শুক্রবার ০২ ডিসেম্বর ২০২২
Online Edition

ইডেন কলেজে হচ্ছে কী?

 মো. তোফাজ্জল বিন আমীন

শিরোনামটি আমার নয়। এটি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় থেকে নেয়া। ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা এখন সংবাদের শিরোনাম। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটির অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে। অনেক নামিদামি মানুষ সেখানে পড়াশুনা করেছেন। কলেজটি ১৮৭৩ সালে রাজধানী ঢাকার আজিমপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী বা বাংলা প্রদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রথম মহিলা কলেজ। এখানে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে। ৬টি ছাত্রীনিবাসে মোট আসন সংখ্যা ৩ হাজার ৩১০ থাকলেও বর্তমানে ৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী বসবাস করছেন। ইডেনের সবুজ ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের বিবাদমান দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত। ইডেনের রেশ কাটতে না কাটতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদলকে পেটাল ছাত্রলীগ। ইডেন কলেজে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের  বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, আসনবাণিজ্যের অভিযোগ উত্থাপনের ঘটনা বেশ পুরানো। কিন্তু ভয়াবহ খবর যেটি ফাঁস হয়ে গেল তা হচ্ছে- সাধারণ ছাত্রীদের দিয়ে অনৈতিক কাজ করানো। তারা সুন্দরী মেয়েদের জিম্মি করে অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করে। এ ঘটনা কারও কারও কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে! কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ছাত্রলীগের নেত্রীরা উপরোক্ত অপকর্মের সহিত জড়িত থাকার খবর পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন হওয়ার সুবাদে তারা পার পেয়ে যায়। কিন্তু এখন খোদ ছাত্রলীগের নেত্রীরাই অপকর্মের ফিরিস্তি সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে উন্মোচন করেছেন।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রলীগের একটা সোনালী অধ্যায় ছিল। কিন্ত বর্তমানে তাদের আচরণে সোনালী অধ্যায়ের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ছাত্রলীগের বিবদমান দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। গত একযুগ ধরে দেশের বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে বিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন জাতীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে কোন ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে মিছিল কিংবা সমাবেশ করার চেষ্টা করলেই ছাত্রলীগ সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অথচ তারা বহুদলীয় গণতন্ত্রের সবক দেয়। কিন্তু তাদের আচরণে সেটা প্রতিফলিত হয় না। দেশের সরকারি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় কলেজে ছাত্রলীগ কারো উপস্থিতি সহ্য করতে পারেনি। তুচ্ছ ঘটনায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।  ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ছিল। কিন্তু এখন তাদের নানা ধরনের আপত্তিকর কর্মকান্ড সংগঠনটির সুনামকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের তৎপরতা চোখে পড়েনি। ছাত্রলীগ এখন সংবাদের শিরোনাম। এমন কোন অপকর্ম নেই যা তারা করছে না। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ধর্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিপক্ষকে বিতাড়নসহ অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে ইডেন মহিলা কলেজ।

রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর ইডেন মহিলা কলেজের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সিট বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ উত্থপান করে সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস বক্তব্য দেন। বক্তব্য দেয়ার অপরাধে ইডেন মহিলা কলেজের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা তাকে আটক ও মারধোর করে। গেল আগস্ট মাসে ছাত্রলীগের এক কর্মীকে হেনস্থা করার অডিও ফাঁস হওয়ার পর ইডেন মহিলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে শুধু চাঁদাবাজি ও সিট বাণিজ্যের কথা উঠেনি,সাধারণ ছাত্রীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা কলেজ প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি,যা সত্যিই দুঃখজনক। গত একযুগ ধরে ইডেন কলেজের নানা অপকর্ম, নোংরামি, মারামারির খবর সংবাদ মাধ্যমে মুদ্রিত হয়েছে। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি। কলিজার টুকরা মেয়েকে কলংকিত হওয়ার জন্য বোধহয় কোন অভিভাবক সেখানে পাঠায়নি। যারা এই হীন অপকর্মে জড়িত তাদেরকে শাস্তির আওতায় এনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ইডেন মহিলা কলেজের সভাপতির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সিট বাণিজ্য, সাধারণ ছাত্রীদের হেনস্তা ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করার খবর নতুন না। এর আগেও নানা কানাঘুষা ছিল। কিন্তু এবার তা ছাত্রলীগই জাতির সামনে উন্মোচন করে দিল। ইডেন কলেজের মত ঘটনা যদি কোন মাদ্রাসায় সংগঠিত হত তাহলে ফলাও করে প্রচার করা হত। কিন্তু একশ্রেণীর সুশীলরা প্রতিবাদ করার সৎ সাহসটুকু দেখাতে পারেনি। ক্ষমতার দাপটে তারা এতটাই বেপরোয়া যে নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর চড়া হতে কিংবা খুন-জখম করতে তাদের হৃদয় কাঁপে না। অভ্যন্তরীণ বিরোধ-সংঘাতে শত শত কর্মী নিহত ও আহত হয়েছেন। শুধু ইডেন কলেজ নয়! দেশের সরকারি বেসরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নিপীড়নের খবর প্রায়ই পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হয়। একটি গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের মারামারির খবর কোনো ভালো লক্ষণ নয়।

ইডেন কলেজের সাধারণ ছাত্রীদের দাবি ছাত্রলীগের নেত্রীরা সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তারা শুধুমাত্র নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয় না; নির্যাতনের আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে, যেন কেউ এব্যাপারে মুখ খুলতে না পারে। নুসরাত কেয়া নামে ইডেন কলেজের স্নাতকের এক ছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন- তিনি ছাত্রলীগের এক নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ১২ হাজার টাকা দিয়ে ছাত্রীনিবাসে উঠেছিলেন। ওঠার পর সেখানে মেঝেতে ঘুমাতে হয়। এক কক্ষে ১২ থেকে ১৩ জন ছিলেন। 

খারাপ পরিস্থিতি ও নির্যাতনের কারণে তিনি ছাত্রীনিবাসে টিকতে পারেননি। ইডেন কলেজের ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার সুবাদে নেতিবাচক ঘটনাগুলো সামনে আসছে। কিন্তু এরকম নিষ্ঠুর ঘটনা দেশের অন্যন্যা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটছে না তার গ্যারান্টি কোথায়? সব ঘটনা তো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় না। যতটুকু প্রকাশিত হয় কেবল ততটুকুই আমরা জানি। এভাবে ক্ষমতার দাপটের চর্চা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতে থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। সরকার যাবে, সরকার আসবে। কিন্তু শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। তাই প্রয়োজন শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চত করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ