শুক্রবার ০২ ডিসেম্বর ২০২২
Online Edition

র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি-মার্কিন রাষ্ট্রদূত

স্টাফ রিপোর্টার: যুক্ত্ররাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বলেছেন, সহিংসতা থাকলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস আরও বলেন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন-র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়াটা কোনো শাস্তি নয়, তারা যেন তাদের আচরণ পরিবর্তন করে, সেজন্যই দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে  রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এবং ফ্রেডরিক-এবার্ট-স্টিফটুং, বাংলাদেশ (এফইএস, বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর সিরিজের তৃতীয় অনুষ্ঠানে একথা বলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)- এর নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের পরিচালনায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস, ফ্রেডরিক-এবার্ট-স্টিফটুং, বাংলাদেশ (এফইএস, বাংলাদেশ’র রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ফেলিক্স কোলবিজ, সিজিএস- এর চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরীসহ অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।  তিন পর্বের এ অনুষ্ঠানের প্রথম অংশে ছিল রাষ্ট্রদূতের বক্তৃতা, দ্বিতীয় অংশে রাষ্ট্রদূতের সাথে একটি আলোচনা পর্ব-যেখানে সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব যেখানে আমন্ত্রিত সাংবাদিকরা সরাসরি রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলেছেন। 

অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএস’র চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী  দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক গভীর। এ সময় তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন নাগরিকদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  এই ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। 

মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সহযোগিতার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। কাজ করছে। আমরা আশা করছি, র‌্যাবের আচরণ পরিবর্তন হবে। অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের উত্তরে পিটার বলেন, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই সভা সমাবেশ, মতামত প্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এক প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও নানা অভিযোগ ওঠে। তবে সেগুলোর তদন্ত হয়। আমরা চাই বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন হোক। আর এটা যুক্তরাষ্ট্রও চেষ্টা করছে। ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র দেখে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, না, মোটেই না। আর আমার এখানে কাজ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়ন করা।

রাষ্ট্রদূত পিটার হাস তাঁর বক্তব্যে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ৫ টি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়। প্রথমত, শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ; গণতন্ত্র, বহুদলীয় গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা, স্বচ্ছতা, সুশাসন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা; সামাজিক ও পরিবেশগত প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষমতা; রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত তাদের সহায়তা করা এবং এই চার লক্ষ্য সার্থকভাবে পরিপালন করলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শ্রমমান উন্নয়নে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা। পারস্পারিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এসব অর্জন সম্ভব বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রদূত। শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবং মার্কিন সামরিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন।

পিটার হাস বলেন, নির্বাচন কমিশনের করণীয় বা সংবিধান সংশোধনী বিষয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। তবে আমি বলতে চাই যে, ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দায়িত্ব নয়। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটা আমি বলতে পারব না। কোনো পেশাদার কূটনীতিক এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে মন্তব্য করবেন না। সুুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণ ঠিক করবে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত আন্তরিকভাবে এবং মানবতার সাথে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন যে, মিয়ানমারে তারা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রর্ত্যাবাসনের পক্ষে এবং অন্যান্য রাষ্ট্র ও উন্নয়ন অংশীদারদের মতো যুক্তরাষ্ট্রও রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশকে সাহায্য করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার, জোরপূর্বক গুম, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্র এক্ষেত্রে সর্বদা সচেতন এবং এটা নিয়ে তারা বারবার বাংলাদেশে কথা বলেছে। মানবাধিকার তাদের কাছে সবসময় প্রাধান্য পায় বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন  সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়, এটা সরকার, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ সমাজের সকল প্রতিষ্ঠানের। সহিংস রাজনৈতিক অবস্থায় নির্বাচন  সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব নয় এবং আগামী নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনিটরিং করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের বিআরআইতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে  তিনি বলেন যে, এটা সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। সরকার তার পছন্দমতো যেকোনো সংস্থার  সাথে যোগ দিতে পারে।

বাংলাদেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে জিল্লুর রহমানের করা একটি প্রশ্নের উত্তরে রাষ্ট্রদূত  বলেন যে, দুই দেশেরই বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। মার্কিন কোম্পানীগুলো এদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি  বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়ে বলেন যে, জিএসপিসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যার মধ্যে শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। এটা নিয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনা করবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যত অর্থনৈতিক অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো হবে কিনা এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন যে, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের অস্থিতিশীল অবস্থা, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সময়ে প্রত্যেকটি রাষ্ট্রই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রত্যেকটি সরকারের স্বতন্ত্র কিছু নিজস্ব পন্থা আছে এসব সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য। এছাড়াও আলোচনায় জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলা, নারীদের ক্ষমতায়ন, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা, আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক সংস্থা সার্ক ইত্যাদি বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। 

কূটনৈতিক শিষ্টাচার প্রসঙ্গে পিটার হাস বলেন, আমি কূটনৈতিক শিষ্টাচার সম্পর্কে অবহিত। অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা যায় না। আমি এটাও অবহিত যে, আন্তর্জাতিক মানদ- মেনে নির্বাচন করার বিষয়ে অনেক পরামর্শ ও সুপারিশ রয়েছে। আমি যখন নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করি, আমি ওই পরামর্শ বিষয়ে কথা বলি। আমি বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মানদ- অর্জনে সহায়তা করতে চায়।

পিটার হাস বলেন, ইন্দো প্যাসিফিক কৌশল- আইপিএসে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া না দেওয়াটা কোনো বিষয় নয়। কেননা এটা একটি নীতি। এটা বাংলাদেশ কিভাবে নেয়, সেটাই দেখার বিষয়। এক প্রশ্নের উত্তরে পিটার হাস বলেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ- বি আরআইয়ে যোগ দেওয়াটা বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ কোন জোটে যোগ দেবে, সেটা তাদের বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ