রবিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২৩
Online Edition

হাসির জাদুকর

মাহমুদুল হাসান মুন্না

লেবান নামে অদ্ভুত এক গ্রাম ছিল। সেই গ্রামে ফুল, পাখি, ফসলের সমারোহ ছিল। প্রবহমান নদী ছিল। গাছগাছালিতে সাজানো একটি পাহাড় ছিল। গ্রামের পরিবারগুলোও স্বচ্ছল ছিল। এত কিছু থাকতেও কারো মুখে হাসি ছিল না। কাতুকুতু দিলেও সেই গ্রামের কেউ হাসত না। কী অদ্ভুত!  তাই না? তারা যেন মানুষ নয়, কাঠের পুতুল। কোনো এক অজানা কারণে সবার হাসি ফুরিয়ে গেল। অনেকেই বলে গ্রামবাসীর উপর অভিশাপ পড়েছিল। আর কোনোদিন তারা হাসতে পারবে না। মানুষ হয়েও পুতুলের মতো বেঁচে থাকবে। এই গল্প দেশ হতে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ল। 

আকিব ও রাকিব দুই বন্ধু। ওরা স্কুলে পড়ত। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল। ওরা লোকমুখে গল্পটি শুনেছিল। আকিবের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। ঐ অদ্ভুত গ্রামের লোকদেরকে হাসানোর উপায় খুঁজে পেল। আকিব রাকিবকে বলল, আমরা লেবান গ্রামে যাব। গ্রামবাসীর মুখে হাসি ফোটাব। রাকিব আকিবের বুদ্ধির তারিফ করল। রাকিব বলল, গ্রামটি শহর থেকে অনেক দূরে। আমরা দিনে দিনে ফিরে আসতে পারব না। সেখানে গিয়ে থাকব কোথায়? তখন আকিব বলল, মুখে হাসি নেই বলে তারা অতিথিপরায়ণ নয় বুঝি? আমি শুনেছি ঐ গ্রামের লোকগুলো অনেক ভালো। রাকিব বলল, তাহলে ঠিক আছে। আমরা আগামীকালই রওয়ানা দেবো।

পরদিন সকালে দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়ল। গাড়িতে চড়ে, পায়ে হেঁটে গ্রামে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। তারা এক মুরুব্বির বাসায় অতিথি হলো। মুরুব্বির সাথে তাদের নানান আলাপ হলো। কথায় কথায় আকিব গ্রামটিতে আগমনের উদ্দেশ্য জানাল। আকিবের কথা শুনে মুরুব্বি বলল, কাতুকুতু দিলেও আমরা হাসি না। আমরা হাসতে ভুলে গেছি। তোমরা কীভাবে হাসাতে পারবে? 

রাকিব মজাচ্ছলে বলল, আমরা জাদু জানি। জাদু করে সবার মুখে হাসি ফোটাব। তখন মুরুব্বি বলল, তাহলে তো তোমাদেরকে ‘হাসির জাদুকর’ বলতে হয়। সকালে তোমাদের জাদু দেখব। ‘শুভ রাত্রি’ জানিয়ে মুরুব্বি ঘুমাতে চলে গেল। আকিব ও রাকিব পরিকল্পনা সাজিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে মুরুব্বি গ্রামের লোকদের ডেকে আনল। সবাই মুরুব্বির ঘরে সমবেত হলো। মুরুব্বি বলল, ওরা শহর থেকে এসেছে আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে। ওদের জাদু দেখার জন্য আপনাদেরকে ডেকেছি। উপস্থিত একজন বলল, আমার কৌতূহল হচ্ছে, কী এমন জাদু করে আমাদেরকে হাসাতে পারবে? ওরা কৌতুক করতে আসেনি তো? জাদু-কৌতুক করে  হাসাতে পারবে বলে মনে হয় না। আকিব বলল, আমরা কৌতুক করছি না। একটু সবুর করুন। এক্ষুণি ম্যাজিক দেখতে পাবেন। এটা বলেই আকিব ব্যাগ থেকে একটা বোতল বের করল। বোতলটি দেখিয়ে আকিব বলল, এই বোতলে একটা পোষা ভূত আছে। এই ভূত সুড়সুড়ি দিলে সবাই হাসতে বাধ্য হবেন। একজন বলল, ভূত মশাইকে তাড়াতাড়ি বের করুন। আমরা ভূতের ক্ষমতা দেখতে চাই। তখন রাকিব বলল, সবাই একটু দূরে দূরে দাঁড়ান। নইলে হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে পড়বেন। সবাই একটু জায়গা নিয়ে দাঁড়াল। আকিব বলল, এখন সবাই ধীরে ধীরে শ্বাস নিন। লোকদের শ্বাস-প্রশ্বাস দীর্ঘ হতে লাগল। আকিব ও রাকিব গ্যাস মাস্ক পরে নিলো। তারপর বোতলের মুখ খুলে দিলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত সবাই হাসতে লাগল। কী অবাক কা-! কাতুকুতু দিলেও যারা হাসে না, তারা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। গ্রামবাসীর কাছে তখনও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। তারা স্বপ্ন দেখছে না তো?

এটা স্বপ্ন নয়, সত্যি ছিল। অনেকক্ষণ পর সবার হাসি থামলো। গ্রামবাসী বলল, তোমরা আসলেই জাদুকর। যেটা কেউ করতে পারেনি, তোমরা সেটা করে দেখিয়েছো। যদি তোমাদের পোষা ভূত সুড়সুড়ি দিতো, তাহলে তো আমরা টের পেতাম। কিন্তু আমরা তো টেরই পেলাম না। বোতলের ভেতরে কি সত্যিই পোষা ভূত ছিল? আকিব হেসে বলল, কোনো ভূত ছিল না। বোতলে লাফিং গ্যাস ছিল। এই গ্যাস নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করলে মানুষ হাসতে থাকে। আকিবের কথা শুনে গ্রামবাসীরা আবার হেসে উঠল। একজন বলল, তোমরা তো বেশ চালাক, ভূতের কথা বলে গ্যাস ছড়িয়ে দিলে। নিজেরা গ্যাস মাস্ক পরে নিলে। মুরুব্বি বলল, তাহলে ভূত বা জাদু নয়, এটা বিজ্ঞানের ফল ছিল।  দোয়া করি তোমরা ভবিষ্যতে বড় বিজ্ঞানী হও।

আকিব ও রাকিব ঐ গ্রামে আরও কয়েকদিন ছিল। গ্রামবাসীরা খুব আপ্যায়ন করালো। তারা সবার মুখে যে হাসি ফুটিয়েছিল, তা আর কখনো ফুরায়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ