শুক্রবার ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
Online Edition

নেই মাধ্যমিক স্কুল ॥ উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত গাইবান্ধার চরাঞ্চলের শিশুরা

গাইবান্ধা থেকে জোবায়ের আলী: চরাঞ্চলে ১১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক স্কুল ও মাদরাসা নেই বললেই চলে। ফলে প্রাথমিকের গ-ি পেরোতেই ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এ অঞ্চলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ঝরে পড়ছে অকালে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে জেলার সামগ্রিক শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর। অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে বাল্যবিয়েসহ শিশুশ্রমে।গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি এই চার উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনায় জেগে ওঠা ছোট-বড় সবমিলিয়ে ১৬৫টি চর-দ্বীপচর রয়েছে এ জেলায়। শিক্ষার্থী ও কথিত ভাড়াটে শিক্ষক দিয়ে চলছে বেশ কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ের পর্যাপ্ত স্কুল না থাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় পাস করার পর ঝরে পড়ছে বেশিরভাগ শিশু। এদের মধ্যে ছেলেরা নিয়োজিত হচ্ছে কৃষিকাজে। আর অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে মেয়েদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার চরাঞ্চলে অন্তত চার লাখ মানুষের বসবাস। নদীতীর সংলগ্ন ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাদরাসা থাকলেও চরে নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। গাইবান্ধা সদরের ব্রহ্মপুত্রের চর কাবিলপুরচরের বাসিন্দা জুনাইদ সিদ্দিকী পড়েন গাইবান্ধা সরকারি কলেজে। তিনি বলেন. ওই চর থেকে গতবছর ২৩ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাস করলেও হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে সাতজন।

তিনি আরো বলেন, ‘চর এলাকায় হাই স্কুল না থাকাই ঝরে পড়ার মূল কারণ। মূল ভূখ- উপজেলা কিংবা জেলা শহরে পড়তে হলে অনেক দূরের পথ অতিক্রম করতে হয়। অনেকেই হাই স্কুলে ভর্তি হলেও মাঝপথে ঝরে পড়ে যাতায়াত ও আবাসন সংকটের কারণে।’ ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী গুনভরি উচ্চ বিদ্যালয়ে এক বছর পড়ার পর যাতায়াত সমস্যার কারণে আর স্কুলমুখো হয়নি মমেনা খাতুন। সে জানায়, তার সঙ্গী হাসনা, রেখা ও তাহেরা পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর আর স্কুলে যায় না। নদী পার হয়ে একা স্কুলে যেতে ভয় লাগে তার। চর কাবিলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রবিউল হাসান জানায়, চরের শিশুদের লেখাপড়া করার অনেক ইচ্ছা থাকলেও আশপাশে হাই স্কুল না থাকায় বাধ্য হয়ে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করতে হয় তাকে। কালাসোনা চরের তিন সন্তানের জনক হবিবুর রহমান (৬০)। তার দুই ছেলে আলাল ও দুলাল। তারা পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর আর স্কুলে যেতে পারেনি। তারা এখন কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তৃতীয় সন্তান হাবিবা বাড়ির পাশে স্কুল থাকায় সে পড়ছে পঞ্চম শ্রেণিতে। নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়া সম্ভব নয় বলে জানান হবিবুর। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে  বলেন, ‘হামরা (আমরা) গরিব মানুষ। বাহিরে নেখাপড়া করাইতে অত ট্যাকা কই পামো (পাবো)? পড়াশুনার খরচা, নাও (নৌকা) ভাড়া দেওন নাগে। নদী পার হতে গেলে কখন কী হয়। মেলা (অনেক) সমস্যা।’ সরকারি পরিসংখ্যানে গাইবান্ধা জেলায় সাক্ষরতার হার ৬৬ ভাগ। চরাঞ্চলের শিক্ষার নিম্নহারের কারণে জেলায় বাড়ছে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। কথা হয় মানবাধিকারকর্মী আব্দুল কাদের ভূইয়া আকাশের সঙ্গে। তিনি  বলেন, ‘দুর্গম চরে যাতায়াত সমস্যা প্রকট। মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ নেই। যেহেতু চরগুলো প্রায়ই নদীভাঙনের কবলে পডে সেক্ষেত্রে প্রতিটি চরে অস্থায়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্থাপন করা হলে ওইসব এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের অকালে ঝরে পড়া থেকে রক্ষা করা যেতো।’ তথ্য বলছে, জেলায় নদীতীর সংলগ্ন দুটি মাদরাসাসহ ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। আর চরে ১১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এই চরাঞ্চল থেকে ৯৮ ভাগ ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাথমিকের গ-ি পাস করলেও অর্ধেকেরও বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না।

এ বিষয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন  বলেন, চরাঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। যে কয়টি বিদ্যালয় আছে তা নদীতীর ঘেঁষে। তবে যে চরগুলোতে মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করার উপযোগী সেই চরগুলোর একটা তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ