রবিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২৩
Online Edition

সাহসের জোয়ার

ইকবাল কবীর মোহন

নাম হুবাব ইবনুল মুনজির। নবীজির এক প্রিয় সাহাবি। বিজ্ঞতা আর বিচক্ষণতায় ভরপুর এক মানুষ তিনি। ইসলামের জন্য নিবেদিত। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস তাঁর অবিচল। নবীজির আনুগত্য ও নির্দেশনা পালনে সদা প্রস্তুত এক বীরপুরুষও এই মুনজির। মদিনার বাসিন্দা এই সাহাবি একদিন চলছেন নবীজির সাথে। চলছেন বদরের পথে। কাফেরদের সাথে লড়াই করার জন্য এই যাত্রা। ইসলামের প্রথম লড়াই হয়েছে বদরে। অনেক পথ অতিক্রম করবেন তাঁরা। মদিনা থেকে প্রায় আশি কিলোমিটারের পথ। মরুভূমির উত্তপ্ত বালিরাশি, অসহনীয় লু হাওয়া আর সুর্যের তীব্র উত্তাপ মাথায় নিয়ে নবীজির কাফেলা বদরের কাছাকাছি এসে পৌঁছলো। তিনি ভাবছেন শিবির স্থাপন করা নিয়ে। তাঁবু গাড়তে হবে একটা ভালো জায়গায়। এক সময় নবীজি হঠাৎ থামলেন একটা জায়গায়। সাহাবিরা আদেশ মতো দাঁড়িয়ে গেলেন। শিবির স্থাপনের এই জায়গাটি সঠিক কিনা সবাই পরীক্ষা করছেন। এর সুবিধা-অসুবিধা যাচাই করছেন। মনে হলো, নবীজি এখানেই শিবির স্থাপন করবেন। 

কিন্তু সাহাবি হুবাবের কাছে তা পছন্দ হলো না। কথাটা কিভাবে নবীজিকে বললেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তবে কথাটা বলাও দরকার। নবীজির সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলাও খারাপ দেখায়। আল্লাহর নবী অবশ্যই ভেবে দেখে কাজ করেন। তারপরও হুবাবের মন মানছে না। নবীজিকে বিষয়টা জিজ্ঞেস করতে হুবাব ইবনুল মুনজির এগিয়ে গেলেন নবীজির কাছে, সেনাপতির কাছে। তারপর তিনি নরোম কণ্ঠে নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 

‘হে দয়ার নবী! আপনি এখানে শিবির স্থাপন করবেন, এই সিদ্ধান্ত কী আপনার, নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে?’

নবীজি হুবাবকে খুব পছন্দ করেন। তাই হুবাব মুনজিরের কথায় আল্লাহর নবী বিরক্ত হলেন না। বরং তিনি বললেন, 

‘না হুবাব, এখানে শিবির স্থাপনের ব্যাপারে আল্লাহর কোনো নির্দেশ নেই। আমি নিজ থেকেই এই জায়গাটা ঠিক করেছি।’ 

নবীজির জবাব পেয়ে মুনজিরের বুকে স্বস্তি এলো। তিনি মনে শক্তি পেলেন। এবার তিনি নবীজিকে বললেন, 

‘আমার মনে হয়, এখানে শিবির স্থাপন করা আমাদের জন্য ভালো হবে না। বরং চলুন অন্য কোথাও গিয়ে শিবির স্থাপন করি।’

হুবাব মুনজিরের কথা শুনে নবীজি সচকিতভাবে তাঁর মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘তা হলে বলুন, কোথায় শিবির স্থাপন করা যাবে? সেই ভালো জায়গাটা কোথায়?’

মুনজির (রা) বললেন, ‘আমার মতে, শত্রু শিবিরের কাছাকাছি গিয়ে শিবির স্থাপন করাই উত্তম। আর সেখানটাতে চাই পানির ব্যবস্থা। সেখানে আমরা পানির একটি কূপ তৈরি করতে পারি। কূপটি আমরা পানি দিয়ে ভরপুর করে রাখবো। আমাদের প্রয়োজন হলে এই কূপ থেকে পানি পান করবো। আর শক্রদের কূপের পানি ঘোলা করে দেব। যাতে তারা পানি পান করতে না পারে। ফলে যুদ্ধের কৌশলে হেরে যাবে শত্রুরা।’

হুবাবের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন নবীজি। শুনলেন অন্যসব সাহাবীরা। নবীজির খুব পছন্দ হলো হুবাবের কথা। অন্য সাহাবীরাও হুবাবের কথায় মন দিলেন। হুবাবের যুক্তি মন্দ নয়। নবীজি হুবাবের কথা নিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলেন। এমন সময় আকাশ থেকে নেমে এলেন হজরত জিবরাইল (আ)। তিনি নবীজিকে বললেন, 

‘আপনি ভাববেন না। হুবাবের পরামর্শ সঠিক। আপনি সে মতে কাজ করুন।’   

এতক্ষণে নবীজির মন থেকে সব সংশয় দূর হলো। তিনি বললেন,  ‘হুবাব। তোমার কথাই ঠিক। তুমি সঠিক কথাই বলেছে। তাই চলো, আমরা ভালো একটি জায়গায় শিবির স্থাপন করি।’

মহানবী (সা) তাঁর সেনাদল নিয়ে এগিয়ে গেলেন। বদর প্রান্তরের কাছাকাছি গিয়ে শিবির স্থাপন করলেন। সাহাবি হুবাব (রা)-এর পরমার্শ কাজে লাগলো। নবীজির নেতৃত্বে অবশেষে বদরের প্রান্তরে জয়ী হলো মুসলিম বাহিনী। কাফেররা এ যুদ্ধে চরম মার খেল। 

হুবাব ইবনুল মুনজির (রা)-এর বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার পরিচয় মেলেছে আরো অনেক কাজে।

 তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ নবীজি বহুবার গ্রহণ করেছেন। মদিনার ইহুদি গোত্র বনু কুরায়জা ও বনু নাদীর ছিল বেশ কুচক্রী। এরা মুসলমানদের নানাভাবে উৎপীড়ন করতো। এসব ইহুদি গোত্রের কারণে মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। তাই ইহুদিদের দমন করা জরুরি হয়ে পড়লো। মহানবী (সা) একদিন তাঁর ঘনিষ্ট সাহাবিদের ডাকলেন। তাঁদের সাথে পরামর্শ করলেন। সবাই নানা পরামর্শ দিলেন। হজরত হুবাব (রা) বললেন, 

‘প্রিয় নবীজি! আমরা ইহুুদদের বাড়ি-ঘর ঘেরাও করি ফেলি এবং তাদের যাবতীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারি। এতে ইহুদিরা বিপাকে পড়বে এবং তাদের শায়েস্তা করা সহজ হবে।’

আল্লাহর নবী হুবাবের এই পরামর্শ মেনে নিলেন। এ জন্য নবীজি হুবাবের প্রশংসা করলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ