সোমবার ০৮ আগস্ট ২০২২
Online Edition

উপকূল আবারও লন্ডভন্ড

এইচ এম আব্দুর রহিম

১৯৮৮ সালের ২৯ শে নভেম্বর হারিকেন ঝড়ের কবলে পড়ে প্রথম আক্রান্ত হয় সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট জেলা। এতে শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে। আমি তখন শ্যামনগর উপজেলা সংলগ্ন একটি মাদরাসার অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে হোষ্টেলে থাকতাম। ওই দিন সকাল থেকে প্রবল বেগে বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়া বইছে। ক্রমান্বয়ে বাতাসের তীব্রতা বাড়তে থাকে। মাঝে মাঝে বজ্রপাত হচ্ছে। তখন অঞ্চলের মানুষ আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে গুরুত্ব দিত না। কারণ, উপকূল এলাকা মুহূর্তের মধ্যে প্লাবিত হতে পারে এ ধারণা তাদের ছিল না। সে সময় শতকরা ৯৫ শতাংশ লোকের ঘরবাড়ি ছিল মাটির তৈরি। 

ঝড়ের গতিবেগ ছিল ১৩০ কিলোমিটার থেকে ২০০ কিলোমিটার। এ ঝড়ে কোন ঘরবাড়ি ছিল না। ঝড় সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় অধিকাংশ মানুষ জ্বলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভেসে যায়। আমার পার্শ্ববর্তী গ্রামের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে ১০ জন প্রাণ হারায়। এ ঝড়ে আমার প্রতিবেশীর মধ্যে কয়েকটি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুতে আমার প্রাণ কেঁদে উঠে। যা হোক এবার মূল কথায় আসি। গত ৫ জুলাই থেকে নদীতে জোয়ারের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫/৬ ফিট পানির উচ্চতা বেড়েছে। কারণ, বেশ কিছু দিন যাবৎ পূর্ব দিক থেকে প্রবল বেগে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার কারণে নদীতে ভাটা লাগছে না। মাটির তৈরি রাস্তাগুলো প্রবল পানির দাপটে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

গত ১৪ জুলাই শ্যামনগর উপজেলার দুর্গাবাড়ী ওয়াপদা বাঁধের এক কিলোমিটার ভেঙ্গে প্রায় ৩০ টি গ্রাম নদীর লবণাক্ত পানিতে তলিয়ে নিদারুণ দুঃখের কবলে পড়ে এ এলাকার কয়েক লাখ মানুষ। ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা উদ্বাস্তু হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে। এ এলাকার অর্থনৈতিক ফসল(বাগদা মাছের ঘের) পানির নীচে তলিয়ে গেছে। মাছ চাষিরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। এদিকে কয়রা উপজেলার চরামুখা বাঁধ ও ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। ২/৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়ে। প্রতি বছর ওয়াপদা বাঁধ ভেঙে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হলেও এ ব্যাপারে কারো মাথা ব্যথা নেই। এছাড়া অধিকাংশ রাস্তাগুলো প্রবল ¯্রােতের তোড়ে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। রাস্তার গোড়ার মাটি সরে গেছে। মাটির রাস্তা প্রবল ¯্রােতের কাছে টিকছে না ফলে উপকূলবাসীর কাছে এ এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সবাই যেন একটা অজানা শঙ্কা ও চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। অতিদ্রুত এ অঞ্চলের মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু না করলে এ অঞ্চল নদীর সাথে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে দেশের অন্য কোন এলাকায় পুনর্বাসন করতে হবে। আর বিশাল বিস্তৃত ভূখন্ড মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। 

এদিকে ডেনমার্কের রাজকুমারী ক্রাউন প্রিন্সেস মেরি এলিজাবেথ ডোনাল্ডসন তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গত ২৭ এপ্রিল সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি উপকূলীয় ওয়াপদা বাঁধের অবস্থা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে এ বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এদিকে উপকূলীয় বাঁধগুলো জরাজীর্ণ পড়েছে। 

উপকূলীয় ৪ কোটি মানুষ চরম আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে। প্রতিবছর ৩১ মার্চ, জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা দিবস পালিত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে দেশের জনসাধারণকে দুর্যোগ বিষয়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধ বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। সাগর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গি হয়ে আসে জলোচ্ছ্বাস। কখনো প্রবল বেগে, ভয়ংকর রূপে। এ জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষার জন্য তৈরি করা হয় বেড়িবাঁধ। বাংলাদেশের উপকূলে বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হয় ষাটের দশকে। সাতক্ষীরা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত এ উপকূলের দৈর্ঘ্য সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার। ষাট বছর আগের এ বাঁধের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন জরাজীর্ণ, বিশেষ করে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে। ভাঙাচোরা বাঁধ যে প্রবল জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে অক্ষম।

এখন বিশেষ করে উপকূলীয়বাঁধগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ষাটের দশকে যখন এই বাঁধ যখন নির্মাণ করা হয় তখন এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপযুক্ত জনবল নিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ১৫ থেকে ১৬ বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জনশক্তি ছেঁটে দেয়া হয়। তখন বিবেচনায় নেয়া হয়নি কীভাবে এ বিলুপ্ত জনশক্তির দায়িত্ব কারা পালন করবে। অতীতের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর্যালোচনার সময় এসেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে বন্যা, খরা, নদী ভাঙন, ভূমিধস, উপকূল ভাঙন, বজ্রপাত, কুয়াশা, শিলাবৃষ্টিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাড়বে পানিবাহিত রোগ, উপকূল অঞ্চলের লবণাক্ততা মাত্রাও উপকূলে সমুদ্রের গড় উচ্চতা। বিশ্বের বিজ্ঞানীরা একমত নন যে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাড়বে কি না, এ বিষয়ে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বড় আকারের ঘূর্ণিঝড় ঘন ঘন হচ্ছে এবং তা তীব্রতর। আইলা, সিডর, আম্পান, ফণি, বুলবুল, ইয়াস এগুলো গত ১০-১৫ বছরের ঘটনা। বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে উঁচুমানের পূর্বাভাস তৈরি করা হয়। কিন্তু জনগণের বোধগম্য করে সর্তকবাণী দেয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর দুর্বলতা আছে। একইভাবে জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস এবং সতর্কবাণী প্রণয়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা থাকলেও তা সাধারণ মানুষের পর্যায়ে বোধ্যগম্য করে প্রচারে দুর্বলতা আছে। এ কাজে নতুন করে ভাবতে হবে।

১৯৬৫ সাল থেকে পরবর্তী ১০-১২ বছরে অস্বাভাবিক জোয়ারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের উপকূল জুড়ে বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছে। এখন এসেছে এগুলো পুনঃনির্মাণ বা ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো সংস্কারের বিষয়। উপকূলবাসীর স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। পুরো উপকার দিতে পারে না, এমন অবকাঠামো বানানো থেকে না বানানো ভাল। বর্তমানে গতানুগতিকভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে এমন বাঁধের দরকার নেই। এ বাঁধে জানমালের ক্ষতি বেশি হতে পারে। 

১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরামর্শদাতা সংস্থা বেড়িবাঁধগুলোর একটি মাষ্টার প্ল্যান তৈরি করেছিলেন। এরপর আরেকটি মার্কিন সংস্থা এগুলোর নির্মাণ কাজ তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে পরামর্শ দিয়েছিল।

 

১৯৭০ সালে ওই সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। মাটির তৈরি বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে বিদেশি পরামর্শদাতাদের প্রশিক্ষণ আমরা উৎসাহের সাথে গ্রহণ করি না। মিসিসিপি নদীর পাড়ে নির্মিত মাটির বাঁধ মার্কিনিরা যেভাবে পরিচর্যা করে থাকে সেটি থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। চীন, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে নদীর পাড়ে নির্মিত সুরক্ষার জন্য জনবল অর্থবল ব্যবহার করা হয়েছে যা আমাদের দেশে করা হয় না। স্থানীয় জনসাধারণের এ কাজে সম্পৃক্ত করতে পারলে এ কাজ এগিয়ে নেয়া যেতে পারে। একাজ করতে স্থানীয় পর্যায়ে যে পানি কমিটি গঠন করা হয়েছে এ কমিটি জোরালো করা জরুরি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ