রবিবার ২৬ জুন ২০২২
Online Edition

বন্যা এবং ভারতের পানি আগ্রাসন

 আশিকুল হামিদ: ভারতের বিরুদ্ধে আবারও বাংলাদেশ বিরোধী পানি আগ্রাসনকে জোরদার করার অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, আষাঢ়ের প্রবল বর্ষণ এবং বর্ষা মওসুমের কারণে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা যখন প্রাকৃতিক নিয়মে পানিতে তলিয়ে গেছে, লাখ লাখ খাদ্য ও বস্ত্রহীন বিপন্ন মানুষ যখন আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে ঠিক তেমন এক ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে ভারত হঠাৎ বিভিন্ন বাঁধের গেট খুলে দিয়েছে। এর ফলেই বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির এত দ্রুত ও মারাত্মক অবনতি ঘটছে। পানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভারত বিশেষ করে তিস্তা নদীর উজানে নির্মিত গজলডোবা বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দিয়েছে। এর ফলে ধেয়ে আসতে শুরু করেছে বন্যার পানি। আর সে পানিতেই তলিয়ে গেছে নীলফামারী ও কুড়িগ্রামসহ দেশের উত্তর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো। এখনো তলিয়ে যাচ্ছে ওই অঞ্চলের বহু নতুন নতুন এলাকা। তারও আগে একই ভারতের কারণেই সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ ওই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। 

বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের খবরে জানানো হয়েছে, দিনের পর দিন ধরে টানা বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ী ঢলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র ও বরাক নদের উপত্যকায় ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়ে আসাম রাজ্য জুড়েও। পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটলে দেশটি গজলডোবা বাঁধের গেটগুলো খুলে দেয়। এর ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নীলফামারীর ডিমলা, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা ও কালিগঞ্জ উপজেলার সব গ্রামের পাশাপাশি অসংখ্য চরও উজানের পানির তলে তলিয়ে যায়। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। খবরে বলা হয়েছে, ভারত যদি গজলডোবা বাঁধের গেটগুলো বন্ধ না করে তাহলে পরিস্থিতির ভয়ংকর অবনতি ঘটতে থাকবে এবং আশপাশের আরো অনেক জেলা ভারতের বন্যা ও ঢলের পানিতে তলিয়ে যাবে। 

প্রকাশিত খবরে প্রসঙ্গক্রমে ১৯৯৮ সালে নির্মিত গজলডোবা বাঁধের ইতিহাস উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, বন্যা হলে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজের ৬০ কিলোমিটার উজানে নির্মিত এ বাঁধটির ৫৪টি গেটই ভারত খুলে দেয়। এর ফলে বন্যায় তলিয়ে যায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। আবার শুষ্ক মওসুমে ভারত একই বাঁধের গেটগুলো বন্ধ করে। তখন গজলডোবার উজানে তিস্তা-মহানন্দা খালের মাধ্যমে ২৯১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের ভেতরে পানি পবেশ করে। এই বিপুল পরিমাণ পানি দিয়ে বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, কুচবিহার ও মালদহ জেলার দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়। অর্থাৎ গজলডোবা বাঁধের সাহায্যে ভারত একদিকে বর্ষার মওসুমে বাংলাদেশকে বন্যার পানিতে ডুবিয়ে দেয়, অন্যদিকে শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশকে পানিবঞ্চিত করে নিজেই শুধু লাভবান হয়। একযোগে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার করে বাংলাদেশকে। বলা হচ্ছে, মূলত এজন্যই পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে ভারত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে সুকৌশলে বিরত রয়েছে।

পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মূলত ভারতের কারণে দেশে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। এবারের বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হবে বলেও আশংকা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বৃষ্টি আর উজান তথা ভারত থেকে নেমে আসা পানির ঢলে দেশের নতুন নতুন এলাকা বন্যায় তলিয়ে গেছে। গতকাল ১৯ জুনের সংবাদপত্রেও ২১টি জেলায় নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবরের সঙ্গে জানানো হয়েছে, আগামী আরও কয়েকদিন পানি বাড়বে এবং নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হবে। 

খবরে জানানো হয়েছে, এ সময়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের পাশাপাশি কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ি, শরিয়তপুর ও ফরিদপুর জেলার নি¤œাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। উল্লেখ্য, দেশের নদ-নদীগুলোর ১৬টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টে ইতিমধ্যেই বিপদ সীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ওদিকে বাড়ছে ব্রহ্মপুত্রের পানি। তাছাড়া জামালপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জেও যমুনার পানি বেড়ে চলেছে। এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।   

মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘটের পাশাপাশি পদ্মাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি কেবল বাড়ছেই না, কোনো কোনোটির পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়েও প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। আশংকা বেড়ে চলেছে ক্রমাগত বৃষ্টির কারণেও। এরই মধ্যে দেশের ১৫টি জেলায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। দেশের মধ্যাঞ্চলও বন্যাকবলিত হতে শুরু করেছে। বন্যা শুরু হয়েছে নতুন আরো ১০টি জেলায়।  

অবনতি ঘটতে থাকা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পানি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা আশংকা করছেন, বাংলাদেশকে এবার স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়তে হতে পারে। কোনো কোনো গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বন্যা ছিল ১৭ দিন। কিন্তু দিনের পর দিন ও সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হওয়ার কারণে ধারণা করা হচ্ছে, মেয়াদের দিক থেকে এবারের বন্যা ১৯৮৮, ১৯৯৮ এবং ২০০৪ সালের বন্যাকেই শুধু ছাড়িয়ে যাবে না, বিগত ৬০-৭০ বছরেরÑ এমনকি ১০০ বছরের রেকর্ডও ভেঙে ফেলতে পারে। ক্ষয়ক্ষতিও হতে পারে দীর্ঘ মেয়াদি। বিভিন্ন রিপোর্টে বিশেষ করে ঢাকার সম্ভাব্য বন্যা সম্পর্কেও গভীর আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে। কারণ, সরকারের অপরিকল্পিত এবং লোক দেখানো উন্নয়ন কর্মকান্ডের কারণে রাজধানী থেকে বৃষ্টির পানি সরে যাওয়াই ইদানীং প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় একবার কোনোভাবে বন্যার পানি ঢুকে পড়লে সে পানি সরে যেতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ আশংকার ভিত্তিতেই বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে বন্যা মোকাবেলার প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ ও তাগিদ দিয়েছেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সামগ্রিকভাবে দেশের বন্যা পরিস্থিতি এরই মধ্যে বিপদজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। করোনার চলমান মহামারির কারণে এবারের বন্যার পরিণতি খুবই মারাত্মক হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈশাখ ও জৈষ্ঠে শুধু নয়, আষাঢ়েও প্রায় প্রতিদিনই প্রবল বৃষ্টি হয়েছে এবং বৃষ্টি হতে পারে শ্রাবণেও। সে বৃষ্টির পানির সঙ্গে উজান তথা ভারত থেকেও পানি নেমে যেমন এসেছে তেমনি আরো পানি আসতেও পারে। এর ফলে আশংকা করা হচ্ছে, সারাদেশকেই ডুবিয়ে দেবে বন্যা। 

প্রসঙ্গক্রমে ভারতের পানি আগ্রাসনের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা, বৃষ্টির দিনগুলোতে ভারত গজলডোবা ও ফারাক্কাসহ ছোট-বড় সব বাঁধেরই গেট খুলে দিয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে। এর ফলেই তলিয়ে যাচ্ছে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। ওদিকে বৃষ্টির সঙ্গে বন্যাও বেড়ে চলেছে ভারতে। পানি বাড়ছে চীনেও। আর ব্রহ্মপুত্র নদ যেহেতু এ দুটি দেশের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সেহেতু এখানেও বন্যা স্বল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বাস্তবে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিও ঘটতে শুরু করেছে। আবহাওয়াবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একই কারণে সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে বন্যা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নেয়া।  

দেশপ্রেমিকরা ভারতের এই কৌশলকে পানি আগ্রাসন বলে মনে করে এর বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বলা দরকার, গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে শুধু নয়, ফারাক্কাসহ অন্য অসংখ্য বাঁধ এবং খাল ও নদীর মাধ্যমেও ভারত বাংলাদেশকে ক্ষয়ক্ষতির শিকার বানিয়ে এসেছে। প্রসঙ্গক্রমে ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা উল্লেখ করতেই হবে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। দেশপ্রেমিকদের প্রতিবাদ উপেক্ষ করে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ রাখা হয়নি। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে ভারত একদিকে শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে, অন্যদিকে বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় পানিতে পুরো দেশকে ভাসিয়ে দিয়েছে। ভারত ফারাক্কাসহ বিভিন্ন বাঁধের গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে তলিয়ে দেয়ার পরও সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘উজান’ দেশের পানিতে ‘ভাটির’ দেশ বাংলাদেশকে সব সময় নাকি ‘ডুবতেই’ হবে! অন্য দু’-একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও সেবার মন্দ শোনাননি। যেমন ৩০ বছর মেয়াদী পাবিণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পর ১৯৯৭ সালের মার্চেই ভারত যখন বাংলাদেশকে কম হিস্যা দিতে শুরু করেছিল, তখন যুক্তি দেখিয়ে তাদের মধ্যে শীর্ষ একজন বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির ওপর তো কারো হাত নেই!’ 

ভারতের ব্যাপারে এমনটাই আওয়ামী লীগ সরকারের মনোভাব। ভারতও এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। যেমন ১৯৯৮ সালের পর ২০০৪ সালের জুলাই মাসেও ভারতের ছেড়ে দেয়া পানিতে সারাদেশ তলিয়ে গিয়েছিল। বন্যাও হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী। কারণ, সেবার বৃষ্টি ও বন্যা শুরু হওয়ার পর ভারত ফারাক্কা বাঁধের ১০৫টি গেটই খুলে দিয়েছিল। ভারত সেই সাথে ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত বরাখ ও গজলডোবাসহ অন্য সকল বাঁধের গেট খুলে দিয়েও বাংলাদেশকে বিপন্ন করেছিল। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ভারত বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে। ভারতের এই স্বার্থসর্বস্বতার কারণে কোনো মৌসুমেই বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি, এখনো পাচ্ছে না। অভিন্ন ও সীমান্তবর্তী নদ-নদীর ব্যাপারেও ভারত একই নীতি ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছে। এসব নদ-নদীর কোনো একটিতেই ভারত বাংলাদেশকে বাঁধ নির্মাণ বা ড্রেজিং করতে দিচ্ছে না। ভারতের গজলডোবা বাঁধের কারণে যমুনার পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। তিস্তা, মহানন্দা, মনু, কোদলা, খোয়াই, গোমতি ও মুহুরিসহ আরো অন্তত ১৫টি নদ-নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। এভাবে ফারাক্কার পাশাপাশি ছোট-বড় বিভিন্ন বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় অভিন্ন ৫৪টির মধ্যে ৪০টি নদ-নদী শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই এখন পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। আবার পুরো বাংলাদেশকে ডুবিয়ে দিচ্ছে বর্ষার মওসুমে। বর্তমান সময়েও বাংলাদেশ ভারতের একই নীতি ও কৌশলেরই অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছে। 

অন্যদিকে বাস্তব ক্ষেত্রে সরকারের কোনো কার্যক্রমই বন্যাদুর্গত জনগণকে আশান্বিত করতে পারেনি। ঘটনাক্রমে কোনো কোনো এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা চালানো হলেও ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ত্রাণসামগ্রী লুণ্ঠনের অভিযোগও উঠছে। এমন অবস্থায় বিপদ বেড়ে চলেছে আশ্রয়হীন হয়ে পড়া লাখ লাখ মানুষের। সরকারের দিক থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে শুধু নয়, বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোতে উচু স্থান বা স্থাপনা না থাকার কারণেও সাপসহ হিংস্র বিভিন্ন প্রাণীর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পানির মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে বিপন্ন মানুষেরা। 

বন্যাদুর্গতদের সবচেয়ে বড় সমস্যা চলছে খাদ্য ও সুপেয় পানির। কারণ বন্যায় চুলা জ্বালিয়ে রান্নাবানা করা একেবারেই সম্ভব নয়। তার ওপর রয়েছে চাল-ডালসহ খাদ্য সামগ্রীর তীব্র সংকট। মুড়ি আর চিড়ার মতো শুকনো খাবার পাওয়া গেলেও কেনার মতো সাধ্য নেই অধিকাংশ মানুষের। ওদিকে রয়েছে নিরাপদ পানীয় পানির তীব্র অভাব। কুয়া, নলকূপ ও পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানি পাওয়া ও পান করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বন্যার পানিই পান করতে হচ্ছে, যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে ডায়ারিয়া ও আমাশয়ের মতো মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী বিভিন্ন্ রোগ। এসব রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। কিন্তু কোনো চিকিৎসা পাচ্ছে না তারা। হাসপাতাল দূরের কথা, উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে। অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারাও যাচ্ছে। কিন্তু সব জানা সত্ত্বেও সরকারকে এখনও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। 

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত অবিলম্বে সর্বতোভাবে তৎপর হয়ে ওঠা। ত্রাণ দেয়ার নামে নিজেদের কিছু বিশেষ এলাকায় শুধু খাদ্য ও কাপড় বিতরণ করলে চলবে না, ওষুধ বিতরণেরও পদক্ষেপ নিতে হবে। চেষ্টা চালাতে হবে নিরাপদ আশ্রয় দেয়ার জন্যও। সরকারকে একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকার ব্যাপারেও এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। সত্যি বন্যা হলে মহানগরী থেকে যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে পানি সরে যেতে পারেÑ সে জন্য ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে তৎপর করতে হবে কাল বিলম্ব না করে। 

এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সর্বব্যাপী এই ক্ষয়ক্ষতি থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়া দরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে তেমনটা আশা করা যায় না বলেই এ ব্যাপারে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মামলা দায়েরসহ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অমন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভবও। কারণ, আইনটিতে বলা আছে, উজানের দেশ ভাটির দেশকে শুষ্ক মওসুমে পানি বঞ্চিত যেমন করতে পারবে না তেমনি বর্ষা মওসুমে পারবে না বন্যায় তলিয়ে দিতেও। আন্তর্জাতিক আইনের এই সুবিধা নিয়ে স্পেন ও পাকিস্তানসহ অনেক রাষ্ট্রই বিভিন্ন সময়ে নিজেদের পাওনা ও অধিকার আদায় করেছে। সে জন্যই এখন বেশি দরকার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, সরকার যাতে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করতে বাধ্য হয় এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে দরকষাকষি করে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ