শুক্রবার ০২ ডিসেম্বর ২০২২
Online Edition

শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগ আতঙ্কের নাম

 ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছাত্রলীগ এখন এক আতঙ্কের নাম। হেন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করে না বা করছে না। চাঁদাবাজি, মাস্তানি, সিট বরাদ্দ করা থেকে ভর্তি, চাকরি-বাকরি এমন কোনো জায়গা নেই যেটা ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগ দখল করে নেয়নি। পরিস্থিতি তারা এমন দাঁড় করিয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই যেকোনো শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ করতে হবে, ছাত্রলীগের মিছিলে যেতে হবে, ছাত্রলীগের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে হবে, তাদের অপকর্মের সহযোগী হতে হবে। তা না হলে আছে গেস্টরুম কালচার। ভিন্নমত পোষণের শাস্তি কখনো কখনো পিটিয়ে হত্যা।

সরকার বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছাত্রলীগ। দস্যুতায় তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তারা এখন সকল আইনের ঊর্ধ্বে। অধিকাংশ সময়ে আমরা দেখি পুলিশ বাহিনীর পাশে আছে আরো একাধিক বাহিনী, লাঠিসোঁটা, রামদা, পিস্তল হাতে পাশাপাশি  অ্যাকশনে আছে ছাত্রলীগ কিংবা অস্ত্র হাতে হেলমেট বাহিনী। এসব ক্সেত্রে সরকারের ঊর্ধ্বতন চাঁইদের কখনো কিছু বলতে শুনি না। বাংলাদেশে আজকাল যারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন তাদের খুব প্রিয় ভাষা ‘পুলিশ কী বসে বসে আঙুল চুষবে? শুধু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরাই নয়,  অন্য মন্ত্রীদের কাছেও এ ভাষা খুব প্রিয়। বিশেষত ওবায়দুল কাদেরের কাছে। কিন্তু আমরা দেখি পুলিশের পাশাপাশি যখন ছাত্রলীগ বাহিনী, হেলমেট বাহিনী হামলা চালায়, গুলি ছোঁড়ে তখন পুলিশ তাদের সহযোগী বাহিনী হিসেবে কাজ করে, তথা আঙুল চোষে।

বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন সব নিম্নমানের লোকদের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, তাদের অদিকাংশেরই শিক্ষা-দীক্ষার ঘাটতি আছে। তারা মেরুদণ্ড হীন এবং প্রশাসক হবার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এরা চাকরিতে টিকে থাকার জন্য সরকার দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। কার্যত এই মেরুদ-হীন প্রশাসনের জন্যই ছাত্রলীগ এতোটা বেপরোয়া হতে পেরেছে। ক্যাম্পাসে খুন, ধর্ষণ, মারামারির মতন নিকৃষ্ট ঘটনাও ঘটাচ্ছে ছাত্রলীগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসন নির্বিকার থাকে কিংবা ছাত্রলীগের কর্মকা-কে যৌক্তিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। ফলে ছাত্রলীগ মহাউদ্দীপনায় তাদের অপকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে।

এই যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের নতুন কমিটি ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছিলেন। সে ঘোষণা তারা আগেই দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রদলকে জানিয়েছিল যে, তাদের দলে যেন কোনো অছাত্র না আসে। ছাত্রলীগ আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা ক্যাম্পাসে ছাত্রদলকে ঢুকতে দেবে না এবং লাঠিসোঁটা, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভিসি অফিসের সামনেই অবস্থান নিয়েছিল। এর পাশেই নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্ধ প্রশাসন না দেখতে পেয়েছে ছাত্রলীগের লাঠিসোঁটা, না দেখতে পেয়েছে সংঘর্ষের আশঙ্কা এবং তারা এ সম্ভাব্য সংঘর্ষ ঠেকানোর কোনো উদ্যোগই নেননি। ছাত্রলীগের সশস্ত্র সদস্যরা যখন ছাত্রদলের সদস্যদের পিটিয়ে ফ্ল্যাট করে দিচ্ছিল, তখনও বিশ্ববিদ্যলয় প্রশাসন নীরব ছিল। শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য পুলিশ ডাকেনি। হ্যালো, ভাইস চ্যান্সেলর আকতারুজ্জামান, পুলিশ কেন ডাকেননি, নাকি আপনি চেয়েছিলেন ছাত্রদলের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের পিটুনিতে পাঁচ-দশজন মরুক। তাতে তার কী এসে যায়। বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর জনৈক গোলাম রাব্বানীকে যেকোনো বিষয়ে ফটাফট মন্তব্য করতে দেখা যায়। কই, বুধবার তো তার চাঁদমুখে কোনো কথা শুনলাম না। এরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন চালান এবং দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীর বাইরে এরা কখনো একপাও ফেলতে পারেন না। এই যে ছাত্রলীগ বিশ^বিদ্যালয়গুলোর হলগুলোতে গেষ্টরুম কালচার সৃষ্টি করেছে, এরা সেটা ঠেকানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেননি। সরকারও তা চায় বলে মনে হয় না। বিশ^বিদ্যালয়ের মেরুদন্ডহীন আত্মমর্যাদাহীন প্রশাসন অত্যন্ত ঘৃণিতভাবে ছাত্রলীগকে সমর্থন করেন কিংবা নিশ্চুপ থাকেন। সেভাবে ছাত্রলীগ ক্যান্সারের মত বিশ^বিদ্যালয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে সেখানকার প্রশাসন একেবারে অর্থহীন করে ফেলেছে।

এখানে স্বার্থের সংঘাত আছে ভর্তি বাণিজ্যের টাকা, সিট বাণিজ্রের টাকা, ডাইনিং হল ব্যবস্থাপনা থেকে টাকা, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে টাকা। এই এক বৃত্তে ঘরপাক খাচ্ছে ছাত্রলীগ। ফলে তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব দেখা তো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ সভাপতির এক গ্রুপ, সাধারণ সম্পাদকের আর এক গ্রুপ কখনো কখনো পদ-বঞ্চিতদের আর এক গ্রুপ। ভিন্ন কত মতাবলম্বী মতালম্ব, ক্ষমতাবলী ক্ষমতাবলম্বীদের আগেই তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ছাত্রলীগের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ। এখন ছাত্রলীগেরই তিন গ্রুপের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায়শই হামলা-হাঙ্গামা হয়। তখনও বিশ্ববিদ্যলয়ের প্রশাসন নীরব থাকে। শিক্ষা গোল্লায় গেলে যাক তাদের কী যায় আসে। তাদের সন্তানরা তো আর এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে না। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা। কে জানে তাদের ভর্তির ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়  কর্তৃপক্ষ তারা আওয়ামী পরিবারের  সদস্য কিনা সেটা খতিয়ে দেখে।

ছাত্রলীগের এই তা-ব শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি ইডেন  কলেজের ঘটনা প্রমাণ করল যে, ছাত্রলীগে নারী-পুরুষের ভেদ নেই। ছাত্রলীগের পুরুষ সদস্যরা যা করতে পারে, নারী সদস্যরাও তার চাইতে এক কাঠি বেশি সরেস কাজ করতে পারে। পুরুষ সদস্যরা শুধু মারপিট, খুন-খারাবি করে, গেস্ট রুমে অত্যাচারে করে। কিন্তু নারী সদস্যরা ছাত্রীদের রুমে আটকে নগ্ন করে ভিওি ধারণ করে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখায়। তারপর তারা ওসব ছাত্রীকে ‘বড় ভাইদের’ মনোরঞ্জনের জন্য পাঠায়। ফলে সিট পেতে ছাত্রলীগ সভানেত্রীকে নাকি ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। মারপিটের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দিতে হয় কমপক্ষে ৮ হাজার টাকা। তাছাড়া ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার ঘট্না হরহামেশাই ঘটে। ফলে অনেক ছাত্রীই আতঙ্কে ইডেনের হল ছেড়ে চলে গেছেন।

ছাত্রলীগ সভানেত্রী তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া চাঁদাবাজি ও সিট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে ছাত্রলীগের আরেক গ্রুপ অভিযোগ আনে। এই রিভা কয়েকদিন আগে দুই ছাত্রীকে বলেছিল যে, হলে তোদের কোন বাবায়, কোন আপায় সিট দেয় আমি দেখে নেবো। এ বিষয়ে ইডেন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস কয়েকদিন আগে গণমাধ্যমে কথা বলেন। সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে রিভা, রাজিয়া মিলে তাকে হল থেকে বের করে দেয়। এতে কলেজের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তারপর শুরু হয় দুই গ্রুপে মারামারি। তাতে নির্যাতনকারীরা গুরুতর আহত হন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘটনার পর পরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু কলেজের প্রিন্সিপাল সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য এই ঘটনার পরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। সাধারণ ছাত্রীরা রিভাকে পিটিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেয়। তারা রিভা, রাজিয়ার বিরুদ্ধে নানারকম স্লোগান দিতে থাকে। কোথায় থাকেন বা কোথায় ছিলেন কলেজের প্রিন্সিপাল সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য। তিনি ক্রিমটা খাছেন দায়িত্বটা নিচ্ছেন না। এইসব নাদান লোকদের দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে আজকের অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এইসব অপদার্থ প্রশাসকদের বিদায় করে সত্যিকার শিক্ষাপ্রেমী দক্ষ প্রশাসক নিয়োগ না করলে ধ্বংস হয়ে যাবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ