ঢাকা সোমবার 08 August 2022, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৯, ৯ মহররম ১৪৪৪ হিজরী
Online Edition

মদিনায় হিজরত: প্রেরণার বাতিঘর

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন: হিজরি সনের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর আদর্শ ও ঐতিহ্যের ভিত্তি সম্পৃক্ত। যার সঙ্গে জড়িত আছে বিশ্বমানবতার মুক্তির অমর কালজয়ী আদর্শ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় ও পুণ্যময় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় গমনের ঐতিহাসিক ঘটনা। 

যখন মানবতা পথ হারিয়ে ঘোর অমানিষার অন্ধকারে মুখ থুবরে পড়েছিল, তখন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে তিনি আল্লাহর নবী হিসেবে নিযুক্ত হন। সূরা আল-মুদ্দাসিরের দ্বিতীয় ওয়াহীর মাধ্যমে, আল্লাহ তাকে আদেশ দেন- "ওহে বস্ত্র আবৃত (ব্যক্তি)! উঠো, সতর্ক কর এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। " 

মূলত এ ঘোষণার মাধ্যমে পৃথিবীতে মহানবীর মিশন বা লক্ষ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। আর তা হলো স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব তথা সার্বভৌমত্বের ঘোষণা।

পরবর্তীকালে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন পবিত্র কুরআনের আরও কয়েকটি প্রত্যাদেশের মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)'র রিসালাতের এই মিশনকে আরও সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিত করেন। যেমন, সূরা আস-সফের আয়াত ৯, সূরা আল-ফাতাহর আয়াত ২৮ এবং সূরা আল-তওবার ৩৩ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দেন যেন অন্য সকল দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থার উপর আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করা হয়।

আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) মানুষকে আল্লাহর দাসত্বের দিকে আহবান শুরু করেন। তিনি পৌত্তিলকতা ও দেবতাতন্ত্রের অসারতা তুলে ধরে মূলত কুরাইশ সরদারদের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। বাতিল এই সমালোচনা গ্রহণ করার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তাই মহানবী (স.) ও মুসলমানদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহর রাসূল অত্যন্ত ধৈর্য ও পরম সাহসিকতার সঙ্গে তিনি তাঁর মিশন নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। 

যারা তাঁর দাওয়াহ ইল্লাল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল, তিনি (স) তাদেরকে সংগঠিত করে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি ঈমান, আখিরাতে জবাবদিহিতা, আমানাতে ধারণা, জান্নাতের জন্য আকাঙ্ক্ষা এবং জাহান্নামের ভয়ের ভিত্তিতে তাদের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে বিশ্বস্ত চরিত্রে রূপান্তরিত করেন।

আল্লাহর রাসূলের দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের কাজ যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে ততই মুসলমানদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতন বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর মাধ্যমে মূলত সত্যর পথে সংগ্রামীদের ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা হতে থাকে যা নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে বিশ্বস্ত চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। এক পর্যায়ে কুরাইশদের অত্যাচার যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ে এবং ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মুসলমানদের একটি দল যখন গঠন হয়ে যায়, তখন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নির্দেশে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ২৭ সফর মক্কা মুকাররামা থেকে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করেন, যেটি ছিল ইসলামের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুকুল। মুসলমানদের এই জন্মভূমি ত্যাগ করার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে 'হিজরত' হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। 

মদীনায় হিজরত বিক্ষিপ্ত মুসলমানদের সংখ্যাগত শক্তি একত্রীকরণের প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সে সময় এটা এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে হিজরতকে ঈমান ও কুফরের মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছিল। সূরা আল-আনফালের অনেক আয়াত, আল-নিসা এবং অনেক হাদিস এটি নিশ্চিত করে।

সত্যের পথের সংগ্রামীদের মদীনায় কেন্দ্রিভুত হওয়াকে মক্কার মুশরিকরা সহ্য করতে পারেনি। তারা মদীনায় বারবার আক্রমণ করে। হিজরতের প্রথম পাঁচ বছরে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু এর ফলে রাসূলুল্লাহর আন্দোলন আরও বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে, মুসলমানদের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। হিজরতের অষ্টম বছরে মক্কা বিজয় হয় এবং পরের দুই বছরের মধ্যে আরব উপদ্বীপে আল্লাহর দ্বীন প্রাধান্য পায়।

তাই হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারি ঘটনা। একদিকে মক্কার মুসলমানরা ইসলামের জন্য তাদের বাড়ি-ঘর, সহায়-সম্বল, আত্মীয়-স্বজন তথা সর্বস্ব ত্যাগ করে ত্যাগ ও কুরবানির এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, অন্যদিকে মদীনার মুসলমানরা (আনসার বা সাহায্যকারী) শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মক্কা থেকে আগত মুহাজির ভাইদেরকে আপন ভাই বলে বরণ করে নিয়ে তাদেরকে সর্বাত্মক সহায়তা করেছিলেন। এটি মুসলমানদের জন্য একটি প্রেরণার বাতিঘর। তাই হিজরতের ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যেই ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা:)-এর শাসনামলে ১৭ই হিজরী অর্থাৎ রাসুল মুহাম্মদ (সা:)-এর মৃত্যুর সাত বছর পর চান্দ্র মাসের হিসাবে হিজরী সাল প্রবর্তন করেন। 

অবশ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়কাল থেকেই বিক্ষিপ্তভাবে হিজরি বর্ষ গণনা শুরু হয়। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময় তা সুনির্দিষ্ট রূপে প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়। সে সময় রাষ্ট্রীয় কাজে সন তারিখ ব্যবহৃত না হওয়ায় প্রশাসনিক সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। এ সমস্যা সমাধানকল্পে ১৭ হিজরির ১০ জমাদিউল আউয়াল হজরত আবু মুসা আশয়ারি কর্তৃক হজরত ওমরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি সাহাবায়ে কেরামদের মজলিসে শুরায় সবার পরামর্শক্রমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতকে ভিত্তি করে হিজরি সন গণনার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সম্মেলনের স্লোগান ছিল- ‘হিজরতের ঘটনা মিথ্যা থেকে সত্যের পার্থক্য করেছে, মক্কার অবিশ্বাসীদের ওপর ইসলামের বিজয় এসেছে।’ 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনা মুনাওয়ারায় আসেন, তখন মাসটি ছিল রবিউল আওয়াল। কিন্তু মুসলমানদের হিজরতকারী প্রথম দলটি মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছেন মহররম মাসে। এ হিজরত ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদিনায় হিজরতের শুভ সূচনা। তাই হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হিজরি সনের প্রথম মাস ধরেন মহররমকে। 

হিজরতের পরিকল্পনা হয়েছিল নবুওয়াতের ১৩তম বর্ষের হজের মৌসুমে মদিনার আনসারি সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে আকাবার দ্বিতীয় শপথ সংঘটিত হওয়ার পর। তখন ছিল জিলহজ মাস। তার পরের মাসই হলো মহররম। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ