বুধবার ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
Online Edition

দিল্লি থেকে লন্ডন এবং পররাষ্ট্রনীতি

 আশিকুল হামিদ

আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারতসহ প্রতিবেশীদের পাশাপাশি অন্য সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে মাঝে-মধ্যেই আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে একটি বড় উপলক্ষ হিসেবে গত বছর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের ফিউনারেলে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে যাওয়ার পর যে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু বানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছিল, ‘চার্টার্ড’ বা ভাড়া করা বিমান নিয়ে লন্ডনে গেলেও এবং আগে থেকে অনুমতি নেয়া হয়েছে বলে জানানো হলেও লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নামার অনুমতি দু’বার বাতিল করেছিল হিথ্রো কর্তৃপক্ষ। পরে ব্যক্তিগত বিশেষ আয়োজনে লন্ডন থেকে ৬৪ মাইল দূরে অবস্থিত স্টানস্টেড বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে নামতে হয়েছিল। এজন্য বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৫০ হাজার পাউন্ড গুনতে হয়েছে। কিন্তু এত বিপুল অর্থ দিয়েও দু’ঘণ্টার বেশি বিমানকে রাখা সম্ভব হয়নি। ফেরৎ পাঠানো হয়েছিল ঢাকায়। রিপার্টটি জানাতে গিয়ে লন্ডনপ্রবাসী ব্যারিস্টার এমবিআই মুনশি কৌতুক করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ক্যামতে কি?’

একই সঙ্গে তার মন্তব্য ছিলÑ ‘ভাবা যায়!’ এমন মন্তব্যের কারণও জানিয়েছিলেন ব্যারিস্টার মুনশি। বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নাকি ব্রিটিশ সরকারের ‘আমন্ত্রণে’ ব্রিটেনের সদ্য মৃত রানি এলিজাবেথের ফিউনারেলের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে লন্ডনে গিয়েছিলেন! সরকারি সফর হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর বিমানের ল্যান্ডিংকে কেন দুই-দু’বার বাতিল করা হলো এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন লন্ডন থেকে ৬৪ মাইল দূরের একটি বিমানবন্দরে গিয়ে মাত্র দু’ঘণ্টার সময় নিয়ে নামতে হলোÑ সে প্রশ্ন ব্যারিস্টার মুনশিসহ বাংলাদেশের অনেকেই তুলেছেন। তারা একই সঙ্গে বাংলাদেশের মান-সম্মান এবং অর্থ নিয়ে কেলেংকারি বন্ধেরও জোর দাবি জানিয়েছেন।

বলা দরকার, লন্ডন প্রসঙ্গেই প্রাধান্যে এসেছিল প্রধানমন্ত্রীর দিল্লী সফরও। কারণ, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, পাঁচদিনের ওই সফরকে কেন্দ্র করে প্রচারণার ঢাকঢোল যথেষ্টই বাজানো হয়েছিল। প্রচারণার সে অভিযানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও পাল্লা দিয়ে নেমেছিলেন। তাদের মধ্যে বেশি স্পিডে দৌড়াতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেও ফেলেছিলেন অনেক বেশি। তার পরিণতিও তাকে দেখতে ও ভুগতে হয়েছিল। একেবারে শেষ মুহূর্তে দিল্লী সফরের দল থেকেই বাদ পড়েছিলেন তিনি। হঠাৎ করে তার অসুস্থতার কথা জানানো হলেও যা বুঝবার তা বুঝে নিয়েছিল জনগণ!

ওদিকে ভারতের বিজেপি সরকারও কম দেখায়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দিল্লী সফরে যাচ্ছেন বলে প্রচারণা চালানো হয়েছিল বলেই বাংলাদেশের নেতা-মন্ত্রী ও কর্তা ব্যক্তিরা আশা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেয়ার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক রীতিনীতি অনুসরণ করা হবে। তাছাড়া বহুল আলোচিত তিস্তা চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও অন্য বেশ কিছু বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করবেন। চুক্তির বাইরে দু’ দেশের কূটনীতিক ও অফিসাররা যখন বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক বা মেমেরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং স্বাক্ষর করবেন তখনও দুই প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। এভাবে প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যথাযথ সম্মান জানানো হবে।

বাংলাদেশের তো বটেই, ভারতের গণমাধ্যমের খবরেও আগে থেকে এসব বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এমনটিই স্বাভাবিকও ছিল। কারণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘আমন্ত্রণ’ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এটুকুই সব নয়, কথা ছিল, মিস্টার মোদি তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাবেন। অন্যদিকে অভ্যর্থনা জানানো দূরে থাক, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমনকি দিল্লীর পালাম বিমানবন্দরেই যাননি।

কথা শুধু এটুকুই নয়, অন্য কোনো সিনিয়র মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকেও সেখানে যেতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন একজন অখ্যাত নারী প্রতিমন্ত্রী। সবকিছু দেখে মনে হয়েছিল যেন ওই প্রতিমন্ত্রী এবং তার পর্যায়ের জনাকয়েক ব্যক্তির আমন্ত্রণেই দিল্লী সফরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা!

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে কলকাতা সফরের সময়ও শেখ হাসিনাকে যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি। সেবারও নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণেই গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কলকাতার নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাননি মিস্টার মোদি। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিল ভারতের গণমাধ্যম। কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীন এবং প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার একদিন পর, ২৪ নবেম্বরই প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম করেছিল, ‘মিত্র হাসিনার শীতল অভ্যর্থনা, কাঠগড়ায় দিল্লী’। আনন্দবাজার লিখেছিল, ‘প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে কলকাতায় এলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। কিন্তু তাকে স্বাগত জানাতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও মন্ত্রী, এমনকি শীর্ষ আমলাকেও পাঠানো হয়নি। যা কি না বাঁধাধরা কূটনৈতিক প্রথা এবং সৌজন্যের বিরোধী। কেন এমন উদাসীনতা প্রদর্শন, সে বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছে না সাউথ ব্লক।’

উল্লেখ্য, ‘সাউথ ব্লক’ বলতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই সচিবালয়কে বোঝানো হয়, যেখান থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে। দৈনিক আনন্দবাজার প্রসঙ্গক্রমে আগের মাস অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিল্লীতে জানানো অভ্যর্থনার কথাও উল্লেখ করেছিল। আনন্দবাজার লিখেছিল, “তখন তাকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন প্রথমবারের সাংসদ তথা নারী ও শিশু কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী। হাসিনার সফরসঙ্গী নেতারা ঘরোয়াভাবে জানিয়েছিলেন, প্রতিবেশী বলয়ে ভারতের ‘পরম মিত্র’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বা কোনও সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রী উপস্থিত থাকবেনÑ এটাই ছিল প্রত্যাশা। প্রথমবার জিতে আসা কোনও প্রতিমন্ত্রী নন।”

উল্লেখ্য, যে প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, তিনি সেবারই প্রথম নির্বাচিত হয়ে ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সে কারণে আনন্দবাজারের মতো বাংলাদেশ বিরোধী হিসেবে পরিচিত একটি প্রধান দৈনিকও মোদি সরকারের তীব্র সমালোচনা না করে পারেনি। আনন্দবাজার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ‘নতুন উচ্চতায়’ পৌঁছেছে এবং পাকিস্তান সীমান্তের ওপার থেকে আসা জঙ্গীপনায় ভারত যখন চাপে তখন বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারত বিরোধী সন্ত্রাস উৎখাত করবেন বলে শেখ হাসিনা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা তিনি ‘অক্ষরে অক্ষরে’ পালন করেছেন। তাছাড়া ‘প্রতিবেশীদের মধ্যে একমাত্র ঢাকাকেই বিভিন্ন চড়াই উতরাইয়ে পাশে পেয়েছে দিল্লী।’ দৈনিকটি আরও লিখেছিল, “এমন ‘পরম মিত্রের’ ভারত সফরে দিল্লীর এই উদাসীনতা কেন, সে প্রশ্ন উঠেছে।” এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের মন্তব্য ছিলÑ ‘সব মিলিয়ে দিল্লীর এই আচরণে প্রতিবেশী বলয়ে ভারতের অস্বস্তি যে আরও বেড়ে গেল, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই কূটনীতিকদের।’

বস্তুত দৈনিক আনন্দবাজারের এমন মন্তব্য এবং অনুমান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, প্রতিবেশী কোনো একটি দেশের সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক তখন বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না (বাস্তবে এখনও নেই!)। ভারতের জন্য সে সময় সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ ঘটিয়েছিল শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট পদে ‘চীনপন্থী’ হিসেবে পরিচিত নেতা গোতাবায়া রাজাপাক্ষের বিজয়। বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কে চীনের সঙ্গে সর্বতোভাবে জড়িয়ে পড়েছিল শ্রীলংকা। দেশটি তার হাম্বানটোনা সমুদ্র বন্দর চীনের হাতে তুলে দেয়ায় ভারতের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতের আশংকা ছিল, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া চীনকে শ্রীলংকায় ভারত বিরোধী ঘাঁটি তৈরি করতে দেবেনÑ যে জন্য চীন বহু বছর ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

ওদিকে চীনের সঙ্গে ভারতের ডোকলাম যুদ্ধের পর থেকে ভুটান চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। সে সময় ভারতীয় পর্যটকদের জন্য বিরাট অংকের পর্যটন শুল্ক চাপানোর মাধ্যমেও ভুটান তার ভারত বিরোধী মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছিল। আরেক প্রতিবেশী নেপালও খোলামেলাভাবেই চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামরিক দিক থেকেও নেপাল চীনের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা বাড়িাচ্ছিল। একই কারণে ভারতের সঙ্গে পরিকল্পিত যৌথ সামরিক মহড়া বাতিল করেছিল নেপাল।  সব মিলিয়েই নেপাল বুঝিয়ে দিয়েছিল, ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক আর বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

প্রসঙ্গক্রমে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভালো। কারণ, কাশ্মীর প্রশ্নে দুটি দেশের সঙ্গেই ভারতের সম্পর্কে অবনতি অব্যাহত ছিল। ভারত যে লাদাখকে রাজ্য হিসেবে তার অংশ বানাতে চাচ্ছিল সে লাদাখের ওপর চীনের দাবি বহু বছরের। ফলে কাশ্মীরকেন্দ্রিক সংকটে পাকিস্তানের পাশাপাশি চীনও তার ভারতবিরোধী অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। এর ফলে শান্তিকামী বিশ্বে নতুন পর্যায়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় তিনশ’ কোটি জনসংখ্যার কারণে শুধু নয়, উভয় দেশের হাতেই পারমাণবিক সমরাস্ত্র রয়েছে বলেও দেশ দুটির সম্পর্কে অবনতি ঘটার ফলে আশংকার সৃষ্টি হয়েছিল। এর পাশাপাশি প্রাধান্যে এসেছিল চীনের একটি নতুন বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছিল, চীন বিশাল এক বাঁধ নির্মাণ করে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল। চীন সেই সাথে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং যথেষ্ট প্রশস্ত টানেল বা খালও খনন করে চলছিল। এই টানেলের মধ্য দিয়ে চীন ব্রহ্মপুত্রের পানি তুলে নিয়ে যাবে তার জিন জিয়াং প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায়। এর ফলে ব্রহ্মপুত্রের পানি ভারত আর আগের মতো পাবে না। পানির প্রায় সবটুকুই বরং চলে যাবে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে।

বাঁধটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে আসামসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর কৃষি ও চাষাবাদ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, এসব রাজ্য সেচের কাজে প্রধানত ব্রহ্মপুত্রের পানির ওপর নির্ভরশীল। এজন্যই ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সে সময় তাদের বিবৃতিতে বলেছিল, চীনের তৈরি বাঁধের কারণে বিশেষ করে কৃষিনির্ভর আসাম সর্বনাশের মুখে পড়বে। দলগুলো একই সাথে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘শত্রু প্রতিবেশী’ চীনের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে সমাধান বের করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে দাবি জানিয়েছিল। ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর এমন ভীতির কারণ ছিল চীনের সাংপো নদÑ তিব্বতে যা ব্রহ্মপুত্রের উৎস নদ। ভারত রয়েছে চীনের নিচের দিকে, যেমনটি বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের ‘ভাটিতে’। প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী সাংপো বা ব্রহ্মপুত্রের পানি ভাটির তথা নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলেই ভারত এতদিন নদটির পানি পেয়ে আসছিÑ যেভাবে বাংলাদেশ এক সময় পেতো ভারত থেকে নেমে আসা গঙ্গা এবং অন্য ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি। সব নদ-নদীর পানিই ভারতের পর বাংলাদেশ হয়ে গিয়ে পড়তো বঙ্গোপসাগরে।

অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছে ফারাক্কা, গজলডোবা ও টিপাইমুখসহ ভারতের নির্মিত অসংখ্য ছোট-বড় বাঁধের কারণে। পানির তীব্র অভাবে ‘নদীমাতৃক’ বাংলাদেশে এখন মরুকরণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাঁধের ভয়ংকর কুফল সম্পর্কে নিজেরা জানেন বলেই চীনের বাঁধ ও এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন ভারতের সকল দলের নেতারা।

ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে চীন ও ভারতের তিক্ততা কোনদিকে কতটা গড়ায় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হলেও জানিয়ে রাখা দরকার, দেশ দুটির সম্পর্ক কিন্তু ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই ঘনিষ্ঠ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। চীন ও ভারত ১৯৬২ সালে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। কাশ্মীর প্রশ্নে চীন পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা পাল করে চলেছে। চীন এখনো ভারতের রাজ্য অরুণাচলকে নিজের ভূখন্ড বলে মনে করে। এর বাইরেও দীর্ঘ সীমান্তের অসংখ্য এলাকায় দেশ দুটির সেনারা মাঝে-মধ্যেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। ২০১৮ সালের প্রথম দিকেও ডোকলাম সীমান্তে ছোটখাটো যুদ্ধ করেছে চীন ও ভারত। ওই এলাকায় এখনো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। বরং ২০২২ সালেও চীন ও ভারত সীমান্ত নিয়ে সমস্যায় পড়েছে বলে জানা গেছে। একই কারণে দু’দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ব্যাপারে আশংকা প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষকরা।

আঞ্চলিক শান্তির জন্য চীন ও ভারতের সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই, কিন্তু প্রতিবেশী ভারতসহ সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলেই দিল্লী এবং লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকে প্রাধান্যে আনতে হয়েছিল। দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কেবলই প্রচারণা চালানোর পরিবর্তে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা দরকার। বিশেষ করে ভারতের মতো অনির্ভরশীল প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক না হতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে নতুন পর্যায়ে অসম্মানিত ও ক্ষতিগ্রস্ত  হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ