শুক্রবার ০২ ডিসেম্বর ২০২২
Online Edition

ইভিএম নিয়ে যথেচ্ছ কার্যক্রম 

অন্য অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মতো নির্বাচন কমিশনও সরকারের টাকা ‘দরিয়ায়’ তথা নদীতে ফেলে দিয়ে নষ্ট করা সম্পর্কিত প্রবাদ বাক্যটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। গতকাল, ২৮ সেপ্টেম্বর কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ প্রধান দলগুলোর আপত্তি উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশন তার একক সিদ্ধান্তে যে এক লাখ ৫০ হাজার ইভিএম বা ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন কিনেছিল তার মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মেশিনই অকেজো বা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ২০১৮ সালে এসব মেশিন কিনতে কমিশনের খরচ হয়েছিল তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের অধীনে কমিশন সে সময় এই মেশিনগুলো কিনেছিল। কমিশনের সূত্র জানিয়েছে, এক লাখ ৫০ হাজার মেশিনের মধ্যে ৯৩ হাজার মেশিন বিভিন্ন আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এর বাইরে ৫৪ হাজার পাঁচশ’ মেশিন রাখা আছে গাজীপুর মেশিন টুল্স ফ্যাক্টরিতে। এছাড়া আড়াই হাজার মেশিন রয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে। উল্লেখ্য, বিশেষ প্রকল্পের অধীনে মেশিনগুলো কেনার সময় প্রতিটি ইভিএমএর জন্য ১০ বছরের ওয়ারেন্টি তথা বিক্রয়োত্তর সেবার নিশ্চয়তা দেয়ার কথা জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে মাত্র দু’বছর যেতে না যেতেই ২৮ হাজার মেশিন অকেজো অথবা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে! 

এদিকে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো অন্য কিছু খবরও রয়েছে প্রকাশিত রিপোর্টে। প্রথম দফায় কেনা মেশিনগুলোর যখন এমন বেহাল দশা তেমন এক সময়ে সমস্যার কোনো বিহিত না করেই কমিশনের অতিউৎসাহী কর্মকর্তাদের উদ্যোগে নতুন করে আরো দুই লাখ ইভিএম কেনার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এজন্য খরচ করতে হবে আট হাজার ৭১১ কোটি টাকা। এর সঙ্গে পূর্ববর্তী প্রকল্পের তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা যোগ করা হলে নির্বাচন কমিশনের মোট ব্যয় বা বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে নয় হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, এটা শুধু কাগজ আর কলমের হিসাব। এর সঙ্গে মেরামতসহ অন্যান্য খরচের হিসাব ধরলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। 

পাশাপাশি রয়েছে মেশিন চালানোর কাজে নির্বাচন কমিশনের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব। মেশিন রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়েও যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন পড়বে। তাছাড়া বেশ কিছু গাড়ি কেনার কথাও রয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে। এই খাতগুলোতে মেশিনগুলোর বাইরে কি পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন পড়বে সে বিষয়ে পরবর্তীকালে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

অর্থাৎ ইভিএম এক বিপুল ব্যয়ের খাতে পরিণত হবেÑ যে ব্যয় সহজেই এড়ানো সম্ভব ছিল। সে সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করেছে এবং আমরাও মনে করি, কাজী হাবিবুল আওয়ালের নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম অতীতের কমিশনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। চলতি বছরের জুন মাসে নির্বাচন কমিশন যখন বিভিন্ন দলের সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছিল তখন পর্যন্তও কমিশন সকল আসনে ইভিএম ব্যবহার করার মতো অবস্থায় আসতে পারেনি। সে অবস্থায় এখনও পরিবর্তন না ঘটলেও কমিশন হঠাৎ ইভিএম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কমিশনের বিরুদ্ধে আরপিও সংশোধনসহ বিশেষ কিছু কারণে সংবিধান বিরোধী ভূমিকা পালনের বিষয়গুলোর ব্যাপারেও এখনও মীমাংসা হয়নিÑ যেসব বিষয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে সংবিধান লংঘনের অভিযোগ রয়েছে। একই কারণে আমরা ইভিএম নিয়ে কমিশনের যে ব্যস্ততা ও কার্যক্রমের বিরোধিতা করি এবং স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ইভিএম এমন এক মেশিন, যা বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি দেশে অনেক আগেই বাতিল এবং পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়েছে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা মনে করি, সব রাজনৈতিক দল একমত হলে যথেষ্ট প্রস্তুতি ও সময় নিয়ে ভবিষ্যতে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। কিন্তু  তার আগে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অনুষ্ঠেয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম-এর ব্যবহার গ্রহণযোগ্য হবে না। একই কারণে নির্বাচন কমিশনের উচিত ইভিএমকেন্দ্রিক চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম বাতিল ঘোষণা করা। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ