মঙ্গলবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
Online Edition

২৬ দিনের মাথায় চার দফায় ১৮৭ কর্মকর্তার পদোন্নতি  

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ২৬ দিনের মাথায় পুলিশের  এসপি (পুলিশ সুপার) থেকে ডিআইজি পর্যায়ের তিনটি পদে চার দফায় একশ’ ৮৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া, অতিরিক্ত মহা-পুলিশ পরিদর্শকের একটি পদ গতকাল বৃহস্পতিবারই অবসরজনিত কারণে শূন্য হয়েছে। চার দফায় পদোন্নতি প্রাপ্তদের সাথে বিদ্যমান শূন্যপদগুলো পূরণে পুলিশের উচ্চপর্যায়ে চারটি পদে আসছে বড় ধরনের রদবদল। শিগগিরই এই রদবদল আসছে বলে জানা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে গেছে। রদবদলের আওতায় রয়েছে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এডিশনাল আইজিপি), উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), অতিরিক্ত ডিআইজি (এডিশনাল ডিআইজি) ও পুলিশ সুপার (এসপি)। পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে স্বল্প সময়ের মধ্যে এতোবড় পদোন্নতির ঘটনা আগে ঘটেনি। এই পদোন্নতিতে শূন্য হওয়া পদগুলো পূরণেই রদবদল আসন্ন। ইতিমধ্যে পছন্দের পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট মহলে তদবির করছেন বলে সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে অতিরিক্ত আইজিপি (টেলিকম) ইব্রাহিম ফাতেমী চাকরিজীবন ইতি টানেন গতকাল বৃহস্পতিবার। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তিনি গতকালই ফুলেল শুভেচ্ছা নিয়ে বিদায় জানান পুলিশ বাহিনীকে। আর জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে চাকরি জীবনের ইতি টানবেন সিআইডি প্রধানের দায়িত্বে থাকা ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান।

জানা গেছে, পুলিশের উচ্চপর্যায়ে  বড় ধরনের পদোন্নতির পর খালি হওয়া এই পদগুলোতে কারা আসতে যাচ্ছেন তা নিয়ে আছে গুঞ্জন আর কৌতূহল। পছন্দের পদ পেতে অনেকেই এরইমধ্যে করছেন দৌড়ঝাঁপ।  আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।

গত ৫ ও ৬ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে পুলিশ সুপার-এসপি পদে পদোন্নতি দেয়া হয় ৩৬ কর্মকর্তাকে। এছাড়া ৩১ মে ও ৩ জুন ১১৯ পুলিশ সুপারকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। আর ১২ মে অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার ৩২ কর্মকর্তাকে ডিআইজি করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি পদে পদোন্নতি প্রাপ্তদের পদায়ন করা হবে। এছাড়া পদোন্নতির পর দীর্ঘদিন পদায়ন না হওয়া ৩৮ পুলিশ সুপারের কপালও এবার খুলতে যাচ্ছে। তারাও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

গত মে এবং জুন মাসে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত স্বপদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। এ নিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রণালয়। এরইমধ্যে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের র‌্যাংক ব্যাচও পরানো হয়েছে। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যারা যোগ্য তারাই ভালো জায়গায় পদোন্নতি পাবেন। তদবির করে কেউ পছন্দের পদ পাবেন না তা নিশ্চিত করে বলতে পারি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যে তালিকাটি আসে তা পর্যালোচনা করেই পোস্টিং (পদায়ন) দেয়া হয় পুলিশ কর্মকর্তাদের।’

পুলিশের উচ্চপর্যায়ে রদবদলের জন্য ইতিমধ্যে একটি তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। তালিকাটি এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আসার পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, পছন্দের পদ পেতে অনেকই দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। পুলিশের যেকোনো দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে নানাভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও চাচ্ছেন দুর্নীতি জিরো টলারেন্সে নিয়ে আনতে।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, অনেক পুলিশ কর্মকর্তা আছেন যারা দীর্ঘদিন ধরেই এক জায়গায় বছরের পর বছর ধরে আছেন। রাজনৈতিকসহ নানা কারণে তাদের সরানো যাচ্ছে না। যার ফলে তারা দুর্নীতিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তাই সামনে বড় ধরনের রদবদল আসছে। যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের সরানো হচ্ছে। আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চাচ্ছেন, সৎ পুলিশ কর্মকর্তারা ভালো স্থানে থেকে জনগণের সেবা করুক এবং জনবান্ধব পুলিশ গড়ে উঠুক। পুলিশের বিরুদ্ধে যে বদনাম আছে তা শেষ হয়ে যাক।

পুলিশ সূত্র জানায়, ৬৪ জেলার পুুলিশ সুপারদের মধ্যে ২৫ জনকে বদলি করা হচ্ছে। দুটি রেঞ্জের ডিআইজিও পরিবর্তন হচ্ছেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারও পরিবর্তন হচ্ছেন। গাজীপুরের পুলিশ কমিশনার খন্দকার লুৎফুল কবিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে আনা হচ্ছে। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে গাজীপুর মেট্রোপলিটনের পুলিশ কমিশনার করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান এ কে এম হাফিজ আক্তারকে সিটিটিসির প্রধান করা হচ্ছে। ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদকে ডিবির প্রধান করা হচ্ছে। খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি ড. খ. মহিদ উদ্দিনকে বদলি করা হচ্ছে। তার স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন সদ্য পদোন্নতি পাওয়া ডিআইজি আনিসুর রহমান ও মোল্লা নজরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন।

সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীরকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে বদলি করা হচ্ছে। সিএমপি কমিশনার হতে চেষ্টা করছেন সদ্য পদোন্নতি পাওয়া ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন। চট্টগ্রাম রেঞ্জে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বিশেষ শাখার (এসবি) ডিআইজি আমেনা বেগমসহ কয়েকজন। তবে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেনকে এই মুহূর্তে সরানো নাও হতে পারে। একজন পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা হিসেবে তার সুনাম রয়েছে পুলিশে।

ময়মনসিংহ রেঞ্জে ডিআইজিও পরিবর্তন হচ্ছেন। সদ্য পদোন্নতি পাওয়া শাহ আবিদ হোসেনকে ময়মনসিংহের রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। হাইওয়ে পুুলিশে চারটি ডিআইজি ও আটটি অতিরিক্ত ডিআইজির পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। হাইওয়েতেও যেতে কেউ কেউ তদবির করছেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনেও (পিবি আই) একজন ডিআইজি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। সারদা পুলিশ সদর দপ্তরেও একটি ডিআইজির পদ সৃষ্টি করা হয়। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটিতে ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজির একটি করে পদ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও এসবিতেও ডিআইজির কয়েকটি পদ খালি আছে। এ দুটি ইউনিটিতে যেতে কেউ কেউ তদবির করছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদ্য পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি হওয়ায় উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার, রমনা বিভাগের ডিসি মো. সাজ্জাদুর রহমান, ডিএমপি সদর দপ্তরের ডিসি শ্যামল কুমার মুখার্জি, মিরপুর বিভাগের ডিসি আ স ম মাহাতাব উদ্দিন, ঢাকার এসপি মো. মারুফ হোসেন সরদার, নড়াইলের এসপি প্রবীর কুমার রায়, ঝিনাইদহের এসপি মুনতাসিরুল ইসলাম, কুড়িগ্রামের এসপি সৈয়দা জান্নাত আরা, কুমিল্লা, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী, শরীয়তপুর, লালমনিরহাট, নাটোর, বরিশাল, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুরসহ অন্তত ২৫টি জেলার এসপিকে পদায়ন করা হচ্ছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ওইসব জেলাগুলোতে যেতে অনেকেই তদবির করছেন। 

আর বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে র‌্যাবে পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হবে। তাছাড়া সব রেঞ্জের শীর্ষ পদে পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পাওয়া অনেকে ডিএমপির উপ-কমিশনার কিংবা জেলা পুলিশের দায়িত্ব ছাড়াও সিআইডি, পিবি আইসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পাবেন।

সদ্য ডিআইজি পদে পদোন্নতি পাওয়া ১৮তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপে জানতে পেরেছে, পদায়নের ব্যাপারে তাদের মধ্যে তেমন কোনো আলোচনা নেই। মন্ত্রী অসুস্থ থাকায় কাকে কোথায় দায়িত্ব দেওয়া হবে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। যদিও রদবদলটা শিগগিরই হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘শুনেছি এই মাসেই পদায়ন করা হবে। তবে সেটা পর্যায়ক্রমে। একবারে এতোগুলো পদে সবাইকে পদায়ন করা সম্ভব হবে না।’

পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পাওয়া বেশ কজন কর্মকর্তা বলছেন, তারা নতুন র‌্যাংক ব্যাচ পরেছেন। আর কবে নাগাদ পদায়ন হবে সেটা এখনো বলতে পারছেন না। তবে তারাও শুনেছেন এই মাসেই অনেককে পদায়ন করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, গুরুত্ব বিবেচনা করে কাকে কোন দায়িত্ব দেয়া হবে তা নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছে। এত দিন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে যারা আভিযানিক কর্মদক্ষতা দেখিয়েছেন তাদের পদায়ন ভালো কোথাও হবে, সে বিষয়ে মূল্যায়ন চলছে।

ডিএমপি ছাড়াও একাধিক কর্মকতা বিভিন্ন মেট্রোপলিটনে দায়িত্ব পাবেন। অনেককে রেঞ্জ অফিস, পুলিশ সদরদপ্তর, সিআইডি, পিবি আই সহ বিভিন্ন ইউনিটে পদায়ন করা হবে, সেটা নিয়েও পর্যালোচনা চলছে। তবে পদোন্নতি পাওয়া সব কর্মকর্তাই যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাবেন এমনটা নাও হতে পারে। এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি বসে সিদ্ধান্ত নেবেন।

সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত বিদ্যমান বিভিন্ন ইউনিটের কাঠামো হতে বিভিন্ন পদবির ক্যাডার পদ বিলুপ্ত করে ঊর্ধ্বতন ধাপে সমসংখ্যক ক্যাডার পদ সৃষ্টি করতে হবে। তার মধ্যে এসপির ২০টি ও এএসপির ২০৮টিসহ ২২৮টি পদ বিলুপ্ত করে অতিরিক্ত আইজিপির ৪টি, ডিআইজির ১৮টি, অতিরিক্ত ডিআইজির ১০০টি, এসপির ২০টি ও অতিরিক্ত এসপির ৮৬টি পদ সৃষ্টি করার প্রস্তাব করা হয়। ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে ২০টি এসপি ও ২০৮টি এএসপি পদ বিলুপ্তি করে চারটি অ্যাডিশনাল আইজিপি (গ্রেড-২), ১৮টি ডিআইজি (গ্রেড-৩), ১০০টি অতিরিক্ত ডিআইজি (গ্রেড-৪), ২০টি এসপি (গ্রেড-৫) এবং ৮৬টি অতিরিক্ত এসপির (গ্রেড-৬) পদ সৃষ্টি করতে বলা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ