বুধবার ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
Online Edition

সিলেট থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ধান ভানার ঢেঁকি

কবির আহমদ সিলেট থেকে: একসময়ে গ্রাম বাংলায় ধান ভানার যন্ত্র ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানা হতো। অগ্রহায়ণ মাস আসার সাথে সাথে ঢেঁকি মেরামতের কাজে লাগতো দেশের অন্যান্য জেলার ন্যায় সিলেটের হাজারও কৃষক। সোনালী ফসল ঘরে তোলার একমাত্র অবলম্বন ছিল এই ঢেঁকি। আজ ডিজিটাল যুগে সিলেটে হারিয়ে গেছে ঢেঁকি। নতুন প্রজন্মের কেউই জানে না ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানার খবর। বাংলার গ্রামীণ নারীরা ধান ভানা, হলুদ কুটা, মটরশুটি, ডাল কুটা ও পৌষ পার্বণে পিঠা তৈরির জন্য চাউলের গুঁড়া করার জন্য ঢেঁকি ব্যবহার করতো। এখন আর গ্রাম বাংলায় ঢেঁকি দেখা যায় না বললেই চলে।

ফজরের আজানের সাথে সাথে ভোরের স্তব্ধতা ভেঙে ঢেঁকির ঠক ঠক শব্দ আর কানে আসে না। যেখানে ঢেঁকি ছাড়া গ্রাম কল্পনা করাও কঠিন ছিল। যেখানে বসতি সেখানেই ঢেঁকি কিন্তু আজ তা আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য থেকে মুছে যাচ্ছে। এক সময় গ্রাম বাংলায় ধান ভানার একমাত্র যন্ত্রই ছিল ঢেঁকি। প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ঢেঁকি ব্যবহার হয়ে আসছে। তখন বাংলার ঘরে ঘরে ধান ভানা, চিড়া কুটা, চালের গুঁড়া ঢেঁকিতেই করা হতো। বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ঢেঁকি গৃহস্থের সচ্ছলতা ও সুখ সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে প্রচলিত ছিল।

মাছে ভাতে বাঙালির ঘরে একসময় নবান্নের উৎসব হতো ঘটা করে। উৎসবের প্রতিপাদ্যটাই ছিল মাটির গন্ধ মাখা সুগন্ধী ধান, ঢেঁকি-ছাঁটা চালের ভাত আর সুস্বাদু পিঠার আয়োজন। রাতের পর রাত জেগে শরীরটাকে ঘামে ভিজিয়ে ঢেঁকিতে ধান ভানার পর প্রাণ খোলা হাসি হাসত বাংলার নারীরা। ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানার পর আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনিরা পিঠা খাওয়ার আমেজে মেতে উঠত। ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানার চাউলের পিঠার মজাই যেন আলাদা। আধুনিক যুগে বিভিন্ন আইটেমের পিঠা তৈরী করা যায় না মেশিন চালিত যন্ত্র দিয়ে। সেই ঢেঁকির এখন প্রস্থান ঘটেছে। কালের বিবর্তনে আর যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসনে আধুনিক এই যুগে গ্রাম বাংলার ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে। মূলত ৭০ দশকের পর ইঞ্জিনচালিত ধান ভাঙা কল আমদানির পর গ্রাম অঞ্চল থেকে ঢেঁকির অবসান হয়েছে। ক্রমান্বয়ে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন গ্রামের মানুষ ভুলে গেছেন ঢেঁকি ছাঁটা চালের স্বাদ, আর তরুণ প্রজন্ম তো চেনেই না এই যন্ত্রটি। যান্ত্রিক সভ্যতা গ্রাস করেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকি শিল্পকে। ডিজিটাল যুগে তরুণ প্রজন্ম ঢেঁকি কী তা চিনবেই না। হয়তো ঢেঁকির স্থান হবে জাদুঘরে।

 ঢেঁকি ছাঁটা চাল শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। গ্রামের মেয়েরা পালাক্রমে ঢেঁকিতে ধান থেকে চাল তৈরির সময় হরেক রকম গীত পরিবেশন করত। আমোদ-আহ্লাদে ঢেঁকিতে পাড় দিতো আর গাইতো। উহ্! সে কি আনন্দ! যা কেবলই স্মৃতি। সব এলাকাতেই আধুনিক যুগে ঢেঁকির পরিবর্তে ধান ছাঁটাইসহ চালের গুঁড়া তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎচালিত মেশিনে।

একটা সময় ছিল যখন শীতকালে গ্রাম বাংলার প্রায় সব বাড়িই ঢেঁকির ধুপুর ধাপুর শব্দে মুখর থাকতো। ঢেঁকি ছাঁটা চালের গুঁড়া থেকে তৈরি হতো রকমারি পিঠা-পায়েশ। বাড়ি বাড়ি পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যেত। নতুন জামাইদের সে পিঠায় আপ্যায়ন করতো শাশুড়ি। এক সময় ঢেঁকির সুরেলা শব্দ হাওড়-বেষ্টিত অঞ্চল সুনামগঞ্জের প্রতিটি ঘরে শোনা যেত।

 ঢেঁকিতে ধান ভানা আজ নেই বললেই চলে। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বর্তমান যুগে রাইস মিলে ও ভ্যান গাড়িতে ভ্রাম্যমাণ ইঞ্জিন নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান ভানছে কৃষকরা। যার কারণে গ্রামের অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মহিলারা যারা ধান ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করতো তারা বিকল্প পথ বেছে নিতে পারেনি। অভাব যেন তাদের পিছু ছাড়ছে না। কথা হলো সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আব্দুল মালিকের সাথে। কৃষক মালেক জানান, আগে গরুর সাহায্যে মাড়া দিয়ে আমরা ধান ভানার কাজ করতাম। পাশাপাশি ঢেঁকি আমাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতো। কিন্তু আধুনিক যুগে আধুনিক মেশিন বের হওয়ায় ঢেঁকি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এখন কেউ আমাদের আর কাজে ডাকে না। বড় অভাব অনটনে দিন যাপন করছি। মালেকের মত হাজারও মালেক অসহায় জীবনযাপন করছেন। তাদের দেখার যেন কেউ নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ