শুক্রবার ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
Online Edition

সোনালী দুঃখ 

জোবায়ের রাজু 

আজ দশ তারিখ। জেবার জীবনের এক বিশেষ দিন। গত বছর এই দিনে জাহিদের সাথে তার আংটি বদল হয়েছে। কথা ছিল আংটি বদলের তিন মাস পর তাদের বিয়ে হবে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা জেবার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে দিলো। ইসলাম রোডে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় জাহিদ প্রাণে বেঁচে গেলেও তার বাম পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশ কেটে ফেলতে হয়। মাথায় প্রচন্ড ভাবে আঘাত পায় বলে জাহিদকে প্রায় তিনমাস হাসপাতালে থাকতে হয়। শেষ চিকিৎসার পর কাটা পা নিয়ে বাসায় ফিরে সে। 

এই দুর্ঘটনার পর জাহিদ জেবার বিয়ে ভেঙ্গে গেলেও জেবা চায়নি তার বিয়ে বন্ধ হোক। যে জাহিদকে টানা আট বছর ভালোবেসেছে জেবা, আজ তার পঙ্গু জীবন থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো এতোটা অকৃতজ্ঞ নয় জেবা। বাবা মা সহ সকল আত্মীয় স্বজনের অমতকে ভাসিয়ে দিয়ে জেবা যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিয়ে করলে পঙ্গু জাহিদকেই করবে, তখনই তার বাবা মা তাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা তাদের মেয়েকে ওই পঙ্গুর হাতে তুলে দিতে পারবেন না। কিন্তু জেবার অনড় সিদ্ধান্তÑবিয়ে করলে জাহিদকেই করতে হবে। 

আংটি বদলের পর দু পরিবারের যে রকম সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে, জাহিদের এক্সিডেন্টের পর সে সম্পর্কে ফাটল ধরতে সময়ও লাগেনি। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে জেবা। জাহিদকে ঘিরে তার আট বছরের প্রেমের স্মৃতি ক্রমশ যন্ত্রণা দিতে থাকে জেবাকে। 

নিজের লাইফের এই দুর্ঘটনার পর অবশ্য জাহিদও বদলে গেছে। সে চায়নি তার পঙ্গু জীবনের সাথে জেবাকে জড়াতে। ফলে জেবার কল বা এস এম এসের প্রতি আগের মতো এক বিশেষ দুর্বলতা জাহিদের মধ্যে দেখা যায়নি। জেবার জীবন থেকে জাহিদের সরে যাওয়ার ব্যাপারটা বুঝতো জেবা। ফলে বারান্দার গ্রিল ধরে কান্না করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না জেবার তখন। 

জেবাকে বারান্দায় মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন মা সেলিনা জামান। 

-একটা সুখবর আছে জেবা। 

-কি?

-তোর ছোটখালা শিশিরের সাথে তোর বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। 

-হোয়াট? কি বলছো? শিশিরের সাথে?

-হ্যাঁ কেন মা? শিশির তো দেখতে দারুণ স্মার্ট। ভালো ছেলেও। 

-যতটা সে স্মার্ট, ততটা নোংরা চরিত্রের সে। 

-কি বলছিস?

-মা তুমি কিচ্ছু জানো না। শিশির একটা বখাটে। চরিত্রহীন। কতো মেয়ে তার গার্লফ্রেন্ড, যাদের সাথে ওর কুসম্পর্ক। ফেসবুকে আজেবাজে মেয়েদের সাথে ওর খারাপ রিলেশন। আমি সব জানি। 

-তাতে কি হয়েছে। ওদের তো টাকার শেষ নেই। শহরে চারটা বাড়ি। বিদেশে একাধিক ব্যবসা। নিউমার্কেটে আটটা দোকানের মালিক তোর খালুজান। শিশির তাদের একমাত্র ছেলে। একদিন তো এসবের মালিক শিশিরই হবে। 

-মা, সম্পদের লোভে তুমি আমাকে শিশিরের মতো একটা বখাটের হাতে তুলে দিতে চাইছো? ছিঃ এই তোমার শিক্ষা। তুমি না মাস্টার্স পাস?

-বাজে কথা বন্ধ করো জেবা। তোর খালুজান চাইছেন শিশিরের সাথেই তোর বিয়েটা হোক। 

-আমি মরে গেলেও এ বিয়ে হবে না। তাছাড়া আমি জাহিদকে ছাড়া আর কাউকেই বিয়ে করব না। 

-মনে রাখিস ওই পঙ্গুটার সাথে তোর কখনো বিয়ে দিব না আমরা। 

সেলিনা জামান হুংকার ছেড়ে স্থান ত্যাগ করার পর জেবার কেন জানি খুব কান্না পেল। তার সাজানো স্বপ্নগুলি এমন দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠছে কেন? সে কি আল্লাহর দরবারে বড় কোনো পাপ করেছে? 

রাতে বিছানায় গা হেলিয়ে দিতেই জেবার মনে হলো সে আর এখানে থাকবে না। কাল সকালে সূর্য ঊঠার আগেই এখান থেকে পালাতে হবে। জাহিদের কাছে চলে যাবে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে।

২. এই সাত সকালে কলবেল বাজল বলে জাহিদ খুব অবাক হলো। এত ভোরে কে এলো আবার! হুইল চেয়ারে চড়ে দরজার সামনে এসে দরজা খুলতেই চমকে গেল জাহিদ। এতো স্বয়ং জেবা। বিশাল এক লাগেজ হাতে দাঁড়িয়ে। 

ক্ষীণ গলায় জেবা বলল-‘আমি সব কিছু ছেড়ে তোমার কাছে চলে এসেছি চিরদিনের জন্য। ফিরিয়ে দিও না আমায়।’ 

জাহিদ কি বলবে বুঝতে পারছে না। খানিক বাদে মৌন কন্ঠে বললÑ‘আমার এই পঙ্গু জীবনে তোমাকে জড়ানোটা ঠিক হবে না।’ হু হু করে কেঁদে ফেলল জেবা। হতাশ গলায় বললÑ‘আমি তোমার এই জীবনেই আসতে চাই।’ জেবার এই কথায় জাহিদের চোখে পানি চলে এলো। 

পাশের রুমের পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন জাহিদের বাবা হাসমত আলী। জেবা আর জাহিদের প্রলাপ শুনে তিনি আন্তরিক গলায় বললেন-‘মা গো, তুমি আমার পঙ্গু ছেলের কাছে চলে এসেছো, জাহিদ তোমাকে ফিরিয়ে দিলেও আমি দেব না। আমি আজই কাজী ডেকে তোমাদের বিযে পড়াবো। ’

হাসমত আলীর কথায় জেবা বেশ ভরসা পেল। আনন্দে তার গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। জেবার ভেজা চোখ দেখে হাসমত আলী বললÑ‘চোখের পানি মুছে ফেলো মা। যখন এখানে চলে এসেছো, আশ্রয় পাবেই।’ জেবা হাসছে কিন্তু তার চোখ ভেজা। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ