সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

নগর ভবন ঘেরাও ॥ শিক্ষকরা এসে ‘নিয়ে গেলেন’ ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের

* তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন ॥ জানাযায় মেয়রের অংশগ্রহণ
স্টাফ রিপোর্টার : বাবার কাছে কলেজে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে আর  ফেরা হল না  নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের। গতকাল বুধবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান ১৭ বছরের এই তরুণ। নটর ডেম কলেজে তিনি উচ্চ মাধ্যমিকে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। কামরাঙ্গীরচর ঝাউলাহাটিতে নিজ বাড়িতে তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে নাঈম ছিলেন ছোট।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া জানান, কয়েকজন পথচারী এবং নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা নাঈমকে হাসপাতালে আনলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দুর্ঘটনার পর নাঈমকে যারা হাসপাতালে নিয়ে যান, তাদের একজন আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, হল মার্কেট মোড়ে বায়তুল মোকাররমগামী সিটি করপোরেশনের একটি ময়লার ট্রাক মোড় ঘুরেই নাঈমকে চাপা দেয়।
নাঈমের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে আসেন বাবা শাহ আলম। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার থাইকা বিদায় নিয়া আইলো কলেজে যাইব, দুনিয়া থাইকাই চইলা গেল, সোনার টুকরা পোলা আমার।” শাহ আলম নীলক্ষেতে বইয়ের ব্যবসা করেন। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার কাজিরখিল গ্রামে।
পল্টন থানার ওসি মো. সালাউদ্দিন বলেন, “রাস্তা পার হওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একটি ময়লার গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন নাঈম।” এ ঘটনায় সিটি করপোরেশনের ওই গাড়ি চালককে আটক করে গাড়িটি জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ
নাঈম হাসান নিহত হওয়ার পর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে নামে ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান ১৭ বছরের এই তরুণ। নাঈমের মৃত্যুর খবর কলেজে পৌঁছলে শতাধিক শিক্ষার্থী গুলিস্তান এসে সড়ক অবরোধ করে।
শিক্ষার্থীরা দায়ী চালকের শাস্তির দাবি তোলেন। তারা স্লোগান দিচ্ছিলেন- ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আমার ভাই কবরে-তুই কেন বাইরে’। বিকাল অবধি শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে ছিলো। সেখানে পুলিশও ছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আবুল হাসান বলেন, “শিক্ষার্থীদের বোঝানো হয়েছে।”তাদের বক্তব্য শোনা হয়েছে।
শিক্ষকরা এসে ‘নিয়ে গেলেন’ ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের
সহপাঠি নিহত হওয়ার পর ঢাকার গুলিস্তানে সড়ক অবরোধে থাকা নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষকরা এসে নিয়ে গেছেন। বিকাল ৫টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সড়ক থেকে সরে যেতে শুরু করলে গুলিস্তানে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর আবার যানবাহন চলাচল শুরু হয়। শিক্ষকদের কথায় অবরোধ তুলে নেওয়ার আগে তারা নিহত সহপাঠী নাঈম হাসানের পরিবারের ভরণপোষণের দাবি জানান।
সড়ক থেকে চলে যাওয়ার আগে নটর ডেমের আন্দোলনকারী ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একজন মুকিত বলেন, “ফাদার আমাদের জানিয়েছেন, মেয়র আশ্বাস দিয়েছেন। তাই আজকের মত সড়ক ছেড়ে চলে গেলাম।“
ঢাকা মহানগর মতিঝিল জোনের পুলিশ পরিদর্শক (ট্রাফিক) মশিউর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা চলে যাওয়ার পর সড়ক দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়েছে।
বিকাল ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক ছাড়ার আগে নাঈমের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব চান সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে। এর আগে তারা বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে নগর ভবন ঘেরাও করতে গেলে কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা নগর ভবনের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। ছাত্ররা এ সময় বিভিন্ন স্লোগান দেয়। প্রায় ১৫ মিনিট পর তারা নগর ভবন এলাকা ত্যাগ করে মিছিল সহকারে।
এর আগে নটরডেম কলেজের ফাদার এন্থনি সুশান্ত গোমেজ, পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক ভিনসেন্ট তিতাস রোজারিও ও শহিদুল হাসান পাঠান ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তারা আশ্বস্ত করে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যান।
মুকিত নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, নাঈম বড় হয়ে তার পরিবারকে ভরণপোষণ করতো কিন্তু এভাবে তাকে হত্যা করা হল। নাঈমের কী দোষ ছিল। দোষ হল সড়কের। “আমাদের অনেক দাবি যা আগেও শিক্ষার্থীরা করে আসছে। কিন্তু কিছু হচ্ছে কী? তবে এখন আমরা চাই সিটি করপোরেশন নাঈমের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিক ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।“
এর আগে ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নুর তাপস বেলা আড়াইটায় তাঁর দফতরে জরুরী এক সভায় মিলিত হয়ে দুর্ঘটনার ঘটনায় দু:খ প্রকাশ করে পরিবহন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, আমরা সেবার পরিবর্তে এহেন কাজ করলে নগরবাসীর চাওয়া পাওয়ার পূরণ ঘটবে কিভাবে। এ সময় উপস্থিত কর্মকর্তারাও সড়কে ময়লার গাড়ির এমন ঘটনার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার আনুরোধ জানান। মেয়র এ সময় বলেন, তাঁর আমলে এ পর্যন্ত তিনটি ঘটনা ঘটেছে, যা সত্যিই বেদনা দায়ক, দু:খজনক। জরুরী সভাটি ডাকা হয়েছিল ডিএসসিসির বিভাগীয় প্রধানদের নিয়ে। যাতে উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে মেয়র দিক নির্দেশনা প্রদান করেন বলে সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তারা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। সন্ধ্যার দিকে মেয়র ডিএসসিসির বর্জ্য বিভাগের উর্ধ্বতনদের সাথে আরও একটি সভা করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কেও দিক নির্দেশনা প্রদান করেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সুত্রে জানা গেছে।
এদিকে, ডিএসসিসির গণসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, নাঈমের মৃত্যুর ঘটনাকে অনাকাংখিত উল্লেখ করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর সিতওয়াত নাঈমকে আহবায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছেন, মহা ব্যবস্থাপক (পরিবহন) বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস ও তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমান পবন।
রাতে ডিএসসিসি মেয়র শেখ তাপস কামরাঙ্গীরচরে অনুষ্ঠিত নাঈমের জানাজায় অংশ নেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও আশ্বাস দেন। পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা প্রদান করেন মেয়র।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ