বৃহস্পতিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
Online Edition

পরিচালকরা নিজেদের ব্যাংকের মালিক ভাবছে কিন্তু কেনো?

এম এ খালেক

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মাঝে মাঝেই বিভিন্ন সভায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে থাকেন। তার এসব কথা বোদ্ধাজনের মনে ভাবনার উদ্রেগ করে। আব্দুর রউফ তালুকদার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিযুক্ত হবার আগে অর্থমন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তাই তিনি দেশের ব্যাংকিং সেক্টর সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞান রাখেন। কাজেই তিনি যখন দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেন তার গুরুত্ব নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ২১তম নূরুল মতিন স্মারক বক্তৃতা ‘এথিকস ইন ব্যাংকিং’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য উপস্থাপনকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, নৈতিকতা এবং সুশাসন ব্যাংকিংয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে এর কিছু ব্যত্যয় ঘটছে। আমরা দেখেছি, কিছু ব্যাংকের পরিচালক নিজেদের ব্যাংকের মালিক মনে করছেন। আবার কিছু ব্যাংকার তাতে সহায়তাও করছেন। ব্যাংক পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনের ভূমিকা কী হবে তা নির্দিষ্ট করা আছে। সিএসআর খাতের অর্থ ব্যয়ের দুর্নীতি এবং অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি ব্যাংক তাদের কর্মীদের বার্ষিক বনভোজনে সিএসআর থেকে অর্থ ব্যয় করেছেন। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের এই বক্তব্য নানা কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একটি দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সেক্টরের গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। ব্যাংকিং সেক্টরকে একটি দেশের ‘অর্থনীতির লাইফ লাইন’ বলা হয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রা দ্রুততর এবং টেকসই হতে পারে না। বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিকশিত হয়েছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। স্বাধীনতার আগে এই অঞ্চলে ব্যাংকিং সেক্টরে তিন ধরনের মালিকানা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছিল। কিছু ব্যাংক ছিল সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনে। বেশির ভাগ ব্যাংকের মালিক ছিলেন অবাঙ্গালি। সামান্য কিছু ব্যাংক ছিল অবাঙ্গালি ও বিদেশি নাগরিকদের যৌথ মালিকানায়। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে অবাঙ্গালি ব্যাংক মালিকগণ পাকিস্তানে চলে যান। এতে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় সঙ্কট দেখা দেয়। সেই সময় রাষ্ট্রীয় অন্যতম নীতিমালা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতি বিধানের জন্য সমস্ত ব্যাংক ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসা হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ব্যাংকগুলো নানা সমস্যা আর অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। এতে ব্যাংকিং কার্যক্রম বিঘিœত হয়। পরবর্তীতে আশির দশকে ব্যক্তি মালিকানাধীনে ব্যাংক প্রতিষ্ঠান অনুমতি প্রদান করা হলে বিপুল সংখ্যক ব্যাংক স্থাপিত হয়। এসব ব্যাংকের অধিকাংশই রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া হয়। সেখানে পেশাদারিত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুকূল্যই প্রাধান্য পেয়েছে। দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং বিদেশি মিলিয়ে বর্তমানে ৬১ টির মতো ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রসঙ্গক্রমে ৯টি ব্যাংকের অনুমোদনদান কালে বলেছিলেন, দেশে আর কোনো ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারপরও ৯টি ব্যাংক অনুমোদন দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিলে তার পরিণতি যে ভালো হয় না কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল অবস্থা ইতিমধ্যেই তা প্রমাণ করেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার যে মন্তব্য করেছেন তা সম্ভবত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক সম্পর্কিত। কারণ ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালক এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালকদের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে যারা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তারা হচ্ছেন স্পন্সর ডিরেক্টর। অর্থাৎ তারা নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালক নিযুক্ত হন। কাজেই তারা ব্যাংকের মালিক এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে যারা পরিচালক নিযুক্ত হন তারা কোনোভাবেই ব্যাংকের মালিক নন। তারা সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যাংকের পরিচালক নিযুক্ত হন। তাদের ব্যাংকে কোনো বিনিয়োগ করতে হয় না। সাধারণত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ এবং সৎ ব্যক্তিদেরই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাবার কথা। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? গত শতাব্দির নব্বইয়ের দশক থেকে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হবার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালক নিয়োগদান শুরু হয়। দিন দিন এই প্রবণতা শুধু বাড়ছেই। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পরিচালনা বোর্ডে নিয়োগদান শুরু হয়। সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ সৎ হবেন এই প্রত্যাশায় তাদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এছাড়া শুধু দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এমন কিছু ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে নিয়োগ দেয়া হয় যাদের ব্যাংক ও অর্থনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম কোনো ধারণা ছিল না। এরা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে পরিচালকের দায়িত্ব পাবার পর তারা এমন তৎপরতা শুরু করেন তা দেখে অনেকের মনেই প্রতীতী জন্মাবে যে তিনি সম্ভবত ব্যাংকের মালিক। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের যারা পরিচালক নিযুক্ত হন তাদের ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ আইনে নেই। কিন্তু এদের মধ্যে একটি শ্রেণি নিজেদেরকে ব্যাংকের মালিক ভাবতে শুরু করেন। তারা ঋণের জন্য তদবির করা থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি-ট্রান্সফার ইত্যাদি এমন কোনো কাজ নেই যা করছেন না। কোনো কোনো পরিচালক নিযুক্ত হবার পর ব্যাংকের অভ্যন্তরে কিছু অনুসারি তৈরি করেন। তারা সেই সব অনুসারিদের মাধ্যমে দুর্নীতি এবং কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত হন। ব্যাংকের যারা কর্মকর্তা তাদের মধ্যেও কিছু দুর্নীতিবাজ রয়েছেন যারা এসব পরিচালকের নানা দুর্নীতিতে সহায়তা করে টু পাইস কামিয়ে নিচ্ছেন।

এবার আমার ব্যাংকিং জীবনের কিছু স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক এবং বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থাকে একীভূত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) গঠিত হয়। নতুন ব্যাংকে যাদের পরিচালক হিসেবে মনোনীত করা হয় তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অনিয়মের মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপিত হতে থাকে। একবার পরিচালনা বোর্ডের সভা শুরু হবার আগে একজন পরিচালক প্রস্তাব করেন, আমরা ব্যাংকে এলে বসার কোনো নির্দিষ্ট স্থান না থাকার ফলে আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষে বসতে হয়। এটা দৃষ্টিকটু মনে হয়। কাজেই আমাদের জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেই সময় অকুস্থলে উপস্থিত ব্যাংকের উপ ব্যবস্থাপনা করবী মুজিব পরিচালকের কথার প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং আইনে পরিচালকদের বসার জন্য কোনো কক্ষ বরাদ্দের সুযোগ নেই। তার এই বক্তব্যের পর বিষয়টি আর বেশিদূর এগুতে পারেনি। পরিচালকদের মধ্যে একজনের কর্মস্থল ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি বোর্ড মিটিংয়ের দিন রাজশাহী থেকে প্লেনে ঢাকায় আসতেন। 

আবার বিকেলে প্লেনে চলে যেতেন। পরবর্তী দিন অডিট কমিটি বা নির্বাহী কমিটির মিটিং থাকলে তিনি রাজশাহী থেকে আবারো প্লেনে আসতেন এবং বিকেলে প্লেনে চলে যেতেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায় তিনি মিটিংয়ের আগে থেকেই ঢাকায় অবস্থান করতেন। একজন পরিচালক যদি সামান্য ট্যুর এলাউন্সের লোভ সামলাতে না পারেন তিনি বড় অঙ্কের অর্থের লোভ সামলাবেন কী করে? কোনো কোনো পরিচালকের দালাল নিয়োগ দেয়া ছিল। তারা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্প ব্যাংকে নিয়ে আসতেন। নির্ধারিত অর্থ পাবার শর্তে পরিচালকদের কেউ কেউ সেই প্রকল্প পাশের জন্য তদবির করতেন। এর মধ্যে একজন পরিচালক ছিলেন যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব। তিনি ১৯৭৩ সালে সংক্ষিপ্ত কোর্সে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি লাভ করেন। তিনি ব্যাংকে এলেই শুধু তদবির করতেন। একবার তার এলাকার একজন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য প্রার্থীর নির্বাচনি পোস্টার ছাপার জন্য আমাকে দায়িত্ব প্রদান করেন। আমি পোস্টার মুদ্রণ করে দিই। কিন্তু তিনি আমাকে বারবার অনুরোধ করতে থাকেন সেই পোস্টারের বিল ব্যাংক থেকে প্রদানের জন্য। আমি তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করি এবং তাকে বিল পরিশোধে বাধ্য করি। তিনি আমার উপর খুবই ক্ষুব্ধ হন। পরিচালনা বোর্ডের মিটিংয়ে তিনি আমাকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক হিসেবে আখ্যায়িত করে আমাকে ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করার পরামর্শ প্রদান করেন। ব্যাংক আমাকে চাকরিচ্যুত করেনি ঠিকই কিন্তু আমার একই পদে একজন বাইরের ছেলেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগদান করা হয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ছেলেটির কাজই ছিল আমাকে জ্বালাতন করা। এভাবে আমি অত্যন্ত দুর্বিষহ চাকরিজীবন কাটাতে বাধ্য হই। আর একজন পরিচালক, যিনি নিজেকে সাবেক অর্থমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিতেন তিনি নানাভাবে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতেন। আমি যখন জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতির জন্য প্যানেলভুক্ত হই তখন সেই ভদ্রলোক আমাকে চার দিন ফোন করে জানতে চান তাকে কী দেয়া হবে। আমি কিছু দিতে সম্মত না হওয়ায় আমাকে হুমকি দেয়া হয় কিভাবে আপনার পদোন্নতি হয় আমি দেখে নেবো। এরপর তিনি এবং ব্যাংকের আরো একটি দুর্নীতিবাজ চক্র আমার পদোন্নতি আটকে রাখে। এভাবে শত শত উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। পরিচালক নামধারী এক শ্রেণির অর্থলোভী ব্যক্তি যারা ব্যাংক ও অর্থনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান রাখেন না তারা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে লুটেপুটে খাচ্ছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, কিছু পরিচালক নিজেদের ব্যাংকের মালিক ভাবছেন। তার এই উপলব্ধির জন্য ধন্যবাদ। তিনি এক সময় অর্থমন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পদে আসীন হয়েছেন। যেসব ব্যাংক পরিচালক নিজেদের ব্যাংকের মালিক ভাবছেন তাদের বিরুদ্ধে তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন বা নিচ্ছেন তা জানালে ভালো হতো। সাম্প্রতিক সময়ে নানা আইনি সংস্কারের মাধ্যমে পুরো ব্যাংকিং সেক্টরকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ