বুধবার ৩০ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

অশনিসংকেত 

ঢাকা মহানগরীর কিশোর গ্যাং নিয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই লেখালেখি হয়। কিন্তু কাজের কাজতো তেমন হচ্ছে না। কিশোর গ্যাং কালচার এখন এ মহানগরীতেই সীমাবদ্ধ নয়। এদের দৌরাত্ম্য ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সর্বত্র। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশ, লক্ষ্মীপুরে কিশোর গ্যাংগুলো বেপরোয়া। ওদের আড়ালে চাবিকাঠি নাড়ছে বড়ভাইয়েরা। বড়ভাই বলতে বোঝানো হয় এলাকার শীর্ষসন্ত্রাসী ও গডফাদারদের। তারা নিজেদের স্বার্থে এ সব শিশু-কিশোরকে খুনজখমসহ নানা নীতিহীন কাজে ব্যবহার করছে। এদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তাই আইন অনুযায়ী এদের অপরাধের শাস্তি লঘু। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এদের নানা অপকর্মের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ভাবে ওরা চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রেপ, মাদক বাণিজ্যসহ নানান অপরাধে জড়ায়। বলতে গেলে ওরাই এলাকার ত্রাস। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত একই পরিস্থিতি।  অবশ্য পার্বত্য জেলায় এমন অপরাধের সঙ্গে যোগ হয়েছে এক শ্রেণির রোহিঙ্গা তরুণও।

লক্ষ্মীপুরের মতো এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলো আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, মাদক ও প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে যেভাবে অহরহ সংঘর্ষে জড়াচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। সম্প্রতি ওরা ৩ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করে। মোটরসাইকেলকে সাইড না দেয়ায় রাস্তায় ফেলে স্বামীসহ অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে মারধর করে। শুধু তাই না, সামান্য ‘তুই কে’ বলাকে কেন্দ্র করে একজন অন্য জনের ওপর চড়াও হয়েছে। নাতিকে রক্ষা করতে গিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৭০-৭৫ বছর বয়সি এক দাদা নিহত হয়েছেন। এদের ভয়ে অনেক ছাত্রী স্কুল-কলেজ যাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। কেবল লক্ষ্মীপুরে নয়। এ ধরনের কিশোর গ্যাংয়ের দাপট এখন অন্যান্য জেলা শহরেও বেড়েছে। উল্লেখ্য, অধিকাংশ কিশোর গ্যাং সদস্যের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এদের থাকে একটি নির্দিষ্ট নাম ও প্রতীক। সে নাম এবং প্রতীক শরীরে ট্যাটু করা বা পাড়ামহল্লার দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দেবার প্রবণতা দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রয়েছে এদের বিস্তর নেটওয়ার্ক। ক্ষেত্রবিশেষে এরা একই রকম জামাকাপড়, জুয়েলারি ও অলংকার ব্যবহার করে থাকে। এরা ছুরি, রামদা, হকিস্টিক, পিস্তলসহ বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে। সমাজে বৈষম্য, দারিদ্র্য, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, একাকিত্ব, শিক্ষকের বঞ্চনা, খারাপ ফলাফল, সহপাঠীর বিদ্রুপ, হিরোইজম দেখাবার প্রবণতা, মাদকাসক্তি, অশ্লীল ও সহিংসতানির্ভর ছবি, আপত্তিকর ভিডিও গেম, ভিনদেশি কালচারসহ বিভিন্ন কারণে এ গ্যাং কালচারের উদ্ভব। তাই আগামী বংশধরদের বাঁচাতে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে এখন সামাজিক আন্দোলন জরুরি হয়ে পড়েছে। 

আঠারো শতকের শেষে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের জন্য স্যালফোর্ড ল্যাডস ক্লাব নামে ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিল গ্রোভস পরিবার, যা আজ বিশ্বব্যাপী ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাব নামে পরিচিত। স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট ব্যাডেন পাওয়েলের হাত ধরে ক্লাবটি সামনে এগোয়। বলা বাহুল্য, ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী গ্যাং কালচারে ব্যাপক সহিংসতা অনুপ্রবেশ করে। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান হত্যাকা-ের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ রূপ দেখা যায়। কেবল মহানগরী ঢাকাতেই এখন কমপক্ষে ৭০-৮০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। অতএব, সময় থাকতেই এদের থামাতে হবে। আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিশোর গ্যাংগুলোর পৃষ্ঠপোষকদের আগে গ্রেফতার করতে হবে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে এ ব্যাপারে সতর্কতা জারি করা দরকার। পাড়ায় পাড়ায় ও মহল্লায় মহল্লায় যেসব স্থানে এরা আড্ডা দেয় এবং আসর জমায়, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর  নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মুরুব্বিদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে হবে। এমন অপরাধী ও অভিযুক্ত কিশোরদের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। এদের জন্য বাড়াতে হবে কিশোর সংশোধনকেন্দ্র। এ ছাড়া দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এলাকা খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের আওতা বাড়াতে হবে। শিশু-কিশোর, যুবকদের জন্য সৃজনশীল কাজের পরিবেশ বেশি বেশি তৈরি করা গেলে অশুভ গ্যাং কালচার সামাল দেয়া সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা দায়িত্ব পালন না করলে এমন পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে, যা দেশ ও জাতির জন্য অশনিসংকেত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ