শনিবার ২৬ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

বাংলাদেশের বিজয় দিবস এবং একটি অসত্য বিষয়ের অনাকাক্সিক্ষত পুনরাবৃত্তি 

আশিকুল হামিদ

বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ভারতীয়রা যে তাদের সংকীর্ণ মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন- এটা এক বহুবার প্রমাণিত সত্য। এ প্রসঙ্গে অনেক উদাহরণের ভিড়ে খোঁজাখুঁজি করার পরিবর্তে এই মুহূর্তে হাতের কাছে থাকা বিবিসির একটি রিপোর্টের সাহায্য নেয়া যায়। এটা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক সংগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল। 

ভারতের সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীসহ সশস্ত্র বহিনীসমূহের প্রধান ও বিভিন্ন স্তরের অধিনায়করা তো বটেই, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন রাজ্যের মন্ত্রী থেকে শুরু করে দলনির্বিশেষে ভারতের রাজনীতিকরাও এতে ১৬ ডিসেম্বরকে ভারতেীয়দের বিজয় দিবস হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ভারতীয় সেনাদের বীরত্বের মহিমা তুলে ধরেন। বাদ যাননি খেলোয়াড় এবং তারকারাও। প্রায় সকলেই তাদের বাণী, নিবন্ধ ও টুইটারে দিনটিকে কেবলই ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর অসাধারণ সাফল্যের দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে সংশয় থাকলে যে কেউ বিশেষ করে ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর এবং তার আগের ও পরের বিভিন্ন ভারতীয় পত্রপত্রিকায় এ সংক্রান্ত খবর ঘেঁটে দেখতে পারেন। প্রতি বছরের ডিসেম্বরেই কমবেশি প্রকাশিত হলেও সেবারের ডিসেম্বরে বেশি হয়েছিল প্রশ্নসাপেক্ষ কারণে। সে কারণ সম্পর্কে কথা বাড়ানোর পরিবর্তে এখানে সরাসরি প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। বলে রাখা দরকার, হাতের কাছে রয়েছে বলে বর্তমান নিবন্ধে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ভারতীয় পত্রপত্রিকার সাহায্য নেয়া হবে।

প্রথমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টুইটের উল্লেখ করা যাক। তিনি লিখেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের যে নির্ভিক সেনারা লড়াই করেছিলেন আজকের বিজয় দিবসে তাদের অদম্য সাহসকে স্মরণ করি। তাদের বীরত্ব আর দেশপ্রেমই আমাদের দেশকে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে। তাদের এই মহান আত্মত্যাগ প্রত্যেক ভারতীয়কে চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে।’ 

এ প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবিসির রিপোর্টে একটি তথ্য স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে তথ্যটি হলো, প্রধানমন্ত্রী মোদি সাধারণত বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানানোর কোনো সুযোগ বা উপলক্ষ হাতছাড়া করেন না। কিন্তু সেবারের অর্থাৎ ২০১৮ সালের উপলক্ষ বাংলাদেশের বিজয় দিবস হলেও প্রধানমন্ত্রী মোদি তার বাণীতে বাংলাদেশ শব্দটির উল্লেখ পর্যন্ত করেননি। বলেছিলেন কেবলই ভারতীয় সেনাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কথা। 

প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামন তার টুইটে লিখেছিলেন, ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি, সাহস আর সংকল্পই মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীকে অস্ত্র সংবরণে বাধ্য করেছিল, যা আধুনিক ইতিহাসে বৃহত্তম আত্মসমর্পণগুলোর মধ্যে একটি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের বহুল প্রচারিত ছবি প্রকাশ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আরো লেখেন, ভারতের পরাক্রমের নজির হলো এই ছবিটি। তিনি সেই সাথে ‘ভারতের বীর যোদ্ধাদের’ উদ্দেশে ‘শত শত প্রণাম’ও জানিয়েছিলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামন একথার উল্লেখ করতেও ভোলেননি যে, বিজয় দিবসের ওই দিনটিতে ভারত ৯০ হাজারেরও বেশি পাকিস্তানিকে যুদ্ধবন্দী করেছিল। প্রসঙ্গত বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য তথ্যটি হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতো প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের টুইট বাণীতেও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর নাম পাওয়া যায়নি। তিনিও সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দিয়েছিলেন কেবলই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে। 

ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি মন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র রাজ্যবর্ধন রাঠোরের টুইটে বাংলাদেশের সামান্য উল্লেখ ছিল। কিন্তু তিনিও লিখেছিলেন, ১৯৭১ সালের আজকের দিনে আমাদের সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে পরাজিত করেছিল এবং জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ক্ষমতাসীন এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রধান বিরোধী দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের পক্ষে দেয়া বাণীতে অবশ্য বাংলাদেশের উল্লেখ করা হয়েছিল। দলটির জাতীয় মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা লিখেছিলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। উল্লেখ্য, কংগ্রেসের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী সেদিন বিকেল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিজয় দিবস নিয়ে কোনো টুইট করেননি। বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে কোনো বার্তাও দেননি তিনি। সে কারণে বলা হয়েছিল, এই নীরবতার মাধ্যমে রাহুল গান্ধীও প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের বিজয় দিবসকে সুকৌশলে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের বিজয় দিবসকে নিজেদের তথা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বীরত্ব ও পরাক্রম দেখানোর উপলক্ষ এবং বিজয় দিবস হিসেবে প্রচার করার পাশাপাশি বাংলাদেশের বীর জনগণ ও মুক্তিবাহিনীর অবদানের কথা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার এই কর্মকান্ড সঠিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেও সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কারণ, স্বায়ত্তশাসনের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এদেশের জনগণই স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পরিবর্তে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার গণহত্যার ভয়ংকর অভিযান শুরু করায় তার প্রতিবাদে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এই যুদ্ধে ভারতের জনগণও সমর্থন দিয়েছিল এবং মূলত জনমতের চাপে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল। 

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি মুক্তিবাহিনীকে অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে সমরাস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করলেও ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বরের আগে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের পক্ষে কোনো যুদ্ধে অংশ নেয়নি। সব যুদ্ধই করেছিল বাংলাদেশের দামাল ছেলেরাÑ যাদের মধ্যে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ইপিআর তথা পুর্ব পাকিস্তান রাইফেলস থেকে আগত বাঙালি অফিসার ও জওয়ানরা, ছিল ছাত্র যুবক এবং সাধারণ মানুষ। তাদের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছিল মুক্তিবাহিনী। এ মুক্তিবাহিনীই ধারাবাহিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল। সে যুদ্ধ গেরিলা যুদ্ধ যেমন ছিল তেমনি ছিল প্রথাগত সম্মুখ যুদ্ধও। মুক্তিবাহিনীর কাছে ক্রমাগত পরাজিত হতে হতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যখন চূড়ান্তভাবে পরাজয় বরণের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল তখনই ভারতের সেনাবাহিনী যুদ্ধে অংশ নিতে এগিয়ে এসেছিল। 

অর্থাৎ ভারতীয়রা তখনই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় সময়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব যুদ্ধই আসলে করেছিলেন মুক্তিবাহিনীর দুর্দান্ত সাহসী বীর যোদ্ধারা। ভারতীয়রা প্রকৃতপক্ষে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে যাওয়া যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল মাত্র। সে ক্ষেত্রেও প্রধান ভূমিকা ছিল মুক্তিবাহিনীর। কারণ, মুক্তিযোদ্ধারাই ভারতীয়দের পথ দেখিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে এনেছিলেন এবং বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রাথমিক প্রতিটি যুদ্ধও মুক্তিযোদ্ধারাই করেছিলেন। ভারতের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল বিমান হামলা। কারণ, বাংলাদেশের কাছে তখন কোনো যুদ্ধ বিমান ছিল না। পাকিস্তানের বিমান বাহিনীও ততদিনে শক্তি ও বিমান হারিয়ে ফেলেছিল।

এভাবে যে কোনো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ২০১৮ সালে এসে ভারতীয়রা বিজয় দিবসের যে কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন তা আসলে সঠিক ছিল না বরং সম্পূর্ণরূপে ছিল অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য। যুদ্ধের একেবারে শেষ ক’টি দিনে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার ব্যাপারে তাদের যে অবদান তাকে অবশ্য শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করা উচিত। কিন্তু তার অর্থ আবার এমন নয় যে, সবই ভারতীয়রা করেছিল! 

তাছাড়া এই অভিযোগও সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে যে, গোপনে গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল- পরবর্তীকালের জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে উপস্থিত থাকতে দেয়া হয়নি। তাকে বহনকারী হেলিকপ্টারকে গুলি করে সিলেট অঞ্চলে নামাতে বাধ্য করা হয়েছিলÑ যেখানে তখন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ছিল না। 

জেনারেল ওসমানী উপস্থিত না থাকার কারণেই বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর পক্ষে ভারতীয় জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেছিলেন। অন্যদিকে ভারতীয়রা ঐতিহাসিক এসব সত্যকে অস্বীকার করে নিজেদের মতো কাহিনী তৈরি করেছেন। বাংলাদেশের বিজয় দিবসেও তারা বাংলাদেশের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেন না।  ভারতীয়দের এই স্বার্থসর্বস্ব চিন্তা ও সংকীর্ণ মনোভাবের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানানো দরকার। একই সঙ্গে দরকার সঠিক ইতহাস তুলে ধরাও- যে ইতিহাসে ভারতেরও কিছু অবদান রয়েছে। ভারতীয়দের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশের বীর জনগণের সমর্থন-সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীই বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল- সশস্ত্র সে স্বাধীনতাযুদ্ধের একেবারে শেষ কয়েকটি দিনে ভারতের সেনাবাহিনীরও কিছু ভূমিকা ছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ