শনিবার ২৬ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

ব্যাংক আমানত হ্রাস উদ্বেগজনক এখনই সতর্ক হতে হবে

 

এম এ খালেক

বাংলাদেশ সফররত ইন্টারন্যাশনাল মানিটরি ফান্ড (আইএমএফ) বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছে। তারা এই সফরকালে বাংলাদেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরের ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের পরিমাণ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার উপর জোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেভাবে প্রদর্শন করে তা নিয়ে আইএমএফ’র আপত্তি আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের আকার নির্ধারণের সময় মামলাধীন প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণাঙ্ক, অবলোপনকৃত ঋণ হিসাবের পাওনা এবং পুনঃতফসিলিকরণকৃত ঋণের পরিমাণ বাদ দেয় যা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংঘর্ষিক। তাই তারা সঠিক পদ্ধতিতে ঋণ হিসাবায়নের পরামর্শ দিয়েছে। আর্থিক খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাবও তারা দিয়েছে। এই প্রস্তাব এমন সময় দেয়া হলো যখন বাংলাদেশ আইএমএফ’র নিকট থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ প্রাপ্তির জন্য কৃত আবেদন সংস্থাটির বিবেচনাধীন রয়েছে। অর্থাৎ আইএমএফ’র এই পরামর্শ প্রকৃত পক্ষে ঋণ প্রাপ্তির শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বিদ্যমান আইনগুলো সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তীব্র আপত্তি রয়েছে। এর আগে বিশ্বব্যাংকও প্রায় একই রকমের সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। আইএমএফ অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের সংস্কারের জন্য বলে আসছিল। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের সেই প্রস্তবনার কোনো গুরুত্ব দেয়নি। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ আইএমএফ’র নিকট থেকে কোনো ঋণ গ্রহণ করেনি। অর্থনীতিবিদ আনু মুহম্মদ বলেন, আইএমএফ প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতকরণ, ভর্তুকি কমানো, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি খাতে হস্তান্তর এসব শর্তই দেয়। বিশ্বের এমন কোনো নজির নেই যে আইএমএফ’র ঋণ নিয়ে কোনো আর্থিক সঙ্কট দূর হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সাল থেকে আইএমএফ বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকা-ে যুক্ত রয়েছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে ১০বার ঋণ নিয়েছে। আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশের কোনো উন্নয়ন হয়নি। বরং যেটা হয়েছে তা হলো অর্থের অপচয় হয়েছে। ইউটিলিটি সার্ভিসের মূল্য বেড়ে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। আইএমএফ’র ঋণ নিয়ে যদি সঙ্কট সমাধা হতো তাহলে শ্রীলঙ্কার আজকের অবস্থা সৃষ্টি হবার কোনো কথা ছিল না। কারণ দেশটি মোট ১৬বার আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়েছে। পাকিস্তান ২২ বার আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা তো এখন খুবই খারাপ। আইএমএফ মূলত কাজ করে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থে। ঋণ গ্রহীতা দেশের কি হলো সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। সরকার অর্থের সন্ধানে আইএমএফ এর নিকট যায়। তাদের দেয়া শর্ত মেনে নেয়। আইএমএফ’র শর্ত মেনে জনগণের ক্ষতি হলে তো সরকারের কিছু আসে যায় না। আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি খাতে হস্তান্তর করা হলে কিছু মানুষের আবার লাভ হয়। উল্লেখ্য, এবার বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ নিয়ে সঙ্কটে পতিত হবার কারণে আইএমএফ’র নিকট থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ প্রাপ্তির জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। আইএমএফ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হিসবায়ন পদ্ধতি নিয়েও আপত্তি তুলেছে। তারা বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভের যে পরিমাণ প্রদর্শন করে প্রকৃত রিজার্ভ তার চেয়ে অন্তত ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কম। এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে যে অর্থ বিনিয়োগ করেছে তা রিজার্ভে অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়, যা আন্তর্জাতিক রীতির পরিপন্থি। যা হাতে নেই তাকে রিজার্ভ হিসেবে প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই। 

আইএমএফ প্রতিনিধিদল দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উপর জোর দিয়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা এবং অসঙ্গতিপূর্ণ আইনি পরিবর্তনগুলো প্রত্যাহারের জন্য পরামর্শ দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যেসব আইনি পরিবর্তন এনেছে তার বেশির ভাগই বাস্তবসম্মত নয়। এবং এসব আইনি পরিবর্তন কার্যত ঋণ খেলাপিদের স্বার্থ রক্ষা করেছে মাত্র। খেলাপি ঋণ শ্রেণিকরণের সময় সীমা বর্ধিতকরণ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের নিয়ম সহজীকরণ করা হয়েছে। নগদ ডাউন পেমেন্ট জমাদানের পরিমাণ কমানো হয়েছে। ঋণ হিসাব অবলোপনের নীতিমালা সহজীকরণ করা হয়েছে। এসব আইনি পরিবর্তন ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা দুর্বল করে ফেলেছে। একটি বিশেষ শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্যই এসব আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর রাজধানীর একটি হোটেলে ব্যবসায়ীদের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তাদের জন্য অনুকূল আইনি সংস্কারের অঙ্গীকার করে আসার মতো ঘটনাও ঘটেছে। পরবর্তীতে সেই আইনি সংস্কার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আসলে কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে তীব্র এবং অসহনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য উন্নত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নীতি সুদ হার বাড়িয়ে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ৩ নবেম্বর সর্বশেষ তাদের নীতি সুদ হার দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে এনিয়ে তারা অন্তত চারবার নীতি সুদ হার বাড়িয়েছে। কিন্তু নীতি সুদ হার বাড়ানোর ফলে তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি মোটেও হ্রাস পায়নি। বরং আরো বেড়েছে। তবে নীতি সুদ হার বাড়ানোর ফলে তাদের অর্থনীতির একটি লাভ হয়েছে। যেসব মার্কিন নাগরিক বিদেশে স্বল্প সময়ের জন্য বিনিয়োগ করেছিলেন তারা তাদের সেই বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিজ দেশে বিনিয়োগ করছেন। এতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার চাঙ্গা হয়েছে। মার্কিন অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের ব্যাংকগুলোর আমানতের পরিমাণ ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একই পন্থা অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অন্তত দুই দফায় নীতি সুদ হার বাড়িয়েছে দশমিক ৭৫ শতাংশ। আগে যেখানে নীতি সুদ হার ছিল ৫ শতাংশ এখন তা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশে। নীতি সুদ হার বাড়ানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাজারে মুদ্রার উপস্থিতি কমিয়ে আনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সম্ভবত ভুলে গেছে যে শুধু নীতি সুদ বাড়ালেই বাজারে মুদ্রার সরবরাহ কমে না। এজন্য আরো কিছু সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। না হলে নীতি সুদ হার বাড়ানোর উল্টো প্রতিক্রিয়া হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ হার বাড়িয়েছে বটে কিন্তু ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দেয়নি। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই ব্যাংক ঋণের সুদ হার এবং আমানতের উপরে প্রদেয় সুদের সর্বোচ্চ সীমা প্রত্যাহার করার জন্য পরামর্শ দিলেও অর্থমন্ত্রী পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দেবার কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে সিডিউল ব্যাংকগুলো ৫ শতাংশ সুদের মাধ্যমে ব্যাংলাদেশ থেকে যে অর্থ ঋণ অথবা ধার হিসেবে নিতো তা এখন ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে গ্রহণ করছে। অর্থাৎ তাদের ঋণ গ্রহণের ব্যয় দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে না দেয়ার কারণে সিডিউল ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের ঋণ দানের ক্ষেত্রে আগের মতোই সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদারোপ করতে পারছে। এতে তাদের মুনাফার পরিমাণ কমে গেছে। চরম মূল্যস্ফীতি কালেও তুলনামূলক কম সুদে ঋণ গ্রহণ করা যাচ্ছে বলে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে আগের চেয়ে বেশি মাত্রায় ঋণ গ্রহণ করছে। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবাহ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১৪ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে চলমান মুদ্রানীতিতে। আগের মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ১১ শতাংশের কিছু বেশি। বর্তমানে দেশের ব্যক্তি খাতে চরম স্থবিরতা বিরাজ করছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এই অস্থির অবস্থায় ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের এমন ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলে তো দেশের শিল্প-কারখানা চাঙ্গা হয়ে উঠার কথা ছিল। কিন্তু কার্যত তা হয়নি।অধিকাংশ ব্যাংকই আমানতের স্বল্পতায় ভুগছে। কারণ আমানতের উপর সর্বোচ্চ সুদ হার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের বেলায় ৬শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে। উদ্বৃত্ত অর্থের মালিকগণ এখন ব্যাংকে আমানত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের পরিমাণ কমেছে ২ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। আগস্ট মাস থেকে ব্যাংকিং সেক্টরে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। গত জুন মাসে এটা ছিল ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। আমানতের বেশির ভাগই মেয়াদি আমানত। মেয়াদি আমানত না হলে সার্বিকভাবে আমানতের পরিমাণ আরো কমে যেতো বলে অনেকেই মনে করেন। কারণ মেয়াদি আমানত চাইলেই মেয়াদ পূর্তির আগে তোলা যায় না। মেয়াদ পূর্তির আগে মেয়াদি আমানত ভাঙ্গানো হলে সুদ পাওয়া যায় কম। ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে জনগণের হাতে নগদ অর্থ আছে ২ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে এটা ছিল ২ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক বহির্ভূত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে সাড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৩ শতাংশ। সাধারণ মানুষের ব্যবহারিত অর্থের বাইরে উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থাকাটা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। কারণ এতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়। সাধারণ মানুষ বা উদ্বৃত্ত অর্থের মালিকগণ তাদের অর্থ ব্যাংকে গচ্ছিত না রেখে ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করছেন কেনো তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, দেশে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এখন ব্যাংকে আমানত রাখলে বছরান্তে ক্ষতি গুণতে হয়। কারণ এখন আমানতের উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক সবে”চ্চ সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। অথচ দেশের মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ আজ আজ কোনো আমানতকারী ব্যাংকে ১০০ টাকা আমানত সংরক্ষণ করলে তিনি এক বছর পর ১০৬ টাকা পাবেন। কিন্তু আজ তিনি যে দ্রব্যটি ১০০ টাকায় ক্রয় করছেন এক বছর পর তা ক্রয় করতে ১০৯ টাকা ১০ পয়সা ব্যয় করতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাগণ তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ পণ্য ক্রয় করতে ব্যয় করছেন। মূলত এসব কারণেই ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও ব্যাংক ঋণের সুদের হার আগের মতোই নির্ধারিত থাকার ফলে এক শ্রেণির ঋণ গ্রহীতা বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ঋণ নিয়ে তা অন্য খাতে প্রবাহিত করছেন। চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও ইতিমধ্যেই তা ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছে গেছে। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির অর্থই হচ্ছে দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। ব্যক্তি খাতে দেয়া ব্যাংক ঋণ যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো তাহলে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতো। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের(২০২০-২০২১) জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যক্তি খাতে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য ঋণপত্র(এলসি) খোলা হয়েছিল ১৭৭ কোটি মার্কিন ডলারের। এবছর একই সময়ে খোলা এলসি’র পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ এই খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৬ শতাংশ। গত বছর একই সময়ে মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছিল ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের। এবার তা ১৪৯ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪শতাংশের বেশি। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল আমদানির জন্য আগের বছর একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছিল ৭৪৭ কোটি মার্কিন ডলারের। এবার তা ৬৩৮ কোটি মার্কিন ডলারে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ শতাংশ। 

অন্যদিকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য গত বছরের একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছিল ১৭৪ কোটি মার্কিন ডলারের। এবার তা ২৬৩ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫১ শতাংশ। ভোগ্য পণ্য আমদানি বাবদ এলসি খোলা হয়েছিল গত বছর ২৪৭ কোটি মার্কিন ডলারের। এবার তা ২৫৮ কেটি মার্কিন ডলারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে ব্যক্তি খাতে যে ব্যাংক ঋণ দেয়া হচ্ছে তা সঠিকভাবে শিল্পায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এই ঋণের অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি বিদেশে পাচারের শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এক শ্রেণির উদ্যোক্তা বিনিয়োগের নামে ব্যাংক থেকে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ গ্রহণ করে তা অন্য খাতে প্রবাহিত করছে। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি হ্রাস কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মনে হচ্ছে,‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।’ একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আমদানি পণ্যের কোনো কোনোটির মূল্য ২০ থেকে ২০০ শতাংশ বাড়িয়ে দেখানোর প্রমান পাওয়া গেছে। আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেখানোর অর্থই হচ্ছে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর দেশ থেকে অর্থ পাচার বৃদ্ধি পায়। আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন এবং জটিল নির্বাচন। এই নির্বাচনে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। তাই যারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তারা এখন তাদের সেই অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের নিরাপত্তার জন্য তা বিদেশে পাচার করতে পারেন। দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ নিয়ন্ত্রণকারী সব কর্তৃপক্ষই তা জানেন। কিন্তু তারা ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কেমন যেনো উদাসীন। কেউ কেউ বলছেন, বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ দেশে ফেরৎ আনা খুবই কঠিন কাজ। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি হ্রাসের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের এই অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করা খুবই প্রয়োজন। তাহলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেড়িয়ে আসতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ