বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪
Online Edition

রিজার্ভে অস্থিরতা কাটছে না

 বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অস্থিরতা কোনভাবেই কাটছে না বরং যতই দিন যাচ্ছে ততই সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে টালটামাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমনিতেই দেশে চলছে তীব্র ডলার সঙ্কট। বৈদেশিক বাণিজ্যে পড়েছে ভাটির টান। রেমিট্যান্স প্রবাহেও চলছে মন্দাভাব। এমতাবস্থায় দেশের অর্থনীতি যখন রীতিমত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তখন বৈদেশিক রিজার্ভে ধারাবাহিক অবনমন পুরো পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, মাত্র আট দিনের ব্যবধানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে ১৪৭ কোটি ডলার। ফলে রিজার্ভ কমে ২ হাজার ১৭১ কোটি ডলারে এসে ঠেকেছে। যা রীতিরত অস্বস্তিকর বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বৃপস্পতিবারের এক প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্রই উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জানা গেছে, সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৩১৮ কোটি ডলার। এরপর মূলত এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দায় পরিশোধ করার কারণেই রিজার্ভ কমেছে। এই দায় হচ্ছে জুলাই-আগস্ট সময়ের আমদানির বিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্র জানাচ্ছে, আকু বিল পরিশোধের কারণে আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ২ হাজার ১৭১ কোটি ডলারে নেমেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, বর্তমানে রিজার্ভ ২ হাজার ৭৬৩ কোটি ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, গত মাসে মে-জুন সময়ের জন্য ১১০ কোটি ডলারের আকু বিল পরিশোধ করা হয়। এরপরের জুলাই-আগস্টে আমদানি কিছুটা বেশি। এ দায়ের জন্য ৫ শতাংশের বেশি হারে সুদ পরিশোধ করতে হয়। ফলে রিজার্ভ পরিস্থিতির আকস্মিক অবনতি হয়েছে।

মূলত, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি আন্ত-আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তিব্যবস্থা। এর মাধ্যমে এশিয়ার ৯টি দেশের মধ্যে যেসব আমদানি-রপ্তানি হয়, তা প্রতি দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি হয়। তবে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয়। আকুর সদস্যদেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ। তবে দেনা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সম্প্রতি এ তালিকা থেকে বাদ পড়েছে শ্রীলঙ্কা। আকুর বাকি দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে দুই মাস পরপর লেনদেনের অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এসব দেশের মধ্যে ভারত পরিশোধ করা অর্থের তুলনায় অন্য দেশ থেকে বেশি ডলার আয় করে। বাকি বেশির ভাগ দেশকে আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আকু দেশগুলো থেকে যে পণ্য আমদানি হয়, ব্যাংকগুলো তার মূল্য হিসেবে প্রতি সপ্তাহেই ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়। প্রতি দুই মাস শেষে ব্যাংকগুলোর পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ দায় পরিশোধ করে থাকে। তখন রিজার্ভ হঠাৎ কমে যায়।

২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ওই অর্থবছরে আমদানিতে খরচ হয় ৭ হাজার ৫০৬ কোটি ডলার। তার আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানিতে খরচ হয়েছিল ৮ হাজার ৯১৬ কোটি ডলার। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে আমদানি খরচ বেড়ে যায় এবং ডলারের তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। এরপর আমদানি কমাতে নানা শর্ত ও কড়াকড়ি আরোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক বসায়। এরপর কমতে শুরু করে আমদানি ব্যয়। কিন্তু আমদানি নির্ভর পণ্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনেও বড় ধরনের অবনতি ঘটে। যা সার্বিক পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে যায়। 

মূলত, নানাবিধ কারণে  আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে বৈদেশিক মুদ্রার আহরণ। রপ্তানি বাণিজ্যে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। চলমান তীব্র ডলার সঙ্কটের কারণে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় এলসি খুলতে পারছেন না। ফলে আমদানিও রীতিমত প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। সঙ্গত কারণেই বৈদেশিক বাণিজ্যের দেনা মেটাতে এখন রিজার্ভ নির্ভরতা অনেকেটাই বেড়েছে। তাই প্রতিনিয়ত কমছে বৈদেশিক রিজার্ভ। কিন্তু এই শূন্যতা কোন ভাবেই পূরুণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় চলমান ডলার সঙ্কটের সমাধানের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া দরকার। অন্যথায় আগামী দিনে বৈদেশিক রিজার্ভ পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে। যা দেশ, জাতি ও অর্থনীতির জন্য কোন সুখবর নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ