বুধবার ৩০ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

নতুন তরঙ্গ যোগ হবার পরও আশানুরূপ উন্নতি ঘটেনি

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : মোবাইল এবং ইন্টারনেট এখন শুধু সৌখিনতাই নয়, এটি জীবনের একটি অংশ। প্রতি মুহূর্তেই এ দুটি ছাড়া যেন চলেই না। প্রয়োজনের তাগিদে এই দুটি জিনিসের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে মোবাইল এর দাম ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ও ইন্টারনেট এর সেবার মান উন্নত থাকলেও বাংলাদেশে যেন এর বিপরীত। মোবাইল ইন্টারনেটের গতির দিক দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা নেপালের থেকেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। শুধু তা-ই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তান বাদে সবার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ। ইন্টারনেটের সেবার মান বাড়াতে মোবাইল অপারেটরগুলোর মাঝে নতুন করে তরঙ্গও বিক্রি করা হয়। এর ফলে নেটওয়ার্কসহ ইন্টারনেট সেবা বাড়বে বলা হলেও গ্রাহকরা বলছেন, সেভাবে আশানুরূপ উন্নতি ঘটেনি। এখনো বহুতল ভবনসহ অনেক স্থানেই দুর্বল নেটওয়ার্ক। অনেক স্থানে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়াও কঠিন। 

‘স্পিড টেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্স’-এর ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বের ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৯তম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক ইন্টেলিজেন্স, টেস্টিং অ্যাপ্লিকেশনস এবং প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ওকলার প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে পাকিস্তান, নেপাল, ভারতের মতো দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এ র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের পেছনে আছে কেবল ১০টি দেশ। ওকলার নিজস্ব ওয়েবসাইট স্পিডটেস্ট ডটনেটে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেট গতির ১৪২টি দেশের হিসাবের মধ্যে ১২৯তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেটে ডাউনলোড স্পিড ১০ দশমিক ৫১ মেগাবিট পার সেকেন্ড (এমবিপিএস)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে শহর এলাকায় জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। গ্রাহক অনুপাতে অপারেটরদের কাছে যে পরিমাণ তরঙ্গ থাকা প্রয়োজন তা বাংলাদেশের অপারেটরদের কাছে নেই। ভালো সেবা দেয়ার জন্য একেকটি অপারেটরের কাছে অন্তত ১০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ প্রয়োজন। অন্যদিকে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় যেভাবে ভবন নির্মাণ করা হয় তাতে নেটওয়ার্ক ডিজাইন করা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ভালো নেটওয়ার্কের জন্য এক টাওয়ারের সঙ্গে আরেক টাওয়ারের মধ্যে অপটিক্যাল ফাইবারের সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এক্ষেত্রে নানা জটিলতার কারণে টাওয়ারে ফাইবার সংযোগ আশানুরূপ নয়।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট মোবাইল সংযোগ ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি দুই লাখ ৯২ হাজার জনে। এর মধ্যে গ্রামীন ফোনেরই রয়েছে ৮ কোটি ৩ লাখ ৮৭ হাজার গ্রাহক। এছাড়া রবি আজিয়াটার ৫ কোটি ৪ লাখ সাত হাজার, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৮ লাখ নয় হাজার ও রাষ্ট্রীয় মালিকানার টেলিটকে রয়েছে ৬০ লাখ ৮৯ হাজার গ্রাহক। একই সময়ে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সবশেষ ৯০ দিনে একবার ইন্টারনেটে সক্রিয় হলেই তাকে গ্রাহক হিসেবে গণ্য করা হয়। দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ৪ লাখ ৮৯ হাজার। এর মধ্যে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাই ১১ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার এবং ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ কোটি ৯৯ হাজার। দিন দিন এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় সেবার মান বাড়েনি। খোদ রাজধানীতেই রয়েছে নেটওয়ার্ক সমস্যা। কলড্রপ, অযাচিত ফোনকল, দুর্বল ইন্টারনেট ব্যবস্থাসহ নানা সমস্যা। এসব বিষয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের অন্ত নেই।

সেলফোনে ইন্টারনেটের গতি প্রসঙ্গে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস এম ফরহাদ বলেন, বিশ্বব্যাপী ফাইভজি এবং গিগাবিট ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণেই অনেক বেশি গতির ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছে। এতে ওইসব দেশ গড় গতিতে অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের মতো যেসব দেশে এখনো ফাইভজি চালু হয়নি স্বভাবতই তারা এ র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে। 

জানা গেছে, গত এপ্রিলে দেশের চারটি মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারে সেবার মান বাড়াতে ফাইভজিসহ ১০ হাজার ৬০১ কোটি টাকার তরঙ্গ বিক্রি করেছে বাংলাদেশ টেলিরোগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)। দুই ব্যান্ডে মোট ১৯০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ কিনেছে টেলিটক, গ্রামীণফোন, রবি এবং বাংলালিংক। ‘স্পেক্ট্রাম অকশন-২০২২’ শীর্ষক নিলামে প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য ধরা হয় ১৫ বছরের জন্য ৬ মিলিয়ন ডলার। অপারেটর ভিত্তিক তরঙ্গের সর্বশেষ হিসাবে গ্রামীণফোনের মোট একসেস তরঙ্গ ৪৭ দশমিক ৪০ মেগাহার্জ থেকে ১০৭ দশমিক ৪০ মেগাহার্জে উন্নীত হবে। রবির মোট একসেস তরঙ্গ ৪৪ মেগাহার্জ থেকে ১০৪ মেগাহার্জে উন্নীত হবে। বাংলালিংকের মোট একসেস তরঙ্গ ৪০ মেগাহার্জ থেকে ৮০ মেগাহার্জে উন্নীত হবে। টেলিটকের মোট একসেস তরঙ্গ ২৫ দশমিক ২০ মেগাহার্জ থেকে ৫৫ দশমিক ২০ মেগাহার্জে উন্নীত হবে। 

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, মোবাইল অপারেটরগুলোর যে তরঙ্গ ছিল তা এখন সবার দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে গ্রাহক এখন থেকে মানসম্মত সেবা পাবে, এটা আশা করা যায়। নিলামকৃত তরঙ্গ ফোর-জি ও ফাইভ-জি উভয়ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে।  এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক অঞ্চলে দ্রুত গতির ফোর-জি সেবার ব্যাপক প্রসারের পাশাপাশি ফাইভ-জি ভবিষ্যতে যাতে কনজ্যুমার প্রোডাক্ট হয় সে লক্ষ্যেও কাজ করছি।  

বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার বলেন, এই তরঙ্গ কেনায় অপারেটরদের তরঙ্গের কোনো ঘাটতি থাকবে না বলে। আমরা আশা করছি, গ্রাহক চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন তরঙ্গের মাধ্যমে মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে পারবে। গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, আবারও ৬০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ কেনার মাধ্যমে দেশের মানুষের ডিজিটাল সম্ভাবনা উন্মোচনে আমাদের অঙ্গীকারকেই পুনর্ব্যক্ত করছে। গ্রাহকদের অভিজ্ঞতার আরও উন্নয়ন এবং সেবার মান উন্নয়ন সব সময়ই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। ভবিষ্যতে নেটওয়ার্কে আমাদের তরঙ্গের ব্যবহার গ্রাহকদের আরও উন্নত ফোর-জি সেবা দিতে সহায়ক হবে, যোগ করেন তিনি। বাংলালিংক জানায়, স্পেকট্রাম বাংলালিংকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি দ্রুততর ইন্টারনেট এবং উন্নতমানের ডিজিটাল সেবা দিয়ে  সহায়ক হবে। 

গ্রাহকদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, নতুন তরঙ্গ যোগ হবার পরও আশানুরূপ উন্নতি ঘটেনি। একইসাথে তারা ইন্টারনেটের ডাটা প্যাকেজের মেয়াদ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো দুই ধরনের সেবা চালু করছে- আনলিমিটেড (মেয়াদবিহীন) ডেটা প্যাকেজ ও নিরবচ্ছিন্ন মাসিক ইন্টারনেট প্যাকেজ।  মেয়াদবিহীন (এক বছর) ডেটা প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণফোনের ১ হাজার ৯৯ টাকায় ১৫ জিবি ও ৪৪৯ টাকায় ৫ জিবির প্যাকেজ। রবির ৩১৯ টাকায় ১০ জিবির প্যাক। বাংলালিংকের ৩০৬ টাকায় ৫ জিবির প্যাকেজ। টেলিটকের রয়েছে দুটি বার্ষিক অফার- ৩০৯ টাকায় ২৬ জিবি, ১২৭ টাকায় ৬ জিবি। আর নিরবচ্ছিন্ন মাসিক ইন্টারনেট প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণফোনের ৩৯৯ টাকার (দৈনিক ১ জিবি পর্যন্ত) ও ৬৪৯ টাকার (দৈনিক ২ জিবি পর্যন্ত) প্যাকেজ। গ্রামীণফোনের ৩৬৫ দিনেরও (প্রতিদিন ১ জিবি পর্যন্ত) প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রবির ৩০ দিন (দৈনিক সর্বোচ্চ ২ জিবি), বাংলালিংকের ৩০ দিনের (দৈনিক সর্বোচ্চ ২ জিবি) প্যাকেজ রয়েছে। টেলিটকের ৩০ দিনের চারটি প্যাকেজ রয়েছে, এগুলোর ব্যবহার দৈনিক যথাক্রমে ১, ২, ৩ ও ৫ জিবি পর্যন্ত। তারা বলছেন, এখনো দুর্বল নেটওয়ার্ক। বিশেষ করে ইন্টারনেট খুবই দুর্বল। বহুতল ভবনে এমনকি অনেক সময় বাসা বাড়িতেও নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যায়না। 

এদিকে মোবাইলের দাম নিয়েও রয়েছে সমালোচনা। যদিও ১৫টি মোবাইল কোম্পানির উৎপাদন ও অ্যাসেম্বলিং কারখানা এখন বাংলাদেশেই। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও পাঁচ-ছয়টি প্রতিষ্ঠান। তারপরও কমছে না দাম। সরকারের বিভিন্ন ধরনের শুল্ক সুবিধা নিলেও বিদেশ থেকে আমদানি করা মোবাইলের মতোই দাম রাখছে কোম্পানিগুলো। জানা যায়, গত অর্থবছর প্রায় ৪ কোটি ১২ লাখ হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও আমদানি হয়েছে। উৎপাদন হওয়া সেটের প্রায় ৬০ শতাংশই হয়েছে দেশে। এছাড়া অবৈধপথে হ্যান্ডসেট আমদানির সংখ্যাও কম নয়। এর পরিমাণও প্রায় ২০ শতাংশ।

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ গ্রাহকদের কাক্সিক্ষত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না দাবি করে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন উৎসাহিত করে রপ্তানি করা ও দেশে সস্তায় হ্যান্ডসেট দিতে আমদানি করা হ্যান্ডসেটের ওপর কর বাড়ায়। অন্যদিকে দেশি উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ কর ছাড় দেয়। যেখানে বিদেশ থেকে আমদানি করা হ্যান্ডসেটের ওপর ৭৫ দশমিক ৩১ শতাংশ কর সেখানে উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে করহার ধার্য করা হয় মাত্র ১৫ শতাংশ। তারপরও দেশে উৎপাদিত মোবাইলের দাম কমছে না। এটা মানা যায়না। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিম্ফনি মোবাইলের ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশন্স) মো. রুপক বলেন, মাঝখানে সব ফোনেরই দাম কমেছিল। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে বাংলাদেশে আমাদের ৬০ বা ৭০ শতাংশ রেডি করতে হয়। কিছু জিনিসের জন্য তো আমাদের চায়নার উপর নির্ভর করতেই হচ্ছে। চায়নাতে এসব জিনিসের দাম বেশি। এটা আসলে আমাদের করার কিছু নেই। কারণ এখন ডলারের দামও বাড়ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ