বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪
Online Edition

নারীর মুক্তি বা স্বাধীনতা প্রসঙ্গে

শারমিন আকতার

সেদিন মার্কেটে যাবার পথে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এর রাস্তার ধারে গড়ে উঠা একটা আর্ট গ্যালারিতে আঁকা একটা ছবিতে চোখ পড়লে আমি থমকে দাঁড়ালাম। ছবির ক্যাপশন দেখে চোখ কপালে উঠলো। শাড়িতে পেঁচানো অর্ধ নগ্ন একটা নারী দেহের ছবি। নারীটির পিঠের অধিকাংশই খোলা। আর এই ছবির নাম “মুক্তি”। আমি বিস্মিত হলাম ! অর্ধ নগ্নতা একটা নারীর জন্য মুক্তি কীভাবে হতে পারে? এটি কি আদৌ একটা নারীর জন্য স্বাধীনতা বা মুক্তি আনতে পারে? 

আমি ছবি দেখে মনে মনে হাসতে লাগলাম। নারী দেহের ওপেননেসের মধ্যে যারা নারীর স্বাধীনতা খুঁজে, তারা আসলে কতোটাই বোকা! অর্ধনগ্নতা নারীর দেহেকে হয়তো মানুষের সামনে ওপেন বা মুক্ত করে দেয়, কিন্তু তার স্বত্বাটাকে কতোটা পরাধীন করে দেয় তা একজন বুঝমান নারী ছাড়া আর কেই বা বুঝে!

নারীর স্বাধীনতা কিসে? তা জানার আগে আমরা স্বাধীনতার সংজ্ঞা জেনে নেই। স্বাধীনতা বলতে আসলে কি বুঝায়? 

ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে “Freedom” এর সংজ্ঞা হচ্ছে “The condition or right of being able or allowed to do, say, think, etc.Whatever you want to, without being controlled or limited.”

অর্থাৎ “নিয়ন্ত্রিত বা সীমিত না হয়ে কোন কিছু করতে সক্ষম হওয়া বা কোন কিছু করা, বলা, চিন্তা করার অনুমতি পাওয়ার অবস্থা বা অধিকারই হচ্ছে স্বাধীনতা ।”

আর এই স্বাধীনতার অর্থ জানার পাশাপাশি আমরা অধিকারের সংজ্ঞা জানার চেষ্টা করি। অধিকার বলতে আসলে কি বুঝায়? 

ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে অধিকার বা “Right” এর এমন সংজ্ঞা আছে“Considered fair or morally acceptable by most people”

অক্সফোর্ড ডিকশনারি “Right” এর সংজ্ঞা হচ্ছে “Something morally good.”

অতএব অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে উল্লেখিত মুক্তি এবং অধিকারের সংজ্ঞার আলোকে আমরা বলতে পারি যে, “নৈতিকভাবে ভাল এবং সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোন কিছু করা, বলা বা চিন্তা করার অনুমতি পাওয়ার নাম হচ্ছে স্বাধীনতা।” 

একটা মেয়ে অর্ধনগ্ন হয়ে সমাজে ঘুরে বেড়ালে সমাজের অধিকাংশ মানুষ কি একে ভালোভাবে গ্রহণ করে? মেয়ে মানুষ কেন, একজন পুরুষের অর্ধনগ্নতাও কেউ ভালভাবে গ্রহণ করতে পারে না। পাশ্চাত্য সমাজে নারীর অর্ধনগ্নতাকে সহজভাবে দেখা হলেও আমাদের সমাজে এটাকে এখনও কেউ ভালভাবে গ্রহণ করে না। সমাজের অধিকাংশ মানুষ যাকে ভালভাবে গ্রহণ করতে পারে না সেটা আর যাই হোক কারও অধিকার হতে পারে না। আমরা একে স্বেচ্ছাচারিতা বা অসচেতনতা বলতে পারি। আর কোন জিনিস যদি কারও অধিকার না হয়ে থাকে তাহলে সেটা অর্জন করার, বলার বা করার অনুমতি লাভের নাম আর যাই হোক কখনও “স্বাধীনতা” হতে পারে না। 

নারী যদি নিজের দেহকে ঢেকে রাখে তবে তার স্বাধীনতা হরণ হয় না। বরং তার মর্যাদা অনেকাংশে বেড়ে যায়। এই ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন- ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা এবং মু’মিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন (প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার সময়) তাদের (পরিহিত) জিলবাবের একাংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আহযাব: ৫৯)

বিশ্বনবী (সা.) বলেন, “নারী পর্দাবৃত থাকার বস্তু, যখনই সে পর্দাহীনভাবে বের হয় তখন শয়তান তার দিকে উঁকি মেরে তাকায়। (তিরমিযী: ১১৭৩) 

আল্লাহ তায়ালা সূরা আহজাবে বলেছেন পর্দা করা নারীদেরকে আলাদা করে চেনা যাবে এবং তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। যদিও আমাদের সমাজে পঙ্কিলতার সয়লাবের কারণে অনেক হিজাবধারী মেয়ে ইভ টিজিং এর শিকার কিছুটা হলেও খোলামেলা মেয়ের তুলনায় পর্দা করা নারীরা ইভ টিজিং এর শিকার অনেক কম হয়।

মেয়েরা নিজেদের শরীরকে অন্যের সামনে খোলামেলা ভাবে উপস্থাপন করলে বা বেশি সাজুগুজু করলে তাদের স্বাধীনতা বাড়ে না। একটা মেয়ে গভীররভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝতে পারবে অন্যের প্রশংসা পাবার জন্য তাদের মন এতো উদগ্রীব হয়ে উঠে যে তারা মনের অজান্তে নিজের জন্য না সেজে রাস্তার অচেনা, অজানা বা অল্প চেনা মানুষের জন্য সাজুগুজু করতে থাকে। লোকের চোখে তাকে কেমন দেখাবে এমন একটা মানসিক চাপ তাকে কুড়েকুড়ে খায়। 

মানুষ কি বলবে? আমাকে দেখতে কেমন লাগবে? আমাকে খোলা চুলে না বাঁধা চুলে ভাল লাগবে? আমাকে হালকা মেকআপ না গাড় মেকআপে ভালো লাগবে? আমাকে লাল শাড়ি না নীল থ্রি পিসে ভাল লাগবে? এমন চিন্তা, আর এই চিন্তার আলোকে নেয়া নানা পদক্ষেপ বরং তাকে স্বাধীনতার সুখ উপভোগ করতে দেয় না। তার দেহটাকে মানুষ ও প্রকৃতির সামনে খোলামেলা বা স্বাধীন করলেও তার সত্তাটাকে বরং অন্যের চিন্তাধারার কাছে বন্দী করে ফেলে। আর এভাবে সে তার প্রকৃত স্বাধীনতাটাই হরিয়ে ফেলে।

হাফিংটন পোস্ট এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘গাব্বে আসেই’-এর আর্টিকেল “Muslims are the true feminists.” এ তিনি বলেন- 

“আমার মনে হয় আমেরিকান সমাজে নারীকে এমনভাবে দেখা হয় নারী মানেই শারীরিক মোহ প্রদর্শন করে থাকবে, লম্বা চুল রাখবে, মুখের নিখুঁত সৌন্দর্য থাকবে, অসাধারণ দেহাবয়ব থাকবে। আর যখন এসব প্রদর্শনের স্বাধীনতা আমাদের নারীরা অর্জন করে থাকে তখন আমরা ভাবি যে নারী হিসাবে আমরা স্বাধীন। আমাদের চারপাশে যেসব লোক আছে তাদের চোখে আমাদের কেমন দেখাচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তায় মশগুল থাকার মাধ্যমে আমরা মূলত প্রাকৃতিক নারীত্বকে নষ্ট ও দমন করার চেষ্টা করছি। সমাজের সব সমালোচনা উপেক্ষা করে আমাদের এটা বলার সাহস নেই যে “আমার দেহ প্রদর্শনের জন্য নয়।”

কিন্তু আমি অনেক মুসলিম নারীকে দেখেছি তারা এই সৎ সাহস অর্জন করার চেষ্টা করেছে। এভাবে তারা প্রতিদিনের অযথা বাহ্যিক চাপ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে। প্রকৃতপক্ষে তাদের এটা বলার সৎ সাহস আছে যে ‘হেই আমি কোন আনন্দের সামগ্রী নই, আমি একজন নারী। আমি কেমন দেখাচ্ছি তার ভিত্তিতে নয়; আমি আসলে কি এর ভিত্তিতে আমাকে সম্মান ও মূল্যায়ন করা উচিত।’ 

নিজেদেরকে স্বাধীন করার এমন সাহস আমেরিকান সংস্কৃতি থেকে তাদেরকে আলদাভাবে উপস্থাপন করেছে। প্রদর্শনের বাহানায় নারীরা যেসব চাপের মধ্যে থাকে সেই চাপ থেকে নিজেদেরকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন করার শক্তি মুসলিম নারীদের রয়েছে। তারা কখনও দেহ প্রদর্শনের কাজে মনোযোগ দেয় না বরং কিভাবে নিজের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা উপস্থাপন করা যায় সেদিকে মনোযোগ দেয়। তারা সৌন্দর্য চর্চার পূজারী নয়। এর ফলে মুসলিম নারীরা সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন করে থাকে এবং তাদের কমিউনিটিতে তাদেরকে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়।”

আমার মনে হয় নারী যদি তার দেহ প্রদর্শনের ইচ্ছা থেকে দূরে সরে গিয়ে তার মেধা, মননের বিকাশে মন দেয় তাহলেই তারা প্রকৃত স্বাধীনতা বা মুক্তি অর্জন করতে পারবে। 

গাব্বে আসেই তার “Muslims are the true feminists.” আর্টিকেলের শেষের দিকে এভাবে বলে তার লেখার ইতি টেনেছেন-

 

“আমি অবশেষে বুঝতে পারলাম পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কারা স্বাধীন এবং কারা নির্যাতিত। নির্যাতিত মূলত আমরাই আমেরিকান নারীরা, মুসলিম নারীরা নয়। যে নারীরা হিজাব পরে তারা মূলত পুরুষ এবং সমাজের নারীর দেহ দর্শনের মাধ্যমে বিবেচনা করার দাসত্ব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে। বস্তুবাদী নারীবাদীরা যা পারেনি তারা তা পেরেছে ।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ