বুধবার ৩০ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

আরও ২ আসামী গ্রেফতার ৫ দিনের রিমান্ডে

 

টাঙ্গাইল সংবাদদাতা: টাঙ্গাইলের মধুপুরে আলোচিত চলন্ত ঈগল পরিবহনে ডাকাতি ও এক নারীকে দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় আরও দুই জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার ভোরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও সোহাগপল্লী  থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতাররা হলেন, কালিয়াকৈর উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে মো. আউয়াল (৩০) এবং একই উপজেলার শিলাবহ পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাহেজের ছেলে নুরনবী (২৬)।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার (এসপি) সরকার মোহাম্মদ কায়সার গতকাল শুক্রবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে এ খবর জানান। গত বৃহস্পতিবার ভোরে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ডাকাতির মূলহোতা রাজা মিয়াকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেফতার তিনজনই মাদকাসক্ত। গ্রেফতার রাজা মিয়ার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে ডাকাত চক্রের সম্পর্কে তথ্য নেয়া হচ্ছে। রাজা মিয়া কালিহাতী উপজেলার বল্লা গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। তিনি টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঝটিকা বাসের চালক ছিলেন।

এসপি জানান, ডাকাত চক্রটি আরও কোনো ডাকাতি কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছে কি না, তাদের দলের সদস্য সংখ্যা কত, তারা আর কী ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টাঙ্গাইলের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রুমি খাতুন ভুক্তভোগী নারীর জবানবন্দী নেন। 

 

এ সময় ওই নারী বাসে ঘটে যাওয়া পৈশাচিক ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বাসে থাকা যাত্রী ও ধর্ষণের শিকার নারীর জবানিতে মিলেছে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা। টাঙ্গাইলের আড়াইশ’ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পুলিশি নিরাপত্তায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ভুক্তভোগী নারী। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ডাকাতরা তিনটি স্থান থেকে বাসে উঠে এবং তাদের একজনের সঙ্গে সিটে বসা নিয়ে তার ও বাসের কন্ডাক্টরের তর্ক হয়। ওই নারীব লেন, ‘আমি কুষ্টিয়ার একটি জায়গা থেকে বাসে উঠি। সিরাজগঞ্জের হোটেলে রাত সাড়ে ১১টায় এসে পৌঁছাই। খাওয়া-দাওয়া শেষে গাড়ি চলতে শুরু করে। তার পাঁচ মিনিট পরে তিনটা ছেলে বাসে উঠে। তাদের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর হবে। এরপর তারা বললো, আমাদের আরও লোক আছে সামনে। সামনে গিয়ে বাসে আরও চারটা লোক উঠে। তার মধ্যে আরেকজন বলে, সামনে আমার আরও লোক আছে। সিরাজগঞ্জের মধ্যে আরও ছয়জন উঠে। তাদের সিট পেছনে দেয়া হয়।’ ভুক্তভোগী নিজেকে একজন পরিবহন শ্রমিকের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বলেন, আমার দুটো সিট। ড্রাইভারের গলায় তারা চাকু ধরে। তারপর ড্রাইভার ও হেলপারকে তুলে বাসের পেছনের দিকে নিয়ে আটকে রাখে। সঙ্গে সঙ্গে কন্ডাক্টরকেও তুলে নেয়। তারপর যাত্রীদের মধ্যে বেটা ছেলেদের সবাইকে বেঁধে ফেলে। মুখও বেঁধে ফেলে। টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন সবই কেড়ে নেয়। কারও গহনাও নিয়ে নেয়। তখন আমার কাছে আসে। আমি বাদানুবাদ করায় তারা আমাকে ধর্ষণ করে। এ বিষয়ে টাঙ্গাইল সদর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক খন্দকার সাদিকুর রহমান বলেন, ‘মেয়েটি হাসপাতালে রয়েছেন। এ ধরনের ক্ষেত্রে মেডিকেল বোর্ড করে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এরই মধ্যে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে। পুলিশ জানান, মধুপুরে বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু হয়েছে। রাতে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। অজ্ঞাত ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা বাসটিতে নাটোরের বড়াইগ্রামের বাসিন্দা ফল ব্যবসায়ী যাত্রী হাবিবুর রহমান গাড়িতে উঠেন রাত ১০টায়। তিনি নাটোরের তরমুজ চত্বর থেকে বাসে উঠেন। তিনি আমড়া, কাঁঠাল ও তালবিক্রি করার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। ঈগল পরিবহনে অনেক দিন ধরে নিয়মিত যাতায়াত করা এই যাত্রী বলেন, আমরা বাসে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমাদের বাসটি সিরাজগঞ্জের কাছাকাছি “দিবারাত্রি হোটেলে” রাতের খাবারের জন্য বিরতি দেয়। বাসের অনেকেই ওই হোটেলে খাবার খান। আমিও ওই বাসের সুপার ভাইজার রাব্বি ও সহযোগী দুলালের সঙ্গে বসে খাবার খাই। আগে যে চালক বাস চালাতেন, আজ সেই চালক ছিলেন না। কড্ডার মোড়ে আসার পর গেঞ্জি, শার্ট পরা ১০-১২ জন যাত্রী গাড়িতে ওঠেন। তাদের প্রত্যেকেরই পিঠে ব্যাগ ছিল। তারা বাসের খালি সিটগুলোতে বসে পড়েন। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর যাত্রী বেশে ওঠা এই ডাকাত দলের সদস্যরা ঘুমন্ত যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে একে একে বেঁধে ফেলে। একই সঙ্গে প্রত্যেক যাত্রীর চোখ ও মুখ বেঁধে জিম্মি করে বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তারা। এমনকি শিশুদেরও একই কায়দায় বেঁধে রাখে তারা। পরে সব যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল, টাকা, গহনা লুট করে নেয়। তারপর নারী যাত্রীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।’ হাবিবুর রহমান নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘আমার পাশে বসা নারীকে চার দফায় ধর্ষণ করা হয়েছে বলে আমি অনুধাবন করতে পেরেছি। আমরা অসহায় ছিলাম। হাত, মুখ, চোখ বাঁধাছিল। কিছুই করতে পারিনি। টানা তিন ঘণ্টা আমরা ওই বাসটিতে জিম্মি ছিলাম। বাসটি কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, আমরা কিছুই জানি না। দুর্ঘটনায় শিকার হওয়ার পর আমরা জানতে পারি, টাঙ্গাইলের মধুপুরের রক্তিপাড়া এলাকায় আছি।’ বাসের নারী যাত্রী কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার তারাগুনিয়া গ্রামের শিল্পী বেগম বলেন, ‘আমি আমার অসুস্থ মেয়েকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের সবাইকে হাত, মুখ, চোখ বাইন্দা ডাকাতরা সব লুট কইরা নিছে। আমার স্বামী পিয়ার আলিকে ছুরি দিয়ে আঘাত করছে। আমার কাছ থিকা ৩০ হাজার টাকা নিয়া গেছে।’ ওই বাসে থাকা অন্য নারী যাত্রীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে তিনি জানান।  বাসের আরেক যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ জানান, আমি নাটোর থেকে বাড়ি যাচ্ছিলাম অসুস্থ মাকে দেখার জন্য। সঙ্গে ছিল বেতনের ২২ হাজার ৮০০ টাকা। এর মধ্যে ১০০ টাকা রেখে বাকি পুরো টাকাই ডাকাতেরা নিয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ