বুধবার ৩০ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

আমলাতন্ত্রের সব আমলা মহান নন 

 মুন্সি আবু আহনাফ 

(গতকালের পর)

একদিকে পুঁজিবাদি লাইফস্টাইল অন্যদিকে পরার্থপরতার অর্থনীতি নামের বই লিখে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনার প্রকাশ তার জীবনের একটা বড় প্যারাডক্স। এই প্যারাডক্স নিয়েই তিনি জীবন কাটিয়েছেন। আজকাল আমলা মারা গেলে চারদিকে প্রশংসার ফুলঝুড়ি। আমলা মনে হয় জীবনে একটি দুর্নীতির ফাইলেও স্বাক্ষর করেনি। দেশের এই অবস্থার জন্য এই খানেরা অনেকটায় দায়ী তাতো একেবারে পরিষ্কার। বর্তমান সরকার প্রতিষ্ঠায় যাদের কনট্রিবিউশন সবচেয়ে বেশি, তাদের মধ্যে ড. আকবর আলী খান অন্যতম। আমলা হলেই তিনি মহান এমন মনে করার কোনো কারণ নাই।

আকবর আলী খানের ব্যাপারে অভিযোগ হলো; তাকে মনে করা হয় ১/১১এর অন্যতম কুশীলব। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিষিদ্ধের পক্ষেও তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী প্রবক্তা। যে বিবৃতিটা ২০১৩ সালের ২০ জুলাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছিলো। এই লোকটিকে এতদিন ধরে প্রমোট করেছে দেশের কিছু মিডিয়া। তিনি প-িত ব্যক্তি ছিলেন সত্য। কিন্তু তার পা-িত্যের সীমানা কতটুকু? এই আকবর আলী খানরাই ১/১১ নিয়ে এসেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট যাতে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরতে না পারে সেই পরিকল্পনা থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি যা চেয়েছিলেন সেটাই এখনও চলমান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের মধ্যদিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়, তা এখনও চলমান। আমলা হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। আকবর আলী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর) চেয়ারম্যানও ছিলেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন এবং ২০০২ সালে এ পদ থেকে অবসরে যান। ২০০৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্য, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন আকবর আলী খান। তবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা দেখিয়ে কয়েক মাস পরেই ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেন আকবর আলী খান। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি রেগুলেটরি রিফমর্স কমিশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন।  ড. আকবর আলী খান ১৪টিরও বেশি বই রচনা করেছেন, লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ। অর্থনীতি বিষয়ে ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ এবং ‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি’ নামে তার দুটি বই ব্যাপক জনপ্রিয়। এ ছাড়া তার রচনার মধ্যে রয়েছে অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি, বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, দুর্ভাবনা ও ভাবনা: রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ইত্যাদি।

২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ নামে একটি আন্দোলন শুরু হয়। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের হিংসাত্মক আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে আকবর আলী খানের বিবৃতি। তিনি গণজাগরণ মঞ্চের হিংসাত্মক আন্দোলনের পক্ষে বিবৃতি দেন। দেশের ২০ জন বিশিষ্ট নাগরিক জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে সেই সময় গণজাগরণ মঞ্চ ও আওয়ামী লীগ সরকারে পক্ষে বিবৃতি দেন। নাগরিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও’ এর পক্ষে ২০১৩ সালের ২০ জুলাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছিলো। ১৯ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা বলেছেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী দলের রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিত নয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের উপর্যুপরি চারটি রায়ে বিচারকম-লী তাদের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণে জামায়াতে ইসলামীকে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, ধর্ষণ ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী একটি সংগঠন হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। 

জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির স্বাধীনতার পর থেকে কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভাবাদর্শের বিরোধিতা করেনি, তারা গত চার দশকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ অব্যাহত রেখেছে। তারা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে বানচাল করার জন্য সংখ্যালঘুদের মন্দির ও বিগ্রহ ধ্বংস, রেললাইন উৎপাটন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগসহ চরম নাশকতা সৃষ্টি করেছে। তাদের তা-বের শিকার হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা ভিত্তিহীন নাস্তিক অপবাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নতকারী গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালাতে উদ্যত হয়েছে। সন্দেহাতীতভাবে জামায়াত-শিবির ধর্মের অপব্যাখ্যা ও মিথ্যাচারকে অবলম্বন করে একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের পরিচয় বহন করছে। বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ৫ম ব্যক্তি ছিলেন আকবর আলি খান।

 

তাহলে আকবর আলী খান যেই বাংলাদেশ এনভিশন করেছিলেন সেই বাংলাদেশে জামায়তে ইসলামী থাকবে না। তার মতে ছাত্র শিবির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ অব্যাহত রেখেছে। আকবর আলী খানের মতে গণজাগরণ মঞ্চ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখেছে? তিনি কাদের সহযোদ্ধা ছিলেন? কাদের সাথে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন? আকবর আলী খান কি তার সেই অবস্থান পরিবর্তন করেছিলেন? যদি না করে থাকেন, তাহলে আকবর আলী খান আজকের সংকটময় বাংলাদেশের জনকদের মধ্যে একজন। তার হিংসাত্মক রাজনীতি প্রত্যাখানযোগ্য। পান্ডিত্যকে কুর্নিশ করার কিছু নাই। পান্ডিত্য কোন রাজনীতিকে পুষ্টি দিয়েছে সেটা দেখুন। যা প্রাপ্য নয় তার চেয়ে অতিরিক্ত প্রদান করাটাও একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা । (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ