করা উচিত।

আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মান কেমন করোনাকালে চোখে আঙ্গুল দিয়ে জানান দিয়েছে। তারপরও সেবার মান বাড়েনি; বরং বাণিজ্যিকীরণ বেড়েছে। ডাক্তারদের প্রতি রোগীদের অবিশ্বাস বেড়েছে। কারণ ভুল চিকিৎসা ও কিছু ডাক্তারের অনৈতিকতার ফলে মানুষের আস্থা কমেছে। অথচ মানুষ ভাল চিকিৎসার প্রত্যাশায় ডাক্তারের নিকট ছুটে যায়। একজন ডাক্তারের কাছে রোগীদের প্রত্যাশা ডাক্তার সময় নিয়ে দেখবেন। মনের কথাগুলো ডাক্তারকে বলবেন। কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায় না। কিছু ডাক্তার অযথা ২০ থেকে ৩০টি টেস্ট হাতে ধরিয়ে দেন। পছন্দের ডায়াগনিস্টক সেন্টার থেকে টেস্ট করার পরামর্শ দেন। যুতসই জায়গা থেকে টেস্ট না করলে রিপোর্ট পর্যন্ত দেখেন না। রোগীর সাথে ভালো ব্যবহার করেন না। সিরিয়াল দিয়েও সরাসরি ডাক্তারের সাথে সব সমস্যার কথা বলা যায় না। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগেই একজন সহকারী জেরা করে রোগীকে কোণঠাসা করে ফেলেন। ফলে রোগীরা ডাক্তারের কাছে গিয়ে ভয়ে আরও তটস্থ হয়ে পড়েন। সমস্যার কথাগুলো বলতেই পারেন না। ফলে অসন্তুষ্ট বাড়ছে। অথচ রোগী আর ডাক্তারের মধুর সম্পর্ক কাম্য। কিছু ডাক্তারের বিরুদ্ধে যেমন বিস্তর অভিযোগ আছে, তেমনিভাবে কিছু ভালো ডাক্তারও আছেন। আমার পরিচিত একজন ডাক্তার ৩০ মিনিট সময় ধরে রোগী দেখেন। রোগীর সাথে খোশগল্প করে রোগীকে মুগ্ধ করে ফেলেন। এমন ডাক্তারের সংখ্যা  বাড়লে রোগীদের বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি কিছুটা হলেও দূর হবে।

আমাদের বিশ্বমানের ডাক্তার আছে। অথচ রোগীরা বিদেশমুখী। ফলে অধিকাংশ রোগী ভিনদেশে পাড়ি জমায়। তার কিছু অন্তর্নিহীত কারণও আছে। সমাজে চাউর আছে যে, আমাদের ডাক্তারের ব্যবহারের চেয়ে ভিনদেশীয় ডাক্তারের ব্যবহার অনেক ভালো। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২২ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিতে বিদেশে যায়। এ প্রবণতা বন্ধ করার জন্য চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন করা প্রয়োজন। সিরিয়ালের ভোগান্তি দূর করার জন্য রেফারেল সিস্টেম পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। অর্থাৎ জুনিয়র ডাক্তার দেখার পর সিনিয়র ডাক্তার দেখবেন। জুনিয়র ডাক্তার কী পরামর্শ দিয়েছেন তা সিনিয়র ডাক্তারকে দেখে চিকিৎসা শুরু করবেন। রেফারেল সিস্টেম চালু হলে পরে জুনিয়র ডাক্তারগণও রোগী পাবেন। অপরদিকে রোগীরাও বারবার ডাক্তার পরিবর্তন করবেন না। আমাদের দেশের রোগীরা জ¦র কিংবা কাশি হলে পরে প্রফেসর লেভেলের ডাক্তার দেখাতে চায়। রোগীরা মনে করে প্রফেসর মানে বড় ডাক্তার।  জুনিয়র চিকিৎসকরা যখন জটিল রোগী পাবেন তখন তারা প্রফেসরদের কাছে রেফার্ড করে দিবেন। এতে জুনিয়র ডাক্তার যেমন শিখবে তেমনিভাবে  রোগীর চাপও কমবে। জুনিয়র ডাক্তার মনঃপুত সেবা দিতে না পারলে প্রফেসর ডাক্তার দেখানোর দরকার নেই।

আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মান কত উন্নত তা বুঝার জন্য মহাপন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ঢাকা শহরের যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল ভিজিট করলেই উত্তর পাওয়া যাবে। কী সকাল কী রাত ২৪ ঘন্টা রোগীর চাপে লোকারণ্য। থানা কিংবা জেলা পর্যায়ে ভালো মানের চিকিৎসক পাওয়া গেলে রোগীরা শহরমুখী হতো না। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জ্ঞানী-গুণীরা পর্যন্ত প্রফেসর ডাক্তার খোঁজে বেড়ান। অথচ চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রফেসর হওয়া জরুরি নয়। আমার পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে নামিদামি ডাক্তারের ধারে কাছেও যাই না। কারণ যার চাহিদা বেশি তার সময় কম। আমার আম্মার মাথার তিনবার সার্জারি অপারেশন করা হয়েছে। যিনি করেছেন তিনি খুব নামকরা ডাক্তার তা কিন্তু নন! কিন্তু তিনি যে দরদ দিয়ে আম্মার সেবা দিয়েছেন তা ভুলার মতো নয়। আম্মার সমস্যা হলে তার শরণাপন্ন হই। তিনি কখনো অহেতুক টেস্ট দেননি। এমনকি আম্মার অপারেশনের পর যখন জ্ঞান ফিরছিল না তখন তিনি কম পয়সার মধ্যে আইসিওর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সে দিনের সে বেদনাদায়ক স্মৃতির কথা মনে হলে আজোও তার জন্য প্রাণ খোলে দোয়া করতে ইচ্ছে করে।

 

ডাক্তারের সিরিয়াল না পাওয়ার আর একটি কারণ হচ্ছে ভিআইপি সংস্কৃতি। অনেক হাসপাতাল ও ডায়াগনিস্টক সেন্টারে ভিআইপিদের বিনা নোটিশে চেম্বারে আসার ফলে সাধারণ রোগীরা বিড়ম্বনার শিকার হন। আমাদের দেশে ভিআইপি যাতায়াতের জন্য গণপরিবহণে সাধারণ মানুষের হয়রানির ঘটনা নতুন নয়। ২০১৯ সালে একজন ভিআইপি আসাকে কেন্দ্র করে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে ফেরি আটকে রাখার কারণে নড়াইলের একটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যু হয়। আমাদের দেশে শিক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যকরণ হয়। অথচ এ দুটোই সেবামূলক হওয়ার কথা ছিল। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা যদি সঠিকভাবে সেবা দিতো তাহলে বেসরকারি হাসপাতালের বাণিজ্যে ভাটা পড়ে যেত। সারাদেশে থানা সদর পর্যায়ে হাসপাতাল আছে। কিন্তু চিকিৎসক নেই। এসব হাসপাতালের আউটডোর হাজারো রোগীর অপেক্ষমান। কিন্তু চিকিৎসক মাত্র কয়েকজন। ফলে রোগীকে এক মিনিটের মধ্যে কথা শেষ হতে না হতে প্রেশক্রিপশন নিয়ে বাইরে চলে যেতে হয়। অনেক সময় তাড়াহুড়া করে রোগ নির্ণয় করাও সম্ভব হয় না। ফলে রোগীরা ভুল চিকিৎসার শিকার হন। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানোর স্বার্থে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে রেফারেল সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন। যেন ডাক্তারের সিরিয়ালের বিড়ম্বনায় পড়ে রোগীর জীবন বিপন্ন না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ