ঢাকা, বুধবার 01 February 2023, ১৮ মাঘ ১৪২৯, ৯ রজব ১৪৪৪ হিজরী
Online Edition

ডলার সংকটের কারণে এলসি খোল যাচ্ছে না, রমজানে ভোগ্যপণ্যের সংকটের আশঙ্কা

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্কঃ ডলার সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারছেন না। আমদানি করা পণ্যও খালাস করতে পারছেন না ডলারের অভাবে। তাই রমজানে ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্স সামান্য বেড়েছে। কিন্তু আমদানি কমায় উৎপাদন কমছে। ফলে রপ্তানি কমতে বাধ্য। আর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিল্প উৎপাদন কমিয়ে দিতে বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হবে। 

ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছোলা, ভোজ্যতেল, চিনি, খেজুর ও পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ডলার সঙ্কটের কারণে অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় এলসি খুলতে পারছে না। এমনি পরিস্থিতি ১০টি ব্যাংকের ট্রেজারি হেডদের নিয়ে গতকাল বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বলা হয়েছে, আলোচ্য এসব পণ্যের এলসি খুলতে পদক্ষেপ নিতে হবে। সঙ্কট মেটাতে প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সহায়তা করা হবে।

রমজানকে সামনে রেখে আমদানি পরিস্থিতি

রমজান মাসে ছয়টি আমদানি পণ্যের বিশেষ চাহিদা থকে৷ সেগুলো হলো ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর ও পেঁয়াজ। বাণিজ্যমন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি- এই দুই মাস এবং তারপর রোজার এক মাসের চাহিদা অনুযায়ী ওই ছয়টি পণ্য আমদানিতে ১৫৩ কোটি মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হয়। আর শুধু রোজার এক মাসের চাহিদা পূরণে এসব পণ্য আমদানিতে প্রয়োজন ৫৬ কোটি মার্কিন ডলার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রমজানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পাঁচ পণ্যের এলসি খোলার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু ব্যাংকগুলো এই সঙ্কটের মুহূর্তে কিভাবে ডলার সংস্থান করবে তা বলা হচ্ছে না। এ অবস্থায় গতকালের বৈঠকে ডলার সঙ্কটের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আলোচ্য পণ্যগুলোর এলসি খুলতে বলা হয়। সঙ্কট হলে প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সহযোগিতা করা হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়।

উল্লেখ্য, আগামী মার্চের শেষ সপ্তাহে রোজা শুরু হচ্ছে। গত ডিসেম্বর থেকেই রমজানকেন্দ্রিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসি খোলা শুরু হয়। তবে ডলার সংকটের কারণে নিত্যপণ্য আমদানি বিল পরিশোধে দেরি হচ্ছে আর এলসি খোলায়ও জটিলতা দেখা দিয়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বরে এলসি খোলার হারও কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষ চার মাসে অপরিশোধিত চিনির এলসি আগের বছরের চেয়ে ২৮ শতাংশ কমেছে। এছাড়া অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ৪৭ শতাংশ, সয়াবিন ৮৩ শতাংশ, অপরিশোধিত পাম তেল ৯৯ শতাংশ, ছোলা ৪৭ শতাংশ ও খেজুর আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৩০ শতাংশ।

আর যারা এলসি খুলে পণ্য বন্দর পর্যন্ত এনেছেন তারা ডলার না থাকার কারণে বিল পরিশোধ করতে পারছেন না, তাই পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না।

পরিস্থিতি সামলাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে বছরে যে ডলার ব্যয় হয় তার ১০ থেকে ২০ শতাংশ রমজানের পণ্য আমদানির চাহিদা পূরণে আলাদাভাবে রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে। এখন সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে।ল

ব্যবসায়ীরা বিপাকে

চট্টগ্রাম বন্দরে  কয়েকজন আমদানিকারকের পণ্য আটকা পড়েছে বিল পরিশোধ না করতে পারার কারণে। তাদের পণ্য খালাস করা হচ্ছে না। এতে তাদের বাড়তি জাহাজ ভাড়া গুণতে হচ্ছে। আর বিল পরিশোধ পিছিয়ে দিলে জরিমানা গুণতে হবে।

এস আলম গ্রুপ এবং মেঘনা গ্রুপের পণ্য এখন বন্দরের জাহাজে রয়েছে। পাম তেল, চিনি ও সয়াবিন মিলিয়ে ৫৪ হাজার টন পণ্য বিল পরিশোধ না করতে পারায় তারা খালাস করতে পারছেন না। তাদের মোট ৩.৫১ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু ব্যাংকে ডলার মিলছে না। এই পণ্যের বাজার-মূল্য ৬৪১ কোটি টাকা। তাদের এখন জরিমানা গুণতে হচ্ছে। প্রতিদিন জাহাজ ভাড়া হিসেবে জরিমানা দিতে হচ্ছে মোট ৯৪ হাজার ডলার। এর আগে গত মাসে টিকে গ্রুপের আমদানি করা পণ্য খালাসে ডলার সংকটের কারণে ১০ দিন দেরি হয়। এতে তাদের ১০ দিনের বড়তি জাহাজ ভাড়া পরিশোধ করতে হয় বলে জানান টিকে গ্রুপের পরিচালক মোস্তফা হায়দার।

পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে

মোস্তফা হায়দার বলেন, ‘‘এখন তো আসলেই আমরা সমস্যায় পড়েছি। এখন আমাদের এলসি নিশ্চিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্চ। প্রথমে ডলার না থাকায় এলসি খোলা যাচ্ছে না। এলসি খুললেও পরে দাম পরিশোধের জন্য  ব্যাংক থেকে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না বা পেতে অনেক দেরি হচ্ছে।”

তার কথা, "এইসব কারণে আমাদের বাড়তি জাহাজ-ভাড়া গুণতে হচেছ। আবার আমাদের ওপর সাপ্লায়ারদের আস্থা কমে যাচ্ছে। পরে হয়ত আদের জন্য পণ্য পাওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে। আর বিল পিছিয়ে দিলে জরিমানা দিতে হয়। এই সব ক্ষতিপূরণ নিয়ে আবার সাপ্লায়ারদের সঙ্গে আমাদের ডিসপুট দেখা দিচ্ছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, পণ্যের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, তা আবার দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।”

তিনি জানান, তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলছেন, চেষ্টা করছেন একটা সমাধানের।

তিনি বলেন, "এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে এর প্রভাব বাজারেও পড়বে । সাধারণ বিবেচনায় আমাদের আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে যে দামে এখন আমরা বাজারে পণ্য দিচ্ছি, সেই দামে হয়ত দিতে পারবো ন। আরেকটি বিষয় হলো, এখন ডলারের যে রেট সেই রেটে এক বছর পর আমাদের টাকাটা দেয়া হবে। কিন্তু এক বছর পর ডলারের রেট কী হবে তা-ও আমরা ধারণা করতে পারছি না। এখানেও আমাদের একটা ভয় আছে।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ