বৃহস্পতিবার ১৩ জুন ২০২৪
Online Edition

অকস্মাৎ প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট: বাংলা ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েনের আভাস

 আসিফ আরসালান

দেশের মধ্যে বিশেষ করে রাজনৈতিক ফ্রন্ট এই মুহূর্তে উত্তাল না হলেও দেশের মধ্যেই অন্যান্য ফ্রন্ট বিশেষ করে বিচার বিভাগে রাজনীতির ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এছাড়া দেশের ভেতরে এবং বাইরে এমন কতগুলো ঘটনা ঘটছে যার অনিবার্য প্রভাব রাজনীতিতে এসে পড়ছে। দেশে সংবাদ প্রবাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে। অনেক খবর আছে যেগুলো আমরা দেশের মধ্যে জানতে পারি না। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বদৌলতে আজ তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে আপনার কম্পিউটার বা মোবাইলে একটি বা দুটি ক্লিক দিলেই আপনি ওয়াশিংটন, লন্ডন বা পৃথিবীর যে কোনো রাজধানীতে পৌঁছে যেতে পারেন। তারপরেও সরকার যে কেন তথ্য প্রবাহের গতিপথে প্রায়শই ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে তাকে আটকাতে চেষ্টা করেন সেটি আমার বোধগম্য নয়। 

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে পাকিস্তান আমলের কথা। পাকিস্তানের ২৪ বছরের মধ্যে ১২/১৪ বছরই কেটে গেছে সামরিক ডিক্টেটরদের শাসনে। এছাড়া ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ ঐ দেশটির শাসনতন্ত্র চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশটি ব্রিটিশ প্রণীত ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ১৯৪৭-৫৬ পর্যন্তও দেশটিতে নামে মাত্র পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি থাকলেও প্রেসিডেন্ট বা গভর্নর জেনারেলের বিপুল ক্ষমতা ছিল। আমরা সেই বিষয়টির আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে ঐ সময় বার্তা সংস্থা বা পত্র পত্রিকার স্বাধীনতা অবাধ ছিল না। এই কথাটি বিশেষ করে সাবেক পূর্ব বাংলা বা পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে প্রযোজ্য ছিল। প্রায়শই সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধী দলের আন্দোলনের খবর গ্যাগ করা হতো (কন্ঠ রোধ করা হতো)। 

এসব কারণে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের টেলিভিশন, রেডিও এবং এক শ্রেণীর সংবাদ পত্রের ওপর থেকে জনগণ ক্রমশ আস্থা হারাতে থাকেন। তখন দেখা যায় যে বিবিসির বাংলা সংবাদে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের খবর হাইলাইট করা হতো। আস্তে আস্তে অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়ায় যে জনগণ ধীরে ধীরে সন্ধ্যা বেলার প্রবাহ শুনতেন। সেই সময় বিবিসি বাংলা সংবাদের নাম ছিল প্রবাহ। এরপর অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সময় পর্যন্ত মানুষ একদিকে বিবিসি, অন্যদিকে ভয়েস অব আমেরিকা এবং অন্য দিকে অল ইন্ডিয়া রেডিও, কলকাতা শুনতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় অল ইন্ডিয়ার ভাষ্যকার দেব দুলাল বন্দোপধ্যায় এমনভাবে খবর পড়তেন যে এক শ্রেণীর মানুষ রূপক অর্থে তাকে জেনারেল দেব দুলাল বন্দোপধ্যায় নামে অভিহিত করতেন। 

একটু পেছনের ইতিহাস টানতে হলো এজন্য যে এখন বাংলাদেশের অবস্থা ঠিক সেই রকম না হলেও প্রায় তার কাছাকাছি চলে গেছে। এখন অনেক খবরই পাওয়া যায়, যেগুলো ইলেকট্রনিক মাধ্যম টেলিভিশন এবং গণমাধ্যম সংবাদপত্রে প্রায় থাকে না বললেই চলে। যখন কিছু কিছু সংবাদ ছাপা হয় তখন সেগুলো ভেতরের পৃষ্ঠায় বা শেষের পাতায় তাদের ট্রিটমেন্ট এমনভাবে দেওয়া হয় যে সেগুলো মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে জনগণ পূর্ণাঙ্গ খবর থেকে এখন আর বঞ্চিত হন না। এরমধ্যে তথ্য প্রবাহের কল্যাণে ইন্টারনেটে এসেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফেসবুক এবং ইউটিউবে বাংলাদেশের অনেক খবর এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সচিত্র বিবরণ, অর্থাৎ ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা হয়। শুধু তাই নয়, এখন পৃথিবীর যে কোনো পত্র পত্রিকা আপনি দেখতে ও পড়তে পারেন যদি আপনি সেই পত্রিকার নামটি সঠিকভাবে বানান করে গুগলে সার্চ দিতে পারেন। 

॥ দুই ॥

বিগত ২/৩ সপ্তাহের মধ্যে দুই একটি বাংলা পত্রিকা বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলাদেশ সম্পর্কিত পলিটিক্যাল নিউজের বাংলা অনুবাদ করে ছাপিয়েছে। ইতোমধ্যে যেসব বিদেশী গণমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিশেষ রাজনৈতিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ^ বিখ্যাত ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’, ‘দি ডিপ্লোম্যাট’, ‘ওয়াশিংট পোস্ট’, জাপানের ‘নিক্কেই’, ‘আল জাজিরা’, ‘বিবিসি’, ভারতের ‘দি টাইমস অব ইন্ডিয়া’, ‘দি হিন্দুস্তান টাইমস’, ‘দি হিন্দু’, ‘দি টেলিগ্রাফ’, ‘আনন্দ বাজার পত্রিকা’ ইত্যাদি। আরো আছে নর্থ ইস্ট ইত্যাদি। 

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো এই যে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারতের সর্ব বৃহৎ বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) একটি বিশেষ সংবাদ পরিবেশন করেছে। ঐ সংবাদের যে ইংরেজি হেডিং তার বাংলা অর্থ হলো, “বাংলাদেশে গণতন্ত্র লাইফ সাপোর্টে”। পিটিআইয়ের মতো বার্তা সংস্থায় এমন একটি মারাত্মক সংবাদকে কোনো অবস্থাতেই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। কারণ পিটিআই সরাসরি ভারতের ফেডারেল সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত না হলেও সরকারের একটি বিরাট প্রভাব এই বার্তা সংস্থা অর্থাৎ পিটিআইয়ের ওপর রয়েছে। এছাড়া এই বার্তা সংস্থাটি শুধুমাত্র ভারতেই নয়, বিশ^জোড়া বিশ^াসযোগ্যতা অর্জন করেছে। কারণ তারা বিশ^বিখ্যাত ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাথে কানেক্টেড। এসব বার্তা সংস্থা এবং পিটিআইয়ের মধ্যে সংবাদের আদান প্রদান হয়। এসব কারণে পিটিআই সাধারণত কোনো দায়িত্বহীন সংবাদ পরিবেশন করে না। পিটিআইয়ের এই সংবাদ সুনিশ্চিতভাবে এই তাৎপর্য বহন করে যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদির সরকার বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারকে অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তের জন্য তেমন দৃঢ়ভাবে সমর্থন দেবে না, যেভাবে তারা ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে দিয়েছিল। 

এছাড়া নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশেষ রিপোর্টটি অনেক বড় এবং অনেকগুলো ছবিতে পরিপূর্ণ। মুজিব মাশাল নামক নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিনিধি এই রিপোর্টটি তৈরি করার জন্য দুই দফা বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই দুই দফায় বাংলাদেশে তিনি ৩০ থেকে ৩৫ দিন অবস্থান করেছেন। তার রিপোর্ট কাম রাজনৈতিক ভাষ্যে এমন সব তথ্য দেওয়া হয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের মানুষও পুরোপুরি জানেন না। সেজন্যই বলছি যে এখন আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবাধ সংবাদ প্রবাহে বিঘœ সৃষ্টি করে কোনো লাভ নাই। এরমধ্যে বাংলাদেশে দুই তিনটি ঘটনা ঘটে গেছে যেটি সারা বিশে^ আলোড়ন তুলেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকারের’ সম্পাদক আদিলুর রহমান এবং পরিচালক এলান খানকে দুই বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের একটি সমাবেশ হয়। ঐ সমাবেশে সাধারণ মানুষসহ লক্ষাধিক মুসল্লি যোগদান করেন। সন্ধ্যাবেলা ঘোষণা করা হয় যে এই সমাবেশটি সন্ধ্যার পরেও সারা রাত শাপলা চত্বরেই অবস্থান করবে। সরকার ওপর দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু দিন শেষে গভীর রাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে অভিযান চালায়। পবিত্র ফজরের পূর্বেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী শাপলা চত্ত্বর ক্লিয়ার করে। অর্থাৎ সমস্ত মানুষকে শক্তি প্রয়োগ করে হটিয়ে দেয়। এই শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে কিছু প্রাণহানি ঘটে বলে অধিকার একটি রিপোর্ট প্রণয়ন করে। ঐ রিপোর্টে প্রাণহানির যে সংখ্যা দেওয়া হয়েছিল সেটি সঠিক নয় বলে সরকার প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার অধিকারের এই দুই নেতার বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ ১০ বছর পর সেই মামলা পুনরুজ্জীবিত করে দ্রুত তাদেরকে সাজা দেওয়া হয়েছে। 

॥ তিন ॥ 

গত  ১৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার আদালত এই দন্ড প্রদান করে। দন্ড প্রদানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে সারা বিশে^ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মর্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই কারাদন্ড প্রদানের তীব্র বিরোধিতা করে এবং অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানায়। আমেরিকা এবং ইইউ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৭৬ টি মানবাধিকার সংগঠন এই দন্ড প্রদানের বিরুদ্ধে তড়িৎ প্রতিক্রিয়া জানায় এবং দন্ড বাতিলের দাবি করে। 

ড. ইউনূসের কাহিনী ইতোমধ্যেই সকলেই কম বেশি জেনে ফেলেছেন। তাই নতুন করে সেগুলোর আর পুনরাবৃত্তি করছি না। কিন্তু ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকারের এই মামলাবাজির ফলে সমগ্র বিশে^র ১০৬ জন নোবেল বিজয়ী এবং বারাক ওবামা, হিলারি ক্লিন্টন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, আমেরিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আলগোরে সহ বিশে^র ৮০ জন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ড. ইউনুসকে হেনস্থা করা হচ্ছে এবং তাকে ন্যায়বিচার দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন। অধিকারের দুই নেতা এবং ড. ইউনূসের ঘটনায় বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সমগ্র পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সরকার সম্ভবত এসব ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। 

দেশের মধ্যেও সরকার এমন কতগুলি কাজ করছে যা দেশের স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করবে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। সেই ২০১২-১৩, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৮ সালের পুরাতন মামলা পুনরুজ্জীবিত করে সরকার সেই সব মামলার দ্রুত শুনানী করে বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে দন্ড দান করার দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। রাজনৈতিক মহল আশঙ্কা করছেন যে নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন মামলা সমাপ্ত করে সরকার এই দুটি প্রধান বিরোধী দলকে নেতৃত্ব শূন্য করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের আমীর ড. শফিকুর রহমান, জেনারেল সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পারওয়ার, সহকারী জেনারেল সেক্রেটারি রফিকুল হোসেন, ঢাকা মহানগরী জামায়াত উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনসহ ঢাকা এবং মফস্বলের অসংখ্য জামায়াত নেতাকর্মী ইতোমধ্যে কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। বিএনপির ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি আমানুল্লাহ আমানকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির মেম্বার ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। স্ট্যান্ডিং কমিটির মেম্বার ড. মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপির অন্তত ২০০ জন নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ে চার্জশিট গঠন করা হবে। 

অবস্থা দেখে শুনে মনে হচ্ছে যে এসব দমননীতি প্রয়োগ করছে সরকার একটি রাজনৈতিক মতলব চরিতার্থ করার জন্য। সেটি হলো, এসব উস্কানি এবং দমননীতি চলতেই থাকবে যাতে করে বিএনপি এবং জামায়াত এবং সেই সাথে সমস্ত বিরোধী দল যেন নির্বাচনে না আসে। সরকার চায় একতরফা নির্বাচন। তারা ইতোমধ্যেই রুশ চীন শিবিরে ভিড়ে গেছে। কেউ আসুক আর না আসুক, প্রচন্ড বল প্রয়োগ করে হলেও একটি ভোট ডাকাতির নির্বাচন করে তারা ক্ষমতায় ফিরে আসতে চায়। 

বিএনপি জামায়াতসহ ৩৬ টি বিরোধী দলের জন্য এখন কঠোর কর্মসূচীর আর বিকল্প নাই। এসব হোমিও প্যাথিক কর্মসূচী দিয়ে এই সরকারকে হটানো যাবে না। এই সরকারকে নির্বাচনের আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে হলে তাদের আন্দোলনের মাঝে ব্রড স্পেকট্রাম এন্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। 

Email: [email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ