রবিবার ২৬ জুন ২০২২
Online Edition

সারাদেশে কালবৈশাখী ঝড়ে ৫ জনের মৃত্যু

গতকাল শনিবার সকালের কালবৈশাখী ঝড়ে রাজধানীর রমনা এলাকার একটি গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে-সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখীতে অন্তত ৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছে আরও কয়েকজন। এ ছাড়া ঝড় এবং ভারী বৃষ্টির কারণে বাড়ি-ঘর ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় গাছ উপড়ে রাস্তায় পড়ে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ ছিল। কিছু কিছু এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আরও কয়েকদিন এই অবস্থা বিরাজমান থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে চারটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের সঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছে। 

আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম সংগ্রামকে জানান, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার অঞ্চলসমূহের ওপর দিয়ে পশ্চিম/উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কি. মি. বেগে বৃষ্টি/বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তাই এসব এলাকার নদীবন্দরসমূহকে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারী সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। লঘুচাপের বর্ধিতাংশ বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। ফলে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা/ঝড়ো হাওয়ার সাথে বিজলী চমকানোসহ প্রবল বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরণের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। তাপ প্রবাহের পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলাসমূহের উপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা প্রশমিত হতে পারে। এছাড়া সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা (১-২)ডিগ্রী সে. হ্রাস পেতে পারে ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। সেই সঙ্গে ৭২ ঘন্টার আবহাওয়ার অবস্থা (৩ দিন) বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বগুড়ায় কালবৈশাখী ঝড়ে দেয়াল ও গাছ চাপায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। কাহালু উপজেলার মাছপাড়া ও শাজাহানপুরের কুষ্টিয়ায় শনিবার ভোরে এ ঘটনা ঘটে। মৃতরা হলেন মাছপাড়ার ৪৫ বছর বয়সী মো. শাহিন ও কুষ্টিয়ার ৫১ বছর বয়সী আব্দুল হালিম। স্থানীয়দের বরাতে কাহালু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমবার হোসেন জানান, শনিবার ভোর ৪টার দিকে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। সে সময় একটি গাছ উপড়ে শাহিনের বাড়ির ওপর পড়ে। গাছের ভারে মাটির দেয়াল ধসে শাহিনের মৃত্যু হয়।

শাজাহানপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ঝড়ে একটি গাছ ভেঙে হালিমের বাড়ির ওপর পড়ে। তিনি ছোট ডালগুলো কেটে সরাচ্ছিলেন। সে সময় গাছের মূল কা- তার ওপর পড়লে হালিম গুরুতর আহত হয়।

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। 

বগুড়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষক সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া জানান, ভোর ৪টা থেকে ৪টা ৪ মিনিট পর্যন্ত বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ৮৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এটি এই মৌসুমের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বাতাসের গতিবেগ। বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮ মিলিমিটার। ঝড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকার বাড়ি-ঘর ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিঘœ ঘটেছে বিদ্যুৎ সরবরাহে।

ঝিনাইদহে শনিবার সকাল ৬টার দিকে ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। ১০ মিনিটের মতো ঝড়-বৃষ্টিতে তিন উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সকালে শৈলকুপা উপজেলার কুলচারা গ্রামে বজ্রপাতসহ হালকা বৃষ্টি শুরু হয়। সে সময় বাড়ির পাশের মাঠে বেগুন তুলতে যান গোলাম নবী ও রুপসী খাতুন দম্পতি। ঝড় শেষে স্থানীয়রা তাদের অচেতন অবস্থায় মাঠে পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক রুপসীকে মৃত ঘোষণা করেন। তার স্বামীকে চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জোবাইদা ইসলাম বলেন, ‘বজ্রপাতের হিস্ট্রি নিয়ে দু’জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজনকে মৃত অবস্থায় পেয়েছি।’

সদর উপজেলার ডেফলবাড়িয়া গ্রামে বজ্রপাতে আশরাফুল ইসলাম নামের এক কৃষকের দুটি মহিষের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ে আম, লিচু, কলা, পানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতিতে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। সহযোগিতার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হবে। কালীগঞ্জ উপজেলার এনায়েতপুত গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘১০ মিনিটের ঝড়ে আমাগের সব শ্যাষ করে দিয়ে গেছে। গাছপালা ভাঙ্গে গেছে। কারেন্টের পোল ভাঙ্গে গেছে। গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ ছিল। আমাগের ম্যালা ক্ষতি হয়েছে।’

একই উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘সকালে হঠাৎ করে খুব ঝড় শুরু হয়। আম্পানের সময় যে ঝড় হয়েছিল আজকে তেমন ঝড় হয়েছে। বাড়ি-ঘর ভেঙে গেছে। আম, লিচু, কলার বাগানের খুব ক্ষতি হয়েছে।’ কালীগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রথীন্দ্রনাথ বসাক জানান, ঝড়ে বিদ্যুতের ২২টি খুঁটি ভেঙে গেছে। সেই সঙ্গে ৩৩ কেভি লাইনের ওপর গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে গেছে। এ কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় মেরামতের কাজ চলছে। কতক্ষণ লাগবে বলতে পারছি না। তবে বিকেলের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।’

ক্সবাজারের চকরিয়ায় ঝড়ের সময় গাছচাপা পড়ে এক ইজিবাইক চালকের মৃত্যু হয়েছে। ৪০ বছর বয়সী মৃত আব্দুস শুক্কুরের বাড়ি চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের ২ নম্বর শান্তিনগর এলাকায়। হারবাং পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক আজহারুল ইসলাম জানান, শুক্কুর তার ইজিবাইকের ব্যাটারির কানেকশন ঠিক করছিলেন। সে সময় ঝড় শুরু হলে তিনি বাড়ি যাওয়ার জন্য ইজিবাইক থেকে নামেন। সে সময় একটি গাছ তার ওপর পড়লে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়।

নওগাঁয় কালবৈশাখী ঝড়ে আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ অঞ্চলের বেশিরভাগ আম এখনও অপরিপক্ক এবং মাটিতে পড়ে ফেটে গেছে। ছোট ও মাঝারি সাইজের এসব আম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ২৯ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৮৪৫ টন। শুক্রবার রাতের ঝড়ে প্রায় ৭ হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমির কাঁচা আম ঝড়ে পড়েছে।

নওগাঁর ১১ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় পোরশা ও সাপাহারে। সাপাহার উপজেলার মানিকুড়ি এলাকায় শনিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, ঝড়ে পড়া আম কুড়িয়ে এনে এক জায়গায় স্তূপ করে রাখছেন শ্রমিকরা। উপজেলার কলমুডাঙ্গা গ্রামের আম চাষি মোস্তাফিজুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ৮০ বিঘা জায়গার ওপর দুইটা আমের বাগান আছে। শুক্রবার রাতের ঝড়ে দুই বাগান মিলিয়ে প্রায় ১০০ মণ আম ঝরে পড়েছে। এটা মোট আমের চার ভাগের এক ভাগ।

‘ঝরে পড়া কাঁচা আম দুই টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ পরিপক্ক অবস্থায় বাজারে তুললে কমপক্ষে ৫০ টাকা করে প্রতি কেজি বিক্রি হতো।’পোরশা উপজেলার নিতপুর এলাকার আম চাষি তোজাম্মেল হোসেন জানান, তার ১২০ বিঘার বাগানে ৮০ শতাংশের বেশি আম্রপালি জাতের গাছ। গাছ ছোট হওয়ায় ঝড়ে এসব গাছের আম কম ঝরেছে। তবে আশ্বিনা, নাক ফজলি ও ল্যাংড়া জাতের বড় গাছের ২০ শতাংশ আম পড়ে নষ্ট হয়েছে।

বদলগাছী আবহাওয়া অফিস জানায়, শুক্রবার রাত ১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। বাতাসের গতিবেগ ছিল ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার। বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে ৪৩ মিলিমিটার। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামসুল ওয়াদুদ জানান, শুক্রবার রাতের কালবৈশাখী ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর, মান্দা ও ধামইরহাট।

পতœীতলায় ২ হাজার ২৫০ হেক্টর, সাপাহারে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর, পোরশা ১ হাজার ৫০ হেক্টর, ধামইরহাটে ৪৭৫ হেক্টর ও নিয়ামতপুরে ৪৮০ হেক্টর জমির কাঁচা আম ঝরে গেছে। বাকি ছয় উপজেলা মিলিয়ে ঝরেছে ১০০ হেক্টর জমির আম। এ ছাড়া নওগাঁয় ৫০ হেক্টর জমির কলা ও ৫০ হেক্টর জমির বিভিন্ন শাকসবজিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উড়ে গেছে বেশ কিছু ঘরের চাল। গাছের ডাল পড়ে তার ছিঁড়ে অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় আলমডাঙ্গা-হালসা লাইনের ওপর ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে গাছ ভেঙে পড়ে খুলনার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে গাছ অপসারণের পর ট্রেন চলাচল শুরু হয়। আলমডাঙ্গায় শনিবার ভোর ৫টার দিকে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। আধ ঘণ্টার ঝড়ে উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামাদুল হকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝড় চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা, মেহেরপুরের গাংনী হয়ে কুষ্টিয়ার দিকে আঘাত হানে। তবে ওই সময় বাতাসের গতিবেগ মাপা হিসাব করা যায়নি। বৃষ্টির পরিমাণ রেকর্ড করা হয়েছে ৭ মিলিমিটার। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কালিদাসপুর গ্রামের আলী হোসেন বলেন, ‘আমাদের গ্রামসহ আশপাশের অনেক গ্রামের আধা-পাকা ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। বাতাসে উড়ে গেছে ঘরের চাল। বড় বড় গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে রাস্তায় পড়েছে। এতে যান চলাচল হয়ে যায়।’

আলমডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সাব অফিসার আক্কাস আলী জানান, শ্রীরামপুর ও জগন্নাথপুর এলাকায় চুয়াডাঙ্গা-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কে গাছ ভেঙে সকাল থেকে যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে গাছ সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) আলমডাঙ্গার আবাসিক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেছে, খুঁটি উপড়ে পড়েছে বা ভেঙে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় বেশি ক্ষতি হয়েছে।

‘ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঝড় থামার পর থেকে লাইন মেরামতের কাজ করা হচ্ছে। মেইন লাইন চালু হয়ে গেছে। তিনটা ফিডারের মধ্যে এখন শুধু বাজারের ফিডার বন্ধ আছে। খুব শিগগিরই এটাও চালু হবে।’ আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রনি আলম নূর (ইউএনও) জানান, আলমডাঙ্গা উপজেলার কালিদাসপুর, হারদি ও ডাউকি ইউনিয়নে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাছের ডাল পড়ে প্রায় দেড়শ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কালিদাসপুর ইউনিয়নে ৫ থেকে ৭ জন সামান্য আহত হয়েছেন। তারা স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

ইউএনও বলেন, ‘জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান ও আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের নামের তালিকা করা হচ্ছে। এই তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হবে। উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের মাধ্যমেও ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করা হবে।’

খাগড়াছড়িতে ঝড়ো হাওয়ায় শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে গাছ ভেঙে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পাঁচ ঘণ্টা পর সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কে গাছ উপড়ে পড়ে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ফলের বাগান ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ বিভাগের খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাগত সরকার জানান, ঝড়ো হাওয়ায় ৩৩ কেভি ও ১১ কেভি লাইনে গাছ ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘিœত হয়।

যশোর বিমানবন্দরের আবহাওয়া অফিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৬টা ৫ মিনিট থেকে প্রায় ১৫ মিনিট কালবৈশাখী ঝড় হয়। বৃষ্টির পরিমাণ রেকর্ড করা হয়েছে ১০ মিলিমিটার। এই ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদর ও বাঘারপাড়া উপজেলা। অনেক বাড়ির চাল উড়ে গেছে, গাছ ভেঙে পড়েছে। ক্ষতগ্রস্ত হয়েছে মৌসুমি ফল ও ফসল।

সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের নাটুয়াপাড়া গ্রামের তানিয়া বেগম বলেন, ‘সকালে ঝড় শুরু হলে অনেক গাছ ভেঙে পড়ে। আমাদের বাড়ির বড় একটি শিশু গাছ ভেঙে আমার গরু মারা গেছে। টিনের বাড়িগুলোর চাল উড়ে গেছে।’ একই এলাকার হোসেন উদ্দিন জানান, তার বাড়িতে গাছ ভেঙে পড়ায় তিনি আহত হয়েছেন। এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিকী বলেন, ‘সদর উপজেলায় আমাদের ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৭টি গ্রামের মধ্যে ১২টি গ্রামের চিরচেনা পরিবেশ বদলে গেছে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ল-ভ- হয়ে গেছে। ইউপি সদস্যরা কয়েকজন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।’

মেহেরপুরে কালবৈশাখী ঝড়ে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গাংনী উপজেলার বামন্দী, তেতুলবাড়িয়া, মঠমোড়া ও গাজীপুর ইউনিয়ন। গাংনীতে শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শুরু হয় ঝড়। প্রায় ১০ মিনিটের ঝড়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট শিলাবৃষ্টিও হয়। জায়গায় জায়গায় উপড়ে পড়ে গাছ, ছিঁড়ে যায় বৈদ্যুতিক তার।  সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হোগলবাড়িয়া, বাওট ও আকুবপুর গ্রাম। উড়ে গেছে কয়েকটি বাড়ির টিনের চাল। আমসহ বিভিন্ন ফল ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমচাষি মো. কুতুব বলেন, ‘ভোরে হঠাৎ ১০ মিনিটের ঝড়ে আমার বাগানের অনেক আম পড়ে গেছে। আর ১৫ থেকে ২০ দিন পরেই আম পাকা শুরু হতো। এই আমগুলো এখন নামমাত্র দামে বিক্রি করতে হবে।’ সড়কে গাছ পড়ে ভোর থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা যানবাহন চলাচলও বন্ধ ছিল। বাসচালক মো. গোলাম বলেন, ‘আমি ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে আকুবপুরে ঢুকতেই ঝড় শুরু হয়। রাস্তায় গাছ ভেঙে পড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে ছিলাম। এরপর গাছ সরানো হলে জেলা শহরে আসি।’ পল্লীবিদ্যুতের বামন্দী শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক হানিফ রেজা বলেন, ‘আমার অফিসের আওতাধীন প্রায় ১২টা পোল ভেঙে চার ইউনিয়ন বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।’

ফসলের ক্ষতির বিষয়ে জেলা কৃষি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক শামসুল হক জানান, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনই জানা সম্ভব হয়নি।

রাজশাহী ব্যুরো: রাজশাহীর বাঘায় কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি  হয়েছে। উপজেলার বাউসা ও আড়ানী এলাকায় এ ঝড়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। শনিবার ভোর ৪টার দিকে কালবৈশাখী ঝড় এই তান্ডব চালায়। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙ্গে এবং তার ছিড়ে পড়ে এই এলাকা প্রায় ১০/১২ ঘন্টা বিদ্যুতবিহীন ছিল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোর ৪টার দিকে পশ্চিম থেকে উপজেলার আড়ানী ও বাউসা ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রচন্ড গতিতে বয়ে যায় কালবৈশাখী ঝড়। এই ঝড়ের তান্ডবে আম, লিচু, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই ঝড়ে বাউসা ইউনিয়নের বাউসা কাচারীপাড়া ও অমরপুর গ্রামে কয়েকটি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙ্গে গেছে এবং প্রায় ২০টি স্থানে তার ছিড়ে পড়েছে।

বাঘা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএম সুমির কুমার দত্ত জানান, ঝড়ে কয়েকটি বিদ্যুতের খুটি ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া প্রায় ২০টি স্থানে বিদ্যুতের তার ছিড়ে যাওয়ার কারনে বিদ্যুৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান জানান, ক্ষতির পরিমাণ এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। আমরা সরেজমিন গিয়ে প্রতিবেদন করবো । তবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

দিনাজপুর অফিস: দিনাজপুরে বজ্রপাতে একজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ৭নং আউলিয়া পুকুর ইউনিয়নের আতারবাজার কাকপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আলতাফ হোসেন ওই এলাকার খলিল উদ্দীনের পুত্র।

স্থানীয়রা জানান, দুপুরে বৃষ্টি শুরু হলে আলতাফ হোসেন বাড়ির পাশের মাঠে গরু আনতে যায়। ওই সময় বজ্রপাতে তিনি আহত হন। পরে স্থানীয়রা দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিরিরবন্দর থানার ওসি বজলুর রশিদ জানান, বজ্রপাতে নিহতের খবরে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।

কুমারখালী সংবাদদাতা :  কুষ্টিয়ায় ঝড়ের তান্ডবে ঘরবাড়িসহ মৌসুমি ফলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোরে জেলাজুড়ে বয়ে যাওয়া এই তান্ডবে দোকান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরের চালা উড়ে যায়। উপড়ে গেছে অনেক গাছ। গাছের ডাল পড়ে বেশ কিছু এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

 জেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন উপজেলায় শত শত গাছপালা ভেঙ্গে রাস্তায় পড়ে আছে। শত শত হেক্টর জমির ধানসহ আম, কাঁঠাল, লিচু ও বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়াও জেলার শতাধিক গ্রামে ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে এবং গাছের ডাল পড়ে তার ছিঁড়ে অনেক স্থানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে ইতোমধ্যে কাজ  করছে কর্মীরা।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আম ও লিচু বাগানের মালিক মন্টু ব্যাপারী বলেন, আমার বাগানের প্রায় সব লিচু ও আম ঝড়ে পড়ে গেছে। কিছু কিছু লিচু পাকা শুরু করেছে আর এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে আম পাকা শুরু হতো। কিন্তু এই ঝড়ের কারণে অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।

উপজেলার ছাতিয়ান এলকার লাবু বলেন, ঝড়ে তার দু’টি টিনের ঘরে চালা উড়ে গেছে। অনেক ধারদেনা করে ঘর দুটো বানিয়েছিলাম। এখন আবার নতুন করে আমার পক্ষে এসব ঘর ঠিক করা খুবই কষ্ট হবে। ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচলক জানে আলম জানান, ঝড়ের কারণে সড়কের দু’পাশে শত শত গাছের ডালপালা ভেঙে ও উপড়ে সড়কে পড়েছে। কিছু কিছু জায়গায় এলাকাবাসীর সহায়তায় আবার কোথায় কোথাও ফায়ার সার্ভিসের টিম গাছগুলো সড়ক থেকে সরাতে কাজ করছে।

কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) মোঃ মোকসেমুল হাকিম বলেন, ঝড়ে জেলাব্যাপী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে এবং গাছের ডাল পড়ে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে অনেক স্থানের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ করছি।

কুমারখালী আবহাওয়া অফিসের অফিসার ইনচার্জ মামুন আর রশিদ বলেন, কুষ্টিয়া জেলায় সাত কেটিএফ ঝড় ও ২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই ঝড়-বৃষ্টি প্রায় ১৫ মিনিট ধরে হয়েছে। তবে তুলনামূলক কুমারখালী উপজেলায় ঝড়ের মাত্রা অন্য উপজেলা থেকে কম হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সুশান্ত কুমার প্রমানিক বলেন, ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিক নির্ণয় করা যায়নি। ক্ষয়ক্ষতিরপ রিমাণ নির্ণয় করতে কৃষি বিভাগের লোকজন মাঠে কাজ করছে। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ