বুধবার ৩০ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

মার খেতে খেতে বিএনপির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে : এখন তাদের ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা

আসিফ আরসালান

আমরা গভীর দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামী লীগের চন্ড নীতির ফলে বাংলাদেশে রক্তপাতের রাজনীতি শুরু হয়েছে। গত ২২ আগস্ট থেকে ২২ সেপ্টেম্বর- এই এক মাসে বাংলাদেশের তিনটি জেলায় পুলিশের গুলি বর্ষণে এবং আওয়ামী লীগের হামলায় ৪ জন আদম সন্তান অকালে এই পৃথিবীর বুক থেকে ঝরে গেছেন। সর্বশেষ আওয়ামী সরকারের শিকার মুন্সীগঞ্জের তরুণ যুবক মোঃ শাওন। গত ২১ সেপ্টেম্বর বুধবার বিএনপি একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিয়মতান্ত্রিক পথে তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়েছিল। সংবিধানের অনেকগুলি অনুচ্ছেদে সভা সমিতি মিছিল মিটিং করার অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। সেই সাংবিধানিক অধিকারবলেই বিএনপি মুন্সীগঞ্জে সভা সমাবেশ করতে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের সভা সমাবেশ সফল হতে পারেনি। সভার মাঝখানে আওয়ামী লীগের মাস্তান বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনী সম্মিলিতভাবে বিএনপির সমাবেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইতোপূর্বে বিগত ৭ বছর থেকে বিএনপি এবং জামায়াত সহ বিরোধীদল সমূহ সরকারের পেটোয়া বাহিনী এবং পুলিশের সম্মিলিত হামলায় মার খেয়েই যাচ্ছে। পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ এক দিকে বিএনপি ও জামায়াত সহ বিরোধী দলকে পিটিয়েই যাচ্ছে। তারা শুধু মারপিট করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, মারপিট করার পর তারাই আবার বিরোধীদলের নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা দিচ্ছে। এই মামলায় কয়েক হাজার আসামীর নাম দেয়া হচ্ছে এবং হাজার হাজার অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিকে আসামী করা হচ্ছে। 

এভাবে মার খেতে খেতে এবং মামলা মোকাবেলা করতে করতে বিএনপির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের আর পিছু হটার যায়গা নাই। এখন যদি তারা ঘুরে দাঁড়াতে না পারে তাহলে তাদের অস্তিত্ব বিনাশ হয়ে যাবে। তাই বিএনপি নিছক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। এখন প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে বিএনপি নেতৃবৃন্দকেও তাদের কর্মীদেরকে বলতে হচ্ছে, এখন আপনার আত্মরক্ষা করার জন্য আঘাত এলে পাল্টা আঘাত করুন। তাই দেখা যাচ্ছে, একাধিক স্থানে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। তাদের নেতাকর্মীরা অতি সাম্প্রতিক দুই একটি সভায় লাঠির মাথায় বাংলাদেশের পতাকা এবং দলীয় পতাকা নিয়ে সভায় আসছে। গয়েশ^র রায় এক সভায় বলেছেন, এই সব চিকন বাঁশ নিয়ে আসলে হবে না। মোটা মোটা বাঁশ নিয়ে আসুন। অবশ্য এখনও কোথাও বিএনপি বাঁশের লাঠির ব্যবহার করেনি। 

তবে মুন্সীগঞ্জে যখন বিএনপির ওপর সাঁড়াশী আক্রমণ হয় তখন প্রথমে বিএনপি মার খেয়ে পিছু হটে। তখন পিছনে গিয়ে তারা আবার শক্তি সঞ্চয় করে এবং তিন দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। প্রতিপক্ষের অবস্থা এমন সংগিন হয় যে ৪/৫ জন পুলিশ আত্মরক্ষার জন্য নিকটস্থ নদী বক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে। 

এরপর বাইরে থেকে আরো কিছু পুলিশ আসে এবং তারা বিএনপির ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা বেপরোয়াভাবে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং গুলিবর্ষণ করতে থাকে। বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের অনেক নেতাকর্মীর মুখ চোখ ও মাথায় গুলি লাগে। এ ধরণেরই একটি গুলির আঘাতে আহত যুবদলের তরুণ নেতা মোঃ শাওন সহ ৪ জনকে গুরুতর সংকটাপন্ন অবস্থায় ঢাকায় আনা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮ টার সময় মোঃ শাওন শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। সর্বশেষ খবরে জানা যায় যে মুন্সীগঞ্জে গুলিতে আহত অপর তিন জন, যাদেরকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হয়েছে, তাদের তিন জনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। 

॥ দুই ॥

এই হলো এখন রাজনীতির দৃশ্যকল্প। এখন বাংলাদেশের রাজপথ বিরোধী দলীয় কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত। আবার তাদের ওপর ব্যাটন চার্জ করা হচ্ছে। তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হচ্ছে। তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি করা হচ্ছে। বিগত ২২ আগস্ট থেকে বিএনপি জনগণের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। দাবিগুলি ছিল অত্যন্ত জেনুইন। প্রতিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম শুধু বাড়েনি, রীতিমত আকাশ ছুঁয়েছে। আমার এক নিকট জন মাসে ৭০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করেন। তার মত ব্যক্তিও আমাকে সেদিন করুণ কণ্ঠে বললেন, চাচাজান, মাসে ৭০ হাজার টাকা দিয়েও আমার সংসার চলে না। বাড়ি ভাড়া, তিন ছেলে মেয়ের শিক্ষা খরচ, স্ত্রী এবং ছেলে মেয়েদের চিকিৎসা খরচ, যাতায়াত খরচ ইত্যাদি ঐ ৭০ হাজার টাকায় হয় না। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যাই না। উপহার কেনার টাকা পাবো কোথায়! এমনিতেই ৭০ হাজার টাকার পরেও সংসার চলে না, তাই মাসের শেষ সপ্তাহে ধার কর্জ করতে হয় এবং পরের মাসে প্রথম সপ্তাহে বেতন পেলে সেই ধার কর্জ শোধ করি। 

সেই জিনিসপত্রের মূল্য হ্রাস, জ¦ালানির মূল্য হ্রাস এবং লোড শেডিং বাতিলের দাবিতে বিএনপি যে লাগাতার কর্মসূচী দিচ্ছে সেখানে জনগণ সাড়া দিচ্ছেন। কারণ এগুলো তো শুধু বিএনপির দাবি নয়, এগুলো সর্ব সাধারণের দাবি। তাই বিএনপির জনসভায় বিপুল জনসমাগম হচ্ছে। একটি জনসভায় আওয়ামী লীগ হামলা করে, তো পরের সভায় আরো বেশি লোক সমাগম হয়। এর কারণটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। 

কারণ যেসব দাবি নিয়ে বিএনপি আন্দোলন করছে সাধারণ মানুষ ঐসব দাবির মধ্যে তাদের মনের কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ বুঝছে তার থেকে উল্টোটা। তারা ভাবছে সরকার হটাতে তারা এই আন্দোলন করছে। সরকার হটানোর আওয়ামী লীগের এই ভয় একেবারে অমূলক নয়। কিন্তু তার জন্য তো দায়ী আওয়ামী লীগ নিজেই। যদি আন্দোলনওয়ালাদের পিটিয়ে শায়েস্তা করার দিকে আওয়ামী লীগ এনার্জি ব্যয় না করে উত্থিত দাবি দাওয়া কিভাবে মেটানো যায়, তথা জনদুর্ভোগ কিভাকে কমানো যায় সেদিকে যদি নজর দিত তাহলে আন্দোলনের তীব্রতা কমে যেত এবং আওয়ামী লীগ এবং তাদের পুলিশ বাহিনীকেও প্রতিদিন মারপিট এবং টিয়ার গ্যাস ও গুলির আশ্রয় নিতে হতো না। কিন্তু মানুষ যখন ক্ষমতা মদমত্ত হয়ে ওঠে তখন সে যুক্তির ধার ধারে না। আওয়ামী লীগের অবস্থাও হয়েছে তাই। 

কিন্তু তাই বলে জুলুম নির্যাতন করতে গিয়ে তারা বেআইনী কাজ করবে কেন? নারায়ণগঞ্জেও গুলি হলো। পুলিশের তো ছররা গুলি করার কথা। গুলি হলো তো হলো, কিন্তু সেখানে চাইনিজ রাইফেল থেকে মিছিলকারীদের সরাসরি বুক লক্ষ্য করে গুলি করা হলো কেন? আর গুলি তো সাধারণ পুলিশ করেনি। গুলি করেছে ডিবি পুলিশ। নাম কনক। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে তো ডিবি অর্থাৎ ডিটেক্টিভ পুলিশ অংশ নেয় না। এরা নারায়ণগঞ্জে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর মধ্যে অনুপ্রবেশ করলো কিভাবে? এসব সংবাদ তো এমন একটি পত্রিকা দিয়েছে যে পত্রিকাটি সরকারপন্থী এবং যে পত্রিকার মালিক নিজে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। তিনি আওয়ামী লীগ করেন। এরপর চাইনিজ রাইফেল দিয়ে ডিবি পুলিশ কর্তৃক কনকের ওপর গুলিবর্ষণের ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোনো তদন্ত অনুষ্ঠানের কোনো উদ্যোগ নাই কেন? আমরা জানি সেই উদ্যোগ কোনো দিনও গ্রহণ করা হবে না। 

॥ তিন ॥

বিগত ১ মাস ধরে যে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়েছে সেটা আন্দোলনকারীরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ রাখার চেষ্টা করলেও ক্ষমতার দম্ভে সেখানে রক্তপাত ঘটেছে। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই আওয়ামী লীগই জনগণকে শিখিয়েছে যে কোনো রক্তপাতই বৃথা যায় না। সেই আওয়ামী লীগের সুর ধরেই বলছি, এবারের রক্তপাতও বৃথা যাবে না। সরকারের নিয়ত যদি ভাল না থাকে তাহলে তার কার্যকলাপ থেকে সুফল পাওয়ার আশা আর অরণ্যে রোদন করা একই কথা। আওয়ামী লীগের নেতারা বিশেষ করে ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমান, যুবলীগের প্রেসিডেন্ট শেখ পরশ প্রমুখ হুমকি ধামকি দিয়ে বলছেন যে বিএনপি তথা বিরোধীদলকে প্রেস ক্লাব এবং তাদের নয়া পল্টন অফিস এলাকার বাইরে বাংলাদেশের কোথাও বিএনপিকে সভা করতে দেয়া হবে না। যেখানেই তারা সভা করবে সেখানেই তারা হামলা করবে। এসব ঘোষণা দেয়া হচ্ছে প্রকাশ্যে।

একটি সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে শাসক দলের পক্ষ থেকে অষ্টপ্রহর যেসব হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে সেগুলি দেশকে মগের মুল্লুকে পরিণত করছে। আওয়ামী লীগের উৎকট হুমকি শুনে মনে হচ্ছে, জোর যার মুল্লুক তার। এসব গণতন্ত্রের কোনো ভাষা নয়। এসব ফ্যাসিবাদের ভাষা। এসব কর্তৃত্ববাদের ভাষা। এসব পুলিশ রাষ্ট্রের ভাষা।

কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না যে বাংলাদেশের আয়তন ছোট হলেও এখানে ১৭ কোটি লোকের বাস। এখন বাংলাদেশ আর শিশু রাষ্ট্র নয়। অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশ ২০১৫ সালও নয় যে পিটিয়ে আন্দোলন ঠান্ডা করা হবে। গত আগস্ট মাস থেকে শাসক দল সেই পুরানো নীতি অনুসরণ করে যে মারপিটের নীতি অনুসরণ করছে তার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি তথা বিরোধী দলসমূহও ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছে। আগেই বলেছি যে বিরোধী দল সমূহের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের আর পেছনে যাওয়ার রাস্তা নাই। তাই তারা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এখন বিএনপির মত একটি সভ্য ভব্য দলও তাদের রাজনৈতিক ভাষায় কঠোরতা আনছেন। মার খেতে খেতে তাদের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে তাদের মহিলা নেতারাও এখন শক্ত কথা বলছেন। বিএনপি মহিলা দলের নেত্রী আফরোজা আব্বাসও সেদিন খিলগাঁও এর সভায় বলেছেন, “ওরা আমাদের নেতা কর্মীদেরকে পাখির মত গুলি করে মারবে, আর আমরা ভেরেন্ডা ভাজবো নাকি? এত সোজা নয়। আমরাও গর্জে উঠবো। আমরা ধানের শীষ দিয়ে লড়াই করবো। এই লড়াইয়ে আমাদের জিততেই হবে। এটি হলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই। হয় বাঁচবো, না হয় মরবো।”

এই ধরণের উক্তি এখন বিএনপির শীর্ষ নেতার মুখে। আর হবে নাই বা কেন? তারা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আর সেটিই হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিগন্তে ভয়াবহ অশনি সংকেত। যতদূর খবর পাওয়া যাচ্ছে, বিএনপি একটি ৯ দফা রূপরেখা প্রনয়ণ করেছে। সমস্ত বিরোধী দলের কাছে এই রূপরেখা পাঠানো হচ্ছে। তাদের সাথে আলাপালোচনা করে রূপরেখাটি চূড়ান্ত করা হবে। চূড়ান্ত হয়ে গেলে তখন বিএনপি একা হবে না। অন্যান্য বিরোধী দল মিলে তখন শুরু হবে রাজপথে সম্মিলিত লড়াই। এ লড়াই হতে পারে ঐক্যবদ্ধ, হতে পারে যুগপৎ। যেমন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। এই প্রক্রিয়ায় হয়তো আরো দুই এক মাস লাগতে পারে। যখন অন্যান্য বিরোধী দলের সাথে বিএনপির সমঝোতা চূড়ান্ত হবে তখন রাজপথে সমস্ত বিরোধী দল গর্জে উঠবে। আর আওয়ামী লীগও তাদের স্বভাব সুলভ নীতিতে মারপিট করে যদি সম্মিলিত বিরোধী দলকে দমন করতে চায় তাহলে বাংলাদেশে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে। 

সেজন্যই আমরা বলবো, সরকার এবং সরকারি দলের সুমতি ফিরে আসুক। দেশকে আসন্ন মহাদুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারেরই। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ