বৃহস্পতিবার ০১ জুন ২০২৩
Online Edition

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

এম এ খালেক

গত কয়েকদিন দেশের বেশ ক’জন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ হয়েছে। আলোচনাকালে তাদের নিকট জানতে চেয়েছিলাম এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি? অর্থনীতিবিদদের প্রায় সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন, এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উচ্চ মাত্রার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। বর্তমানে উচ্চ মাত্রার যে মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে তা সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। কোনোভাবেই তারা জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে পারছে না। কিন্তু সরকার উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। তাই আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি কোনোভাবেই কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাচ্ছে না। একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারের ধারণা বর্তমানে যে উচ্চমাত্রায় মূল্যস্ফীতি প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে তা সাপ্লাই সাইড থেকে হয়েছে। অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ায়  আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। তারই প্রভাবে স্থানীয় বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো আমাদের অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে। যেহেতু বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে হয়েছে তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয়ভাবে আমাদের তেমন কিছু করণীয় নেই। সরকারের এই বক্তব্য হয়তো আংশিকভাবে সত্যি। কারণ মূল্যস্ফীতির শুরুটা হয়েছিল আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবার কারণেই। এর পেছনে মূলত ইউক্রেন যুদ্ধই বেশি প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু তারপরও বিশে^র অন্যান্য তাদের নিজস্ব ম্যাকানিজম ব্যবহার করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং এ ক্ষেত্রে তারা কিছুটা হলেও সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারিনি। স্বাভাবিক অবস্থায় এই সময় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার হয়তো ৬ শতাংশ বা সাড়ে ৬ শতাংশ থাকতে পারতো। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যর্থতার কারণে আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি প্রায় ডাবল ডিজিটে চলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশে^র অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পলিসি রেট বাড়িয়েছে। পলিসি রেট বাড়ানোর কারণে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সাধারণ ঋণ গ্রহীতাদের মাঝে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমে গেছে। বাজারে অর্থ সরবরাহ কমে গেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকও গত এক বছরের ব্যবধানে পলিসি রেট অন্তত তিনবারে ১ শতাংশ বাড়িয়েছে। কিন্তু পলিসি রেট বাড়ানো হলেও ব্যাংক ঋণের সুদের আপার ক্যাপ ৯ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে। এতে বাজারে অর্থ সরবরাহ হ্রাস পায়নি। বরং অর্থ প্রবাহ আরো বেড়ে গেছে। কারণ ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ৯ শতাংশ বহাল রেখে পলিসি রেট কমানোর ফলে ঋণ গ্রহণ আগের তুলনায় সহজতর হয়েছে। ফলে ব্যাংক ঋণ প্রবাহ না কমে বরং আরো বেড়েছে। চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু গত আগষ্ট মাসে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ একই সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছে ১৪ শতাংশ। আর ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি কমেছে ৭৬ শতাংশ। তার অর্থ হচ্ছে, ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণ অন্য কোনো খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। উন্নত দেশগুলো যেখানে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। আমরা সেখানে ব্যাংক ঋণ সহজীকরণ করে চলেছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, ভারত পলিসি রেট বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট বাড়ালেও ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ বহাল রাখার কারণে এই পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত তা সময়ই বলে দেবে। 

কোনো কাজই অর্ধ সমাপ্ত রাখা ভালো নয়। এতে সুফল পাওয়া যায় না। বিশে^র যে ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বাড়িয়েছে তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাংক ঋণ গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তোলা, যাতে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমে যায়। মুদ্রা সরবরাহ কমে গেলে তার অনিবার্য প্রভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। সাধারণ ভোক্তা শ্রেণি বাজারে গিয়ে তাদের প্রযোজনীয় পণ্য ক্রয় করতে পারবে না। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা হলেও কমে আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংক উন্নত বিশে^র দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্তত তিন বার পলিসি রেট বাড়িয়েছে। আগে যেখানে পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ, এখন তা ৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিডিউল ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের ব্যয় অন্তত এক শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে সিডিউল ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের নিকট ঋণদানের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সুদ চার্জ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য ঋণের উপর সুদ আরোপের ক্ষেত্রে আপার ক্যাপ নির্ধারণ করে দেয়া আছে। এই হার হচ্ছে ৯ শতাংশ। কোনো সিডিউল ব্যাংকই উদ্যোক্তা পর্যায়ে ঋণদানের ক্ষেত্রে ৯শতাংশের বেশি সুদ চার্জ করতে পারছে না। এতে সিডিউল ব্যাংকের স্প্রেড কমে গেছে। কারণ তারা আগের তুলনায় বেশি সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলেও উদ্যোক্তাদের নিকট ঋণদানের ক্ষেত্রে বেশি সুদ চার্জ করতে পারছে না। ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে না দেবার কারণে সুবিধা পাচ্ছে ঋণ গ্রহীতাগণ। তারা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদের ঋণ নিতে পারছেন। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি। আর ব্যাংক ঋণের সুদের হার হচ্ছে ৯ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কাদের সুবিধা দেবার জন্য এখনো ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ বহাল রেখেছে তা বোধগম্য হচ্ছে না। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দিয়ে একে বাজার ভিত্তিক করার জন্য শর্ত দিয়েছে। তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দিচ্ছে না। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হচ্ছে। চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ গত আগস্ট মাসে ব্যক্তিখাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক বিবেচনা করা যেতো যদি তা শিল্পে বা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু তা তো হয়নি। একই সময়ে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি কমেছে ৭৬ শতাংশ। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছে ১৪ শতাংশেও বেশি। তার অর্থ হচ্ছে ব্যক্তি খাতে ছাড়কৃত ব্যাংক ঋণের অর্থ শিল্পে বা কোনো উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। যেহেতু উচ্চ মূল্যস্ফীতিকালে তুলনামূলক স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাচ্ছে তাই তাদের ক্ষমতা আছে ঋণ গ্রহণের তারা তা নিচ্ছে এবং অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করছে। এই ব্যাংক ঋণের অর্থ কোনো না কোনোভাবে বাজারে চলে আসছে। ফলে মূল্যস্ফীতি উস্কে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য দৃশ্যত যেসব উদ্যোগ নিয়েছে তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। 

 

এদিকে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য এবং প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ৫২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছিল রপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে প্রবাসী আয় হয়েছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি মার্কিন ডলার। এবার ১০ মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ৭৭২ কোটি মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। ফলে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম অবস্থায় বিনিময় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। বৈধ চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে যে স্থানীয় মুদ্রা পাওয়া যায় হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ দেশে প্রেরণ করলে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ পাওয়া যায়। সরকারের কিছু কার্যক্রমও মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিচ্ছে। সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করছে। এই ঋণের অর্থ কোনো উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ঋণের অর্থ কোনো না কোনোভাবেই বাজারে চলে আসছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ প্রত্যাশা মতো বাড়ছে না। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি রেশিও ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। বর্তমানে তা ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশে নেমে এসেছে। নেপালের মতো দেশের কর-জিডিপি রেশিও ২৩ শতাংশ। কর আদায়ের পরিমাণ কম হবার কারণে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা বর্তমানে ৪২ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। স্থানীয় এবং বিদেশি মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টাকার অঙ্গে যার পরিমাণ ১৮ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। সরকার উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিচ্ছে তা কোনো না কোনোভাবে বাজারে চলে আসছে। এতে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাচ্ছে। আর সরকার যখন ব্যাংক থেকে বেশি পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করে তখন ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণদান ক্ষমতা কমে যায়। তারা ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারে না। সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। রাজনৈতিক সমর্থনপুষ্ট এক শ্রেণির সিন্ডিকেট বাজারকে তাদের ইচ্ছে মতো ব্যবহার করছে। সরকার যদি বাজার ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো তাহলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা হলেও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসতো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ