মঙ্গলবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
Online Edition

দেশে নতুন নতুন মাদকের ছড়াছড়ি

বাম পাশে নতুন মাদক ‘এক্সট্যাসি’ ডান পাশের উপরে  ‘আইস’ এবং নিচে ইয়াবা 

নাছির উদ্দিন শোয়েব: এলএসডি, আইস, ইয়াবা, শিশা, হেরোইনসহ মাদক নিয়ন্ত্রণে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মাঝে নতুন ধরনের মাদকে সয়লাভ হয়ে যাচ্ছে দেশ। র‌্যাব জানিয়েছে, দেশে নতুন কয়েক ধরনের মাদক পাওয়া গেছে। ‘কুশ’, ‘এক্সট্যাসি’, ‘হেম্প’ ও ‘মলি’ নামে বিদেশে প্রচলিত এসব মাদক দেশে নিয়ে আসা ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি-মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত অভিযানেও কাজ হচ্ছে না। দেশে ৮০ লাখ মানুষ মাদকে আসক্ত। দেশের কারাগারে থাকা ৮২ হাজার বন্দীর মধ্যে ৬০ হাজার মাদক মামলার আসামী।  

জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ২৪ ধরনের মাদক আসছে বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই আসে মিয়ানমার থেকে। সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আসা এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এক বছরে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত থেকে কোটি কোটি পিস ইয়াবা আসছে ঢাকায়। এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়েছে। মাদক নির্মূলে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের মধ্যেও থেমে নেই ইয়াবা ব্যবসা। শুধু ইয়াবাই নয়- সীমান্ত থেকে আসা চালানের মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যের ভয়ঙ্কর মাদক ‘এলএসডি’ ও ‘আইস’। সহজলভ্য হওয়ায় এসব মাদকে আসক্ত হয়ে তরুণ-যুবকরা অপরাধে জড়াচ্ছে। বেড়েছে খুন, ডাকাতি-ছিনতাই চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, মাদক নির্মূলে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবু পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে মাদক আসছে। ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অনেক ফেনসিডিল কারখানা সরিয়ে নিয়েছে। এরপরও ফেনসিডিল পাচার হয়ে আসছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের রক্তে নাফ নদী রঞ্জিত হয়েছে। পর্যটন জেলা কক্সবাজারে ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন বিশ্বজুড়ে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন। রোহিঙ্গারা যাতে ইয়াবা পাচারের মতো অপরাধে না জড়ায়, সরকার সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা দমনে কঠিন থেকে কঠিনতর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। 

 

এক সেমিনারে মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ৬৫ জন মাদক ব্যবসায়ীর উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা জঙ্গি, জলদস্যু ও সর্বহারাদের সরকার পুনর্বাসন করেছে। অনুকম্পা দেখিয়েছে। তবে আবার যদি কেউ সেই পথে পা বাড়ান, তবে কী পরিণতি হবে জানি না। বগুড়ায় মাদক ও সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে পুনর্বাসনের জন্য ৫০ জন পুরুষ মাদক ব্যবসায়ীকে ভ্যানগাড়ি ও ১৫ জন নারীকে সেলাইমেশিন বিতরন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইয়াবা সেবনকারী ব্যক্তি দুই বছরের মধ্যে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ফেনসিডিল খেলে কিডনি বিকল হতে পারে। মাদক ছাড়ুন, দেশকে ভালোবাসুন। চিকিৎসা নিন। সুস্থ থাকুন। লজ্জার কিছু নেই। দেশে ৮০ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী-শুধু ঢাকা বিভাগেই সাড়ে তিন হাজার সন্দেহভাজন মাদক কারবারীর তালিকা রয়েছে তাদের হাতে। কর্মকর্তারা বলেছেন, যাদের চিহ্নিত করে এই তালিকা করা হয়েছে, তাদের নজরদারিতে রেখে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২০ সালেলর তুলনায় এখন সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালে দেশব্যাপী আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদক বিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কয়েকশ সন্দেহভাজন নিহত হয়েছে। 

জানা গেছে, একসময় দেশের মাদকের তালিকায় গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবার আধিপত্য থাকলেও সম্প্রতি বিস্তার ঘটছে আলোচিত ক্ষতিকর মাদক আইস (মেথামফেটামিন) বা ক্রিস্টাল মেথের। বিভিন্ন সংস্থা ও অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, বছরে দেশে আসছে শত কোটি টাকার আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। মাদক নমর্িূল করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা তৎপর থাকলেও পাশের দেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের এই মাদক আসছেই। অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আইসসহ মাদক ঠেকাতে অভিযান আরও জোরদার করার কথা বলছেন। ফেনসিডিল-ইয়াবার চেয়েও মারাত্মক মাদক আইস। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের মতে, আইসে ইয়াবার মূল উপাদান অ্যামফিটামিনের পরিমাণ অনেক বেশি। মানবদেহে ইয়াবার চেয়েও বহুগুণ ক্ষতি করে আইস। এটি সেবনের ফলে অনিদ্রা, অতি উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভার জটিলতা এবং মানসিক অবসাদ ও বিষন্নতার ফলে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। শারীরিক ও মানসিক উভয়ক্ষেত্রে রয়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব। এ মাদকের প্রচলনের ফলে তরুণ-তরুণীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত ও অস্বাভাবিক আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

এদিকে ‘কুশ’, ‘এক্সট্যাসি’, ‘হেম্প’, ‘মলি’ নামে বিদেশে প্রচলিত এসব মাদক দেশে নিয়ে আসা ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর গুলশান থেকে ওনাইসী সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদ নামের এক যুবককে আটক করেছে র‌্যাব। তার সঙ্গে ফয়সাল নামের প্রবাসী এক বাংলাদেশির যোগসাজশ রয়েছে। মঙ্গলবার এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। র‌্যাব বলছে, ‘কুশ’ মারিজুয়ানা বা গাঁজার মতো একধরনের উদ্ভিদ। ওনাইসী রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তাপ নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষ পদ্ধতিতে এই মাদকের চাষাবাদ করছেন। তিনি ‘কুশ’ উৎপাদনের পর সেটি বাজারজাতও করেছেন। তার মোহাম্মদপুরের বাসায় র‌্যাব অভিযান চালিয়েছে। শুধু ‘কুশ’ নয়, ‘এক্সট্যাসি’, ‘হেম্প’, ‘মলি’, ‘এডারল’, ‘ফেন্টানিল’–এর মতো বিভিন্ন ধরনের মাদক বিদেশ থেকে দেশে এনে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজও করছেন ওনাইসী সাঈদ। র‌্যাব জানিয়েছে, মাদকবিজ্ঞানী হওয়ার পরিকল্পনা ছিল ওনাইসি সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদের তিনি বিভিন্ন অপ্রচলিত ও নতুন মাদক বিক্রি এবং তাপ নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে কুশ মাদক তৈরি করতেন। রীতিমতো এই মাদক নিয়ে তিনি গবেষণা শুরু করেছিলেন। এছাড়া কুশ মাদক দিয়ে তৈরি করেছেন সার। ভবিষ্যতে তিনি দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ কুশ চালানের পরিকল্পনা করেছিলেন। এজন্য তার বাসায় কুশ প্ল্যান্টের ফার্ম তৈরি করেন। টেস্ট অ্যান্ড ট্রায়াল হিসেবে সাঈদ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাটের ভেতর তাপ নিয়ন্ত্রণ গ্রো-টেন্ট পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেন। তার প্রতিটি মাদকের বোতলে তাপমাত্রা দেওয়া। কোন বোতলে কোন মাত্রা দিতে হবে সব উল্লেখ করে রেখেছিলেন তিনি। বিভিন্ন অপ্রচলিত ও নতুন মাদক বিক্রি এবং তাপ নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে কুশ মাদক তৈরির অন্যতম মূলহোতা ওনাইসি সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদকে রাজধানীর গুলশান থেকে আটক করে র‌্যাব। অভিযানে বাংলাদেশে প্রথমবার অপ্রচলিত মাদক এক্সট্যাসি, কুশ, হেম্প, মলি, এডারল, ফেন্টানিলসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার ও প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের দেশি-েবিদেশি মুদ্রা জব্দ করা হয়।

র‌্যাব জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায় মাদক চোরাকারবারি ও মাদকসেবীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করছেন। বাংলাদেশে প্রচলিত নয় কিন্তু বিভিন্ন উন্নত দেশে প্রচলিত এমন কিছু মাদকের ব্যবহার বাংলাদেশে আসছে। এতে ধীরে ধীরে আমাদের যুব সমাজ আসক্ত হয়ে পড়ছে। র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে এক্সট্যাসি নামক একটি নতুন মাদকের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে পারে। এক্সট্যাসি হলো মেথানিল ডাই অক্সি মেথাফিটামিন। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১ এর আভিযানিক দল রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে ওনাইসি সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদকে আটক করা হয়। অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ১০১ গ্রাম কুশ, ৬ গ্রাম হেম্প, ০.০৫ গ্রাম মলি, ১ গ্রাম ফেন্টানল, ১৮ গ্রাম কোকেন, ১২৩ পিস এক্সট্যাসি, ২৮ পিস এডারল ট্যাবলেট ও ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও অর্ধলক্ষাধিক মার্কিন ডলার। পরবর্তীসময়ে তার তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি ফ্ল্যাট বাসা থেকে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে তাপ নিয়ন্ত্রণ গ্রো-টেন্টের মাধ্যমে অভিনব পন্থায় বিদেশি প্রজাতির কুশ তৈরির প্ল্যান্ট ও সেটআপ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ওনাইসী সাঈদ তার মাদক কারবার সংশ্লিষ্টতার ওপর তথ্য প্রদান করেন।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতার ওনাইসী সাঈদ দেশের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল/কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বিদেশ থেকে বিবিএ এবং এমবিএ সম্পন্ন করেন। বিদেশে অধ্যায়ন শেষে ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশে অবস্থানকারী পূর্বপরিচিত একজন ওনাইসীকে বিভিন্ন ধরনের অপ্রচলিত মাদক সরবরাহ করতেন। পরবর্তীসময়ে ওই সরবরাহকারী উত্তর আমেরিকার একটি দেশে স্থানান্তরিত হলে, সেখান থেকে এজাতীয় মাদক সাপ্লাই করতে থাকে। এভাবে সে আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে নতুন মাদক এক্সট্যাসির অন্যতম মূলহোতা গ্রেফতার ওনাইসী সাঈদ। সে চার বছর ধরে এক্সট্যাসিসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের মাদকের কারবারের সঙ্গে জড়িত। সে এই সিন্ডিকেটটির মূলহোতা।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ