সোমবার ০৮ আগস্ট ২০২২
Online Edition

যুদ্ধের তাপটা আমাদের গায়ে লেগেই গেল

আমাদের প্রিয় স্বদেশ থেকে কত দূরে ইউক্রেন এবং রাশিয়া। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দেশ দু’টি হয়তো আমাদের দরোজার কাছেই। নয়তো ওদের যুদ্ধের তাপটা আমাদের গায়ে এভাবে লাগবে কেন? শুধু আমাদের নয়, তাপটা লেগেছে আরও বহু দেশের গায়ে। আসলে আমাদের পৃথিবীটা তো খুবই ছোট। এ কারণেই বলা হয়, মহাবিশ্বের ছোট্ট একটি গ্রহ আমাদের এই পৃথিবী। এই গ্রহের কোন অংশে কোন ঘটনা ঘটলে তার ভাল-মন্দ প্রভাব তো অন্য অংশেও পড়বে। আর যুদ্ধের মতো কোন ঘটনার প্রভাব তো অবশ্যম্ভাবী। এ কারণেই সুস্থ ও স্বাভাবিক কোন মানুষ যুদ্ধ চায় না। তবুও পৃথিবীতে একের পর এক যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে। আর এসব যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন পৃথিবীর বড় বড় দেশের বড় বড় মানুষরা। ফলে বর্তমান সভ্যতায় বিলিয়ন ডলারের প্রশ্নটি হলো, ওইসব বড় বড় মানুষরা কি সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন?

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে খাদ্য, জ্বালানি, যোগাযোগসহ নানা সংকট। জ্বালানি তেলের চড়া দামের কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এখন লোডশেডিংয়ে সমাধান খুঁজছে সরকার। আমি যখন এ বিষয়ে লিখছি তখনই পড়ে গেলাম লোডশেডিংয়ের কবলে।

বাংলাদেশের চিত্রটা এখন কেমন? তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থগিত, সপ্তাহে একদিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ, সরকারি-বেসরকারি অফিসের কিছু কার্যক্রম ভার্চুয়ালি হচ্ছে, রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ, এলাকাভিত্তিক সম্ভাব্য লোডশেডিংয়ের তালিকা ওয়েবসাইটেÑ এমন চিত্র তো আমাদের কাম্য ছিল না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে তো আমাদের আশাবাদ ছিল বহুমাত্রিক। কিন্তু আমরা এখন এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছিÑ আগামীকাল পরিস্থিতি না জানি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। উপলব্ধি করা যায়, উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের চাইতেও অনেক বেশি ভয়ংকর পরাশক্তিদের যুদ্ধংদেহী সন্ত্রাস। বর্তমান সভ্যতার নায়করা এক আতঙ্কজনক পরিবেশ উপহার দিয়েছে মানব জাতিকে। কোন ভাষায় এখন তাদের সাধুবাদ জানানো যায়? ওদের ভূরাজনীতি ও মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতার দাম্ভিকতায় আমাদের প্রিয় এই পৃথিবী আর কত দিন মানুষের বসবাসযোগ্য থাকবে তা জানি না।

পৃথিবীর ললাটে কি গ্রহণ লেগেছে? নয়তো করোনা মহামারির পরপরই আবার এই যুদ্ধ কেন? করোনাজনিত বিধিনিষেধ, মূল্যস্ফীতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি হয়েছে যোগাযোগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় প্রতিবন্ধকতা। ফলে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যাচ্ছে মারাত্মক সংকট। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানায়, বর্তমানে বিশ্বের ৮২টি দেশের প্রায় ৩৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ডব্লিউএফপি ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বৈশ্বিক খাদ্য সংকট মোকাবিলায় বাণিজ্য বিষয়ক বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে শুক্রবার (১৫/০৭/২০২২ইং) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়। সংস্থাগুলো বলেছে, বাণিজ্য বিধিনিষেধ তুলে নিলে পণ্য সরবরাহে বাধা দূর হবে এবং দাম কমানো সম্ভব হবে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট মোকাবিলা করা সহজ হয়ে উঠবে। সংস্থাগুলোর সময়ের এই আহ্বানে বিশ্ব নেতারা সঙ্গত সাড়া দিতে সক্ষম হন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। তারা আসলে এক বড় পরীক্ষায় পড়ে গেছেন। দুটি পতাকা এখন তাদের সামনেÑ একটি পতাকা মানবের অপরটি দানবের। সভ্যতার ঝলমলে প্রাসাদে কোন পতাকাটি উড্ডীন হয় সেটা দেখার জন্য মানুষ এখন উদগ্রীব।

বর্তমান সভ্যতায় দেশে দেশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে ন্যায়, সুশাসন, বণ্টন ও মানবিক মূল্যবোধের সংকট। পরাশক্তিদের ভূ-রাজনীতি, আগ্রাসন ও মারণাস্ত্র ব্যবসা ওইসব দেশের সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে বহু দেশ এখন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রীলংকার কথা আমরা জানি। ঋণ সংকটে জর্জরিত দেশটির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। গণরোষে দেশটির প্রেসিডেন্টকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তবে শুধু শ্রীলংকা নয়, বিশ্বের বহু দেশ এখন ঋণে জর্জরিত। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক ঋণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের কারণে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে বিশ্বের অন্তত ১২টি দেশ। বলা হচ্ছে, শ্রীলংকার মতো পরিণত হতে পারে লেবানন, সুরিনাম ও জাম্বিয়ার মতো দেশগুলোর। তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হলোÑ আর্জেন্টিনা, ইউক্রেন, তিউনিসিয়া, ঘানা, মিসর, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, এল সালভাদর, পাকিস্তান, ইকুয়েডর, বেলারুশ ও নাইজেরিয়া। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে এমন দেশের তালিকায় প্রথমেই আছে আর্জেন্টিনা। দেশটির বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে মিসর ও ইকুয়েডর। দেশ দুটির ঋণ যথাক্রমে ৪৫ বিলিয়ন ও ৪০ বিলিয়ন ডলার। এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের অবস্থাও বেশ নাজুক হয়ে উঠেছে। দেশটির মুদ্রা ব্যাপকভাবে অবমূল্যায়িত হয়েছে। খাদ্য, জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় আমদানির তুলনায় রফতানি বেশ কম। দেশটির রিজার্ভও এখন খুবই কম। ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। দেশটির মোট রাজস্বের ৪০ শতাংশেরও বেশি ব্যয় হয় ঋণ পরিশোধে। ফলে উন্নয়ন কাজের জন্য অর্থ থাকে সামান্যই।

এদিকে বাংলাদেশের ঋণ জিডিপির সাপেক্ষে তেমন বেশি না হলেও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার সম্ভাবনা কম। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাংলাদেশের উপরও পড়বে বলে অনেক বিশ্লেষক আশংকা করছেন।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়া দেশগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেছে রয়টার্স। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, তালিকার অনেক দেশই খেলাপির দুর্নাম থেকে বাঁচতে পারে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে দ্রুত স্থিতিশীল হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে ভাবনার বিষয় হলো, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ না হলে বিশ্ববাজার স্থিতিশীল হবে কেমন করে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ