ঢাকা, শনিবার 26 November 2022, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী
Online Edition

বিশ্বখ্যাত ইসলামিক স্কলার আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভির ইন্তিকাল

সংগ্রাম অনলাইন : বিশ্বখ্যাত আলেম শায়খ আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভি ইন্তিকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আজ সোমবার রায়টার্সআলজাজিরা আরবি তার ইন্তেকালের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। একইসাথে শায়খ কারজাভির টুইটার একাউন্ট থেকেও তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। তিনি ইসলামি পন্ডিতদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইত্তেহাদুল আলামীলি উলামাইল মুসলিমীন এর সভাপতি ছিলেন। তার মৃত্যুতে গোটা মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। 

 

শায়খ কারজাভির ছেলে কবি আব্দুর রহমান ইউসুফ টুইটবার্তায় বাবার মৃত্যুর বিষয়টি জানান। তিনি লেখেন, ‘ঘোড়সওয়ার ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন’। শায়খ কারজাভির ফেরিভাইড ফেসবুক পেজ ও টুইটার একাউন্ট থেকেও তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। শায়খের পেজে লেখা হয়, ‘ইমাম শায়খ ইউসুফ আল কারজাভি ইন্তিকাল করেছেন। যিনি তার গোটা জীবন ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠায় উৎসর্গ করেছেন..।’ 

 

শায়খ ইউসুফ আবদুল্লাহ আল কারজাভি মিসরীয় বংশোদ্ভূত একজন প্রভাবশালী গবেষক আলেম। তিনি মিসরভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের উপদেষ্টা ছিলেন। মিসরীয় জাতিসত্ত্বার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও শায়খ কারজাভি কাতারে বসবাস করতেন। মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেন এবং সবশেষ মাতৃভূমি ত্যাগ করে কাতারে স্থায়ী হন। ২০১৫ সালে মিসরের একটি আদালত তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-াদেশ জারি করে। 

 

ইসলামী দুনিয়ার যে ক’জন প্রভাব বিস্তারকারী পণ্ডিত শীর্ষস্থানে অবস্থান করছেন তাদের সাথে কারযাভির পার্থক্য এখানে যে; তিনি ইসলামের ব্যাখ্যা ও প্রচারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন ‘সেফ জোনে’ আশ্রয় না নিয়ে বরং মানব জীবনের ও বিশ্বসমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও শিল্পকলায় সমানভাবে কাজ করতে ভালোবাসেন। কুরআন ও সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যগুলোকে যুগোপযোগী ব্যাখ্যার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসার ফলে তার ওপর নির্যাতন ও অপমানের খড়গ হস্ত নেমে এসেছে। তার জীবনে একাধিকবার কারাবরণের ঘটনা ঘটে, স্বৈরশাসন বিরোধী অবস্থানের কারণে মাতৃভূমি ছেড়ে তিনি চলে যেতে বাধ্য হন এবং কাতারে তিন দশকের নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। 

 

জন্ম এবং শিক্ষা জীবন: ইউসুফ আল কারযাভির জন্ম ১৯২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। উত্তর মিসরের নীলনদ তীরবর্তী সাফাত তোরাব গ্রামে। এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে পৃথিবীর আলো দেখেন ভাবিকালের এ মহান জ্ঞানতাপস। মাত্র দুই বছর বয়সে শিশু ইউসুফের বাবা ইন্তিকাল করলে চাচার তত্ত্বাবধানে লালিত হন তিনি।

 

অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী কারযাভির শিক্ষা সূচনা হয় তানতা নামক এক মফস্বলে। তানতার অবস্থান রাজধানী শহর কায়রো থেকে ৯৪ কি. মি. উত্তরে। মাত্র দশ বছর বয়সে কারযাভি কুরআন মাজীদ হিফয করেন এবং তাজবীদ শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করেন। দীর্ঘ নয় বছর তিনি তানতায় অবস্থিত আজহারী ইনিস্টিটিউট থেকে র্ধর্মীয় শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশে কায়রো গমন করেন। তিনি বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় আল-আজহারে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে এখান থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক শেষ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি আরবি ভাষা ও সাহিত্যের উপর ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উসুল আল দ্বীন’ অনুষদ হতে ‘কুরআন-সুন্নাহ সাইন্স’ বিভাগে পুনরায় অনার্স করেন তিনি। অতঃপর ১৯৬০ সালে কুরআনিক স্টাডিজ বিভাগ হতে মাস্টার্স হন। ১৯৭৩ সালে আল-আজহার হতেই তিনি ‘সামাজিক সমস্যা দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ইউসুফ আল কারযাভি ছাত্রজীবনেই ছাত্র-শিক্ষক সকলের মধ্যমণিতে পরিণত হন। মাধ্যমিক স্তরে থাকতেই তার শিক্ষকগণ তাকে ‘আল্লামা’ তথা ‘মহান পন্ডিত’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

 

বর্নাঢ্য কর্মজীবন: শিক্ষা সমাপনান্তে ইউসুফ আল কারযাভি মিসরের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ÔInstitute of Imams’ এর পরিদর্শক হিসেবে কর্মজীবনে পদার্পণ করেন। কিছুদিন তিনি আওকাফ মন্ত্রণালয়ের ‘বোর্ড অব রিলিজিয়াস এফেয়ার্স’ এ কর্মরত ছিলেন। অতঃপর কারযাভি কাতার গমন করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শরীয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এ অনুষদের ডিন নিযুক্ত হন। ১৯৯০ পর্যন্ত তিনি এখানে কর্মরত থাকেন এবং একই বছর তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সীরাত ও সুন্নাহ গবেষণা কেন্দ্র’। অতঃপর ১৯৯০ সালে আলজেরিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্টিফিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মনোনীত হয়ে তিনি আলজেরিয়া গমন করেন। সেখানে ১৯৯০-৯১ সাল দু’বছর কাজ করেন। ১৯৯২ সালে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সীরাত ও সুন্নাহ গবেষণা কেন্দ্র’র ডিরেক্টর হিসেবে পুনরায় কাতার প্রত্যাবর্তন করেন এবং অদ্যাবধি সেখানে কর্মরত আছেন। ইউসুফ আল কারযাভির কর্মক্ষেত্র আঞ্চলিকতা পেরিয়ে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে আন্তর্জাতিকতাবাদের একজন প্রবক্তা। ইউসুফ আল কারযাভি আয়ারল্যান্ড ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা European Council For Fatwa and Research এর প্রধান। তিনি ইসলামিক স্কলারদের বিশ্ববিখ্যাত সংগঠন International Union for Muslim Scholars (IUMS) এরও চেয়ারম্যান। কারযাভি ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (OIC)’র ফিকহ একাডেমি, আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থা রাবেতে আলমে ইসলামীর ফিকহ একাডেমি, রয়াল একাডেমি ফর ইসলামিক কালচার এ রিসার্চ জর্ডান, ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার অক্সফোর্ড এর সম্মানীত সদস্য। কর্মের দিক থেকে বাংলাদেশের সাথেও সম্পৃক্ততা রয়েছে ড. কারযাভির। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC) এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন।

 

কারযাভির চিন্তাধারা: ড. ইউসুফ আল কারযাভি সমাজ বিচ্ছিন্ন জ্ঞান সাধনায় বিশ্বাস করেন না। জীবনঘনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা স্পষ্ট। তিনি ইসলামকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে একজন বহুমাত্রিক চিন্তাযোদ্ধা। ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং উদারতাবাদের ছদ্মাবরণে শিথিলতা ও মৌলিক আদর্শচ্যুতি নীতিকে ভ্রান্ত মনে করেন। বরং রাসূলুল্লাহর (সা.) অনুসৃত দ্বীন কায়েমের মধ্যমপন্থী নীতিকে সঠিক ও একমাত্র উপায় বলে মত দেন ড. কারযাভি। নিজেকে তিনি ‘আধুনিক সংস্কারবাদী’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে ইসলামপন্থার জন্য সহায়ক বলে তিনি মনে করেন না। জন্মভূমি মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমীনের সাথে তিনি উতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। সাইয়িদ কুতুবের পর তাকে ইখওয়ানের প্রধান তাত্ত্বিক নেতা মনে করা হয়।

 

আন্তর্জাতিক ইংরেজি সাময়িকী person of the year the Muslim 500 জার্নালের ২০২০ সংখ্যায় ইউসুফ আল কারযাভিকে ৩২ তম মুসলিম প্রভাবশালী ব্যাক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। উক্ত জার্নালের পুর্বের সংখ্যায় তাকে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং বলা হয়-

 

“Qaradawi is the intellectual leader of the Muslim Brotherhood. He has twice turned down offers to be their leader - in 1976 and 2004-preferring to be free of institutional restrictions.” (ব্রাদারহুডের কেন্দ্রীয় অবস্থানে থেকেও নেতৃত্বের প্রতি তিনি ছিলেন নির্মোহ। এজন্য ১৯৭৬ ও ২০০৪ এ দুই দফায় ব্রাদারহুডের প্রধান নেতৃত্ব গ্রহণের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন)

 

ড. ইউসুফ আল কারযাভি ছাত্রজীবন থেকেই ইসলামী আন্দোলনে একনিষ্ঠভাবে সক্রিয়। একনিষ্ঠতা ও আপোষহীন ভূমিকার কারণে তিনি ইসলাম বিরোধীদের আক্রোশের টার্গেট হয়েছেন বারবার। ১৯৪৭ সালে কিং ফার”ক সরকারের আমলে তিনি প্রথমবার রাজবন্দী হন। ১৯৬১ সালে মাতৃভূমি মিসর ত্যাগ করে কাতার গমনের আগ পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ জামাল নাছের সরকার তাকে তিন বার কারাবন্দী করেন। আরব বসন্তের যে উত্তাল ঢেউ মিসরে আছড়ে পড়ে সে বিপ্লবের প্রধান রূপকারদের একজন ড. কারযাভি। ২০১১ সালে গণবিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে তিনি মিসর ফিরে আসেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তাহরির স্কয়ারে মুক্তি পাগল বিপ্লবী জনতার সমাবেশে জুমার পুর্বে এক ঐতিহাসিক খুতবা দেন কারযাভি। অতঃপর তার ইমামতিতে জুমার সালাত আদায় করা হয়। মিসর বিপ্লবের সফলতার ক্ষেত্রে তার এ বক্তব্যের অনেকখানি ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। সামরিক জান্তা আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসির সরকার ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকার কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। অবশ্য পরে বিশ্বজনমতের চাপে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সিসি সরকার।

 

ড. কারযাভি শুধুমাত্র মিসর নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের একজন উপদেষ্টা, পর্যালোচনাকারী এবং তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক নেতা। তিনি ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, মিন্দানাও সহ বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জোরালো সমর্থক।

 

বিরুদ্ধবাদীদের কঠোর সমালোচনা: ইউসুফ আল কারযাভি কে পশ্চিমা বিশ্বে একজন সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। চরমপন্থী মুসলিমদের কাছেও তিনি অপছন্দনীয়। স্বৈরতান্ত্রিক অগণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা এবং দেশে দেশে ইসলামী গণবিপ্লবের প্রতি নৈতিক সমর্থন, গণতন্ত্রকামী মানসিকতার কারণে বিপরীত মতাবলম্বীদের কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হন ডঃ ইউসুফ আল কারযাভি ।

 

২০০৪ সালে তেইশটি দেশের প্রায় আড়াই হাজার মুসলিম বুদ্ধিজীবী একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করে। সেখানে ‘সন্ত্রাসবাদী ধর্মতাত্ত্বিক’দেরকে বিচারের মুখোমুখী করার জন্যে তারা জাতিসংঘের নিকট আহ্বান জানায়। এই পিটিশনে ইউসুফ আল কারযাভির নাম রয়েছে এবং তাকে Ôsheiks of deathÕ-এর একজন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

 

গণমাধ্যমে ইসলাম প্রচারে তার ভূমিকা: ড. কারযাভি অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যমকে ইসলাম প্রচারকার্যে ব্যবহারের পথিকৃৎ। ড. কারযাভির ‘আশ শারীআহ ওয়াল হায়াহ্’ (শরীয়ত ও জীবন) শিরোনামের টিভি প্রোগ্রামটি বিশ্বের সর্বাধিক দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠানসমূহের একটি। আল জাজিরা টিভি সম্প্রচারিত এ অনুষ্ঠানটির বিশ্বব্যাপী নিয়মিত দর্শক সংখ্যা ৬০ মিলিয়ন (৬ কোটি) বলে অনুমান করা হয়। গণমাধ্যম মাত্রই ‘ক্ষতিকর’ তিনি এমনটা মনে করেন না। বরং অনেকক্ষেত্রেই জনসাধারণের কল্যাণে মিডিয়াকে ব্যবহার করা যায় বলে তিনি মনে করেন। 

 

১৯৭০ সালে কাতারে প্রথম বেতার কেন্দ্র খোলা হলে কারযাভি তখনই এর মাধ্যমে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করেন। কিছুদিন পর কাতারে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হলে সেখানেও তিনি একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। শুক্রবার ও রমজানে এই টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে কাতার থেকে আল জাজিরা স্যাটেলাইট টেলিভিশন সম্প্রচার শুর” করে। আর ১৯৯৬ সালেই কারযাভি সেখানে ‘শরীয়াহ ও জীবন’ শীর্ষক একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান শুরু করেন। এই অনুষ্ঠানটিও ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। নব্বই দশকের শেষ দিকে কারযাভি দুটি ওয়েবসাইট চালু করেন। ১৯৯৭ সালে www.al-qaradawi.net এবং ১৯৯৯ সালে www.islamonline.net  চালু করেন।

 

স্বীকৃতি ও সম্মাননা: ১৪১১ হিজরীতে ইসলামী অর্থনীতিতে অবদান রাখায় তিনি ব্যাংক ফয়সল পুরস্কার লাভ করেন। ১৪১৩ হিজরীতে ইসলামী শিক্ষায় অবদানের জন্য মুসলিম বিশ্বের নোবেল খ্যাত কিং ফয়সাল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে ব্রুনাই সরকার তাকে ‘হাসান বাকলি’ পুরস্কারে ভূষিত করে। এছাড়াও তার বৈচিত্র্যময় পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নিম্নোক্ত পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হন। এর মধ্যে রয়েছে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পদক, মালয়েশিয়া, আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন সম্মাননা পুরস্কার, দুবাই, সুলতান হাসান আল বলকিয়াহ সম্মাননা, ব্রুনাই, আল ওয়াইস পদক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডানের মেডেল অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স।

 

সাহিত্যচর্চা ও গবেষণা: ড. ইউসুফ আল কারযাভি অনন্য সাধারণ লেখনীর গুণে আলোকিত। অসামান্য পাণ্ডিত্য ও চমৎকার উপস্থাপনা পদ্ধতির কারণে তার সাহিত্য সম্ভার বিশ্বব্যাপী বহুল পঠিত। তার গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১২০টি। প্রধান প্রধান সাহিত্য সৃষ্টিগুলো বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

 

বাংলায় অনূদিত ড. কারযাভির বইসমূহের মধ্যে রয়েছে, ইসলামে হালাল হারামের বিধান, ইসলামের যাকাত বিধান (১ম ও ২য় খণ্ড), ইসলাম ও শিল্পকলা, ইসলামী শরীয়তের বাস্তবায়ন, আধুনিক যুগ : ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচী, ইসলামী পুনর্জাগরণ : সমস্যা ও সম্ভাবনা, দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলাম, জেরুজালেম : বিশ্ব মুসলিম সমস্যা, ফতোয়া, ঈমান ও সুখ, মুমিন জীবনে সময়ঃ মুসলিম মানসে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভাবনা, মুমিন জীবনে পরিবারঃ একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবার গঠনে ইসলামি রূপরেখা, ইসলামের ব্যাপকতা, আলিম ও স্বৈরশাসক, উমর ইবনে আবদুল আজিজ (জীবনী), সুন্নাহর সান্নিধ্যে, বুদ্ধিদীপ্ত জাগরণের প্রত্যাশায়, ইসলামের বিজয় অবশ্যম্ভাবী, ইসলাম ও চরমপন্থা, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ তত্ত্ব ও প্রয়োগ, ইসলামে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, ইসলামে এবাদতের পরিধি, উপেক্ষা ও উগ্রতার বেড়াজালে ইসলাম।

 

পারিবারিক জীবন: ব্যক্তিগত জীবনে ড. কারযাভি সহজ-সরল, ব্যক্তিত্ববান ও দায়িত্বশীল মানুষ। পারিবারিক জীবনে তিনি একজন আদর্শ স্বামী ও পিতা। তিন পুত্র ও চার কন্যা সন্তানের জনক তিনি। সন্তানদেরকে সুশিক্ষা ও আদর্শবান করে গড়তে অত্যন্ত যত্নবান একজন অভিভাবক ড. কারযাভি। তার সন্তানদের মধ্যে তিনজন ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী এবং দুইজন দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিত। তাদের একজন কন্যা ইলহাম কারযাভি আন্তর্জাতিক মানের নিউকিয়ার বিজ্ঞানী এবং পুত্র আব্দুর রহমান কারযাভি বিখ্যাত কবি ও মিসরীয় রাজনীতিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ