শুক্রবার ০২ ডিসেম্বর ২০২২
Online Edition

স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে বছরে পাচার হচ্ছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা ----------- বাজুস

স্টাফ রিপোর্টার: চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিদিন দেশে অবৈধভাবে আসছে ২০০ কোটি টাকার স্বর্ণ। বছরে যার অংক দাঁড়ায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। যার পুরোটাই প্রতিবেশি দেশগুলোতে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এদিকে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে চোরাকারবারিদের দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে স্বর্ণের পাইকারি বাজার।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে সোনা ব্যবসায়ীদের সংগঠনটির কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এন্টি স্মাগলিং অ্যান্ড ল’ এনফোর্সমেন্টের চেয়ারম্যান এনামুল হক খান দোলন। সারাদেশে জুয়েলারি শিল্পের বাজারে অস্থিরতা, চলমান সংকট ও সমস্যা, দেশি-বিদেশি চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, অর্থপাচার ও চোরাচালান বন্ধ এবং কাস্টমসসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জোরালো অভিযানের দাবিতে এ সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়। 

এনামুল হক খান দোলন বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার করে প্রতিদিন সারা দেশের জল, স্থল ও আকাশ পথে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ স্বর্ণের অলংকার ও বার চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসছে। যা ৩৬৫ দিন বা বছর শেষে দাঁড়ায় প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। স্বর্ণ পাচার হওয়ায় বড় অংকের ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশের ডলার সংকটের এটা অন্যতম কারণ বলেও মনে করে এ সংগঠনটি। ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী পণ্যমূল্য বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির চরম আঘাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিপর্যস্ত। দেশে দেশে মার্কিন ডলারসহ অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এরই প্রভাব পড়েছে স্বর্ণের বাজারে।  

 

বৈদেশিক মুদ্রা ও চোরাচালান সংকট নিয়ে এই স্বর্ণ ব্যবসায়ী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অব্যাহতভাবে মার্কিন ডলারের মাত্রাতিরিক্ত দাম ও সংকটসহ অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং বেপরোয়া চোরাচালানের ফলে বহুমুখী সংকটে পড়েছে দেশের জুয়েলারি শিল্প। দেশে মার্কিন ডলারের দাম ১১৮ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে চোরাকারবারিদের দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে স্থানীয় পোদ্দার বা বুলিয়ন বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হচ্ছে। পোদ্দারদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে স্বর্ণের পাইকারি বাজার। পোদ্দারদের সঙ্গে চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেটের সম্পর্ক রয়েছে। তাদের দাবি, এই চোরাকারবারিদের একাধিক সিন্ডিকেট বিদেশে স্বর্ণ পাচারের সঙ্গে জড়িত। দেশে চলমান ডলার সংকট ও অর্থপাচারের সঙ্গে সোনা চোরাচালানের সিন্ডিকেটগুলোর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করে বাজুস। এমন পরিস্থিতিতে সোনার বাজার অস্থিরতার নেপথ্যে জড়িত চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে কাস্টমসসহ দেশের সব আইন- প্রয়োগকারী সংস্থার জোরালো অভিযান ও শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সোনার বাজারে শৃঙ্খলা আনতে কঠোর অভিযানের বিকল্প নেই।

এক প্রশ্নের উত্তরে এনামুল হক খান দোলন বলেন, ২০১৮ সালে সোনা আমদানির জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত সাড়ে চার থেকে ৫০০ কেজি সোনা আমদানি হয়েছে। সোনা আমদানির লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখানে জুয়েলারি সমিতি সম্পৃক্ত ছিল না। এখন যারা লাইসেন্স নিয়েও আমদানি করছে না, কেন করছে না এটা আমাদের বোধগম্য নয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা লাইসেন্স দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছি, ডেকে মৌখিকভাবে বলেছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। বাজুসের পক্ষ থেকে আমাদের বক্তব্য যারা লাইসেন্স নিয়ে সোনা আমদানি করছে না, তাদের লাইসেন্স যেন বাতিল করা হয়, এটাই আমাদের দাবি।

অনুষ্ঠানে বাজুস বেশ কিছু প্রস্তাব দেয়। এগুলো হলো- সোনা চোরাকারবারিদের চিহ্নিত করতে বাজুসকে সম্পৃক্ত করে পৃথকভাবে সরকারি মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। পাশাপাশি চোরাকারবারিদের দমনে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে আরও কঠোর আইন করা। ব্যাগেজ রুলের আওতায় সোনার বার ও অলংকার আনার সুবিধা অপব্যবহারের কারণে ডলার সংকট ও চোরাচালানে কী প্রভাব পড়ছে, তা জানতে বাজুসকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে সমীক্ষা পরিচালনার প্রস্তাব করেছে বাজুস। চোরাচালানে জব্দ স্বর্ণের ২৫ শতাংশ পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়। বাজুসের ধারণা- দেশে অবৈধভাবে আসা স্বর্ণের সিকি ভাগও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নজরে আসছে না। ফলে নিরাপদে দেশে আসছে চোরাচালানের বিপুল পরিমাণ সোনার চালান। আবার একইভাবে পাচার হচ্ছে। বাজুসকে সম্পৃক্ত করে আইন প্রয়োগকারী সব দপ্তরের সমন্বয়ে সোনা চোরাচালান বিরোধী সেল গঠন করা। সাংবাদিক সম্মেলনে জুয়েলারি শিল্পের চলমান সংকট মোকাবিলায় গহনার মান উন্নয়নে হলমার্ক নীতিমালা (স্বর্ণের শুদ্ধতার প্রমাণ) ও ডায়মন্ড নীতিমালা প্রণয়নে সরকারের কাছে দাবি জানায় বাজুস। এছাড়া হলমার্ক ছাড়া কোনো অলংকার বিক্রয় করা যাবে না। যদি বিক্রি করে অভিযুক্তদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে জানাবে বাজুস।

বৈধভাবে সোনা আমদানির জন্য একটি ব্যাংকসহ ১৮ প্রতিষ্ঠানকে ডিলার লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- মধুমতি ব্যাংক, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড, জুয়েলারি হাউস, রতনা গোল্ড, অরোসা গোল্ড করপোরেশন, আমিন জুয়েলার্স, স্রেজা গোল্ড প্যালেস, জরোয়া হাউস লিমিটেড, মিলন বাজার, এসকিউ ট্রেডিং, এমকে ইন্টারন্যাশনাল, বুরাক কমোডিটিস এক্সচেঞ্জ, গোল্ডেন ওয়ার্ল্ড জুয়েলার্স, রিয়া জুয়েলার্স, লক্ষ্মী জুয়েলার্স, বিডেক্স গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ড ও ডি ডামাস দি আর্ট অব গ্যালারি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ