সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

দেশের অর্থনীতিতে করোনার ক্ষত

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি কমাতে ঋণ পরিশোধের জন্য নানা রকম সুবিধা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও কমানো যাচ্ছে না খেলাপি ঋণ। উল্টো বেড়েই চলেছে খেলাপির পরিমাণ। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে করোনার ক্ষত ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, যা আগামী বছরে গিয়ে আরও প্রকট হয়ে উঠবে। পাশাপাশি প্রণোদনা ঋণ ব্যবহারের চিত্রও প্রতিফলিত হবে খেলাপি ঋণের সার্বিক তথ্যে।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ১৫০ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সে হিসেবে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।
খেলাপিরা বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করে পার পেয়ে যাচ্ছেন। মামলা করে ঝুলিয়ে রাখেন। বেশি সমস্যা হলে হাইকোর্টে গিয়ে রিট করেন। ঋণ খেলাপি আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় গত বছর কেউ কোনো টাকা পরিশোধ না করলেও তাকে খেলাপি দেখাতে পারেনি ব্যাংক। এ বছর নতুন করে আগের মতো সব সুযোগ দেয়া হয়নি। তবে অনেক ক্ষেত্রে ঢালাও সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন শিথিলতার আওতায় চলতি বছর একজন গ্রাহকের যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করার কথা, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তার ২৫ শতাংশ পরিশোধ করলেও তাকে আর খেলাপি করা যাবে না। এরপরও খেলাপি ঋণ বাড়ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জা মো. আজিজুল ইসলাম জানান, খেলাপি হলে কোনো শাস্তি নেই বরং পুরস্কৃত হয়, যার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। খেলাপিরা বারবার ঋণ পরিশোধের সময় পান, পুনঃতফসিলের সুযোগ পান। মামলা করে ঝুলিয়ে রাখেন। বেশি সমস্যা হলে হাইকোর্টে গিয়ে রিট করেন। এভাবেই বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করে পার পেয়ে যাচ্ছে তারা। এসব দীর্ঘসূত্রতার কারণে খেলাপি হওয়া আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, যে কারণে মন্দ ঋণ বাড়ছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয় এক সঙ্গে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিতে হবে। পাশাপাশি যেসব ব্যাংকের ঋণ খেলাপি বেশি তাদের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করে ২ লাখ ১৯ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ২০ দশমিক ০৭ শতাংশ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ছিল ৪২ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। ওই সময় বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা।  বেসরকারি ব্যাংকগুলো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করেছে ৯ লাখ ২৮ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫০ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে যা ছিল ৪০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
আলোচিত সময়ে বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ১২ শতাংশ। বিদেশী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ হয় ৬৫ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। এ অংক তাদের বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। তারা বিতরণ করেছে মোট ৩২ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা।
খেলাপি বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই। এ নিয়ে তারা উদ্বিগ্নও নয়। ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এক হয়ে গেছে। তারা খেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এছাড়া শীর্ষ ঋণ খেলাপিরা সবাই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। সরকারেরও খেলাপি কমানোর বিষয়ে তেমন সদিচ্ছা নেই। যার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এখন খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে মনে করেন সাবেক এ গভর্নর।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, কোভিডের কারণে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপি একাকার হয়ে গেছে। এখন তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করার সময় এসেছে। এখন যে পরিমাণ দেখা যাচ্ছে এটা খেলাপির প্রকৃত চিত্র নয়। ছাড় ও সুবিধা তুলে নিলে খেলাপির অংক আরও বেড়ে যাবে।
ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক খাতে যেভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে তা বাড়েনি। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে একরকম ছাড় দিয়ে রেখেছে। ফলে ঋণ শোধ না করেও অনেকে খেলাপির নাম ও খেলাপ হওয়া ঋণের তথ্য তালিকায় যুক্ত হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকাই ছিল খেলাপি। সেই হিসাবে ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ খেলাপি ছিল, যা গত জুনে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। আর সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।
করোনাভাইরাসের কারণে পুরো ২০২০ সাল জুড়ে ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নীতি-সুবিধা দেয়ার ফলে ওই সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও কেউ খেলাপি হননি। এখন এই বিশেষ সুবিধা বহাল না রাখলেও ঋণ পরিশোধে কিছুটা ছাড় দিয়ে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপরও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
এদিকে ব্যাংকাররা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে করোনার ক্ষত ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, যা আগামী বছরে গিয়ে আরও প্রকট হয়ে উঠবে। পাশাপাশি প্রণোদনা ঋণ ব্যবহারের চিত্রও প্রতিফলিত হবে খেলাপি ঋণের সার্বিক তথ্যে। তারা বলেন, দেশে নথিপত্রে খেলাপি ঋণ যত দেখানো হয়, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে তিন গুণ বেশি। অনেক গ্রুপের ঋণ আদায় না হলেও বছরের পর বছর খেলাপি করা হয় না। আবার একই ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করে ঋণ নিয়মিত রাখা হয়। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখায়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০১৯ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে একটি রিপোর্টে বলেছিল, এ দেশে খেলাপি ঋণ আড়াল করে রাখা আছে। এখানে খেলাপি ঋণের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়, প্রকৃত খেলাপি ঋণ তার তুলনায় অনেক বেশি। আইএমএফের মতো, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।
এদিকে ব্যাংকের ইচ্ছাকৃত বা স্বভাবজাত ঋণখেলাপিদের নিয়ে আলোচনা বেশ পুরোনো। এসব ঋণখেলাপির মধ্যে কারা ব্যবসা করেও ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছে না, কারা সমস্যায় পড়ে তা পরিষ্কার নয়। এ রকম পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) এখন থেকে তিনবারের বেশি কোনো ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবে না। আর তৃতীয় দফা পুনঃ তফসিলের পরও যদি কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে স্বভাবজাত বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি প্রজ্ঞাপন জারি করে এমন নির্দেশনা দিয়েছে। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত শুরু হলো। এ ছাড়া ব্যাংক কোম্পানি আইনে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংজ্ঞা যুক্ত করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পুনঃ তফসিল করা ঋণের যে পরিমাণ অর্থ আদায় হবে, তার বিপরীতে যে সুদ মিলবে, সেটিই শুধু আয় খাতে নেয়া যাবে। এখন থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কেবল বিরূপ মানে শ্রেণিকৃত (নিম্নমান, সন্দেহজনক ও ক্ষতিজনক) ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবে। ঋণ নিয়মিত করার প্রতিটি পর্যায়ে গ্রাহক থেকে নির্ধারিত হারে এককালীন জমা নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের মান নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না। এতে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। এর মাধ্যমে কিছুদিন পর প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ