বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

পূজামন্ডপে হামলার ঘটনা সরকারেরই নীলনকশা

গতকাল সোমবার বিএনপির পল্টন কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টাার : কুমিল্লাসহ বিভিন্ন পূজামন্ডপে হামলার ঘটনা সরকারের নীলনকশা বলে অভিযোগ করেছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। পূজামন্ডপে হামলার ঘটনা সরেজমিন পরিদর্শনের পর গতকাল সোমবার সকালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের গঠিত কমিটির প্রধান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আমরা সরেজমিন মন্দিরে গিয়ে সকলের সাথে কথা বলেছি, প্রত্যক্ষদর্শীদের মতামত শুনেছি। সঠিকভাবে অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, এইসব হামলার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী যুব লীগ, ছাত্রলীগের ছেলে-পেলেরা। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশে কাছেও ধারণা আছে। কিন্তু তাদেরকে সামনে না নিয়ে যারা নিরীহ বা শান্তি প্রিয় তাদেরকে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লাসহ পূজামন্ডপে হামলার ঘটনার বিএনপি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে একটি কমিটি গঠন করে। গত ২৩ অক্টোবর গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল কুমিল্লার চাঁন্দমনি রক্ষা কালী মন্দির, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের রামকৃষ্ণ সেবা আশ্রম ও রাজা লক্ষী নারায়ন জিউ আখড়া এই তিনটি মন্দির পরিদর্শন করেন এবং মন্দিরের পুরোহিতসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলেন।
গয়েশ্বর বলেন, আজকে সরকার হামলাকারীদের মোকাবেলা করা বা আইনের আওতায় এনে তাদেরকে শাস্তি দেয়া বা বিচার করার উদ্যোগ নেয়নি। উদ্যোগটা হলো এই ইস্যুতে মিথ্যা মামলার মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদেরকে তুলে নেয়া বা গ্রেপ্তার-হয়রানি করার একটা নীলনকশা এবং হামলাকারীদের আড়াল কর। এটা নিসন্দেহে বলা যায়, সরকার সুপরিকল্পিতভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে হেনস্তা করার একটি ইস্যুগুলো তৈরি করেছে।
গণমাধ্যমেরে উদ্দেশ্যে গয়েশ্বর বলেন, আজকের যে ঘটনা(পূজামন্ডপে) এটা শুধু হিন্দু আক্রান্ত হয়েছে আমরা বলব না। গোটা জাতি আক্রান্ত হয়েছে। সেই আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করতে হলে অবশ্যই আমাদের একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। লেখনীর মাধ্যমে, প্রচারের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম সব সময় জনগণের পক্ষে কথা বলেছেন। আমি আশা করবো, মিডিয়া ও গণমাধ্যমের ভাইয়েরা এই অবস্থার বিরুদ্ধে, এই অপকর্মের বিরুদ্ধে আপনারা সোচ্চার হবেন আপনাদের পেশাগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
গয়েশ্বর বলেন, কুমিল্লার চাঁন্দমনি রক্ষা কালী মন্দিরে গত ১৩ অক্টোবর দুপুর আড়াইটায় একদিনে তিন দফা আক্রমণ করেছে। নানুয়াদিঘীর পাড়ের ঘটনা হলো সকালে। সেখানে(চাঁন্দমনি রক্ষা কালী মন্দির) আক্রমণ করার পরে স্থানীয় লোকজন তারা যেভাবে পারে আত্মরক্ষা করেছে। ঘটনার পরে পুলিশ আসছে, তারা বলেছে, আপনারা ভয় পাবেন না আমরা আছি। উনারা চলে যাওয়ার পরে আবার তিনটায় আক্রমন হয়েছে। ঠিক একইভাবে আক্রমণকারীরা চলে যাওয়ার পরে পুলিশ এসেছে। এসে বললো যে, আমরা আছি আপনারা ভয় পাইয়েন না। আবার বিকাল চারটায় আক্রমণ হয়েছে। অর্থাৎ একটা মন্দির তিনবার আক্রমণ হয়েছে এবং আগুন দেয়া হয়েছে। সেই মন্দিরে পুরোহিতের সাথে কথা বলছি। কারণ আমার ধারণা সরকার অথবা স্থানীয় প্রশাসন থেকে তাদেরকে নিশ্চয় কোনো হুমকি-ধমকি দেয়ার কারণে মন্দিরের কমিটির সাধারণ সম্পাদকসহ কেউ কেউ উপস্থিত হননি এটা স্বাভাবিকভাবে বুঝা যায়। আশপাশের দোকানদার আছে তাদেরকে আমরা ডেকে তাদের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শুনেছি। মন্দিরে আগুন দিয়েছে কোনো প্রাণহানি ঘটে নাই। তবে বির্জামান আতঙ্কটা এখনো তাদের মন থেকে মুছে যায়নি। একটা নীরব নিস্তব্ধ মানে দিনের বেলাও গা শির শির করে উঠে। চারিদিকে মানুষের চোখে মুখে একটা আতঙ্কে ছাপ দেখেছি। কোনো কথাই তারা বলতে চায় না। কারণ তাদেরও জীবন আছে ভয় থাকতেই পারে যদি কথাগুলো প্রকাশ করে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, গোপালগঞ্জ শেখ হাসিনার ভোট পয়েন্ট..। তার যে নির্বাচনী এলাকা টুঙ্গিপাড়া একটা গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা, সেই টুঙ্গিপাড়াতেও একটি মন্দির ভাংচুর করা হয়েছে। এখান থেকে অনুমান করা যায় যে, সরকার বড় স্পর্শকাতর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে জনদৃষ্টিকে অন্যদিকে সরানো এবং তার স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী মনোভাব দিয়ে তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার একটা হীন প্রচেষ্টায় লিপ্ত। আমি মনে করি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমাদেরকে এখানে মৌলবাদী বা জঙ্গিবাদী বা সাম্প্রদায়িকভাবে আখ্যায়িত করা হয় এটা ষড়যন্ত্রমূলক। যার কারণে আজকে আক্রমণের শিকার হয়েছেন তারা দুর্বল। আজকে সমাজের সকল নেতৃবৃন্দকে সামনে আসতে হবে। জাতির ধর্ম নির্বিশেষ বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক যে সংস্কৃতি সেটাকে লালন করতে হলে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে এই ধরনের স্পর্শকাতর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
গয়েশ্বর  বলেন, এটা যদি আমরা স্পষ্ট না করতে পারি, আমরা যদি প্রতিরোধ না করতে পারি। সেই কারণেই সরকারের উদ্যোগকে তোয়াক্কা না করে আমাদের জাতীয় জীবনে রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন শ্রেণী পেশা, বিশিষ্ট সচেতন নাগরিক গোষ্ঠী সবাই এবং কি আমাদের আলেম-উলামা গোষ্ঠি যারা ধর্ম নিয়ে চর্চা করেন সবাইকে একই সুরে এটাকে মোকাবিলা করতে হবে এবং বাংলাদেশের ঐহিত্য অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সেটা সমুন্নত রাখতে হবে। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি দলের প্রতিনিধি। আমি বিএনপি করি। যেই দলের দর্শন হচ্ছে- আলাদা কোনো বিভাজন নয় অর্থাৎ এই ভূখন্ডে জন্ম যারা নিয়েছেন সবাইকে নিয়ে আমরা সবাই বাংলাদেশী। আমরা জন্মে হিন্দু হতে পারি, মুসলিম হতে পারি, আমরা অনেক কিছু হতে পারি..। কিন্তু আমাদের পরিচয় বাংলাদেশী। সেই বাংলাদেশী পরিচয়ের ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের জাতি সত্ত্বার ওপর ভিত্তি করে আমরা এই চেতনায় ঐক্যবদ্ধভাবে বর্তমান এই ফ্যাসিবাদী সরকারের এই ধরনের হীন কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আমি আহ্বান করছি। আমরাও মাঠে নামবো। আজকে এটার প্রয়োজন আছে। প্রথমত এই জাতিকে টিকিয়ে রাখা, আমার রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে বা অব্যাহত থাকলে গণতন্ত্র তো নাই, রাষ্ট্র থাকবে কিনা সন্দেহ। আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখিন হবে।
তিনি বলেন, আমরা হিন্দু চেতনাবোধ থেকে মন্দিরে(হামলা হওয়া মন্দির) যাইনি। আমরা একটা ন্যাশনাল স্পিরিট অর্থাৎ আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, আমরা একটা রাজনৈতিক দল করি সেই দলের দায়িত্ববোধ থেকে আমরা বিএনপির প্রতিনিধি হিসেব গিয়েছি এবং যাবো। এটা ভাবার কারণ নেই যে, শুধু হিন্দুদের মন্দির বা বাড়ি হামলা হয়েছে বলে আমরা সেখানে গিয়েছি। যেকোনো হামলা, যেকোনো আক্রমণে আমরা ইতিপূর্বে সেখানে গেয়েছি এবং আমরা প্রতিবাদ করেছি, প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবো অব্যাহতভাবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, নিতাই রায় চৌধুরী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় নেতা গৌতম চক্রবর্তী. মীর সরফত আলী সপু, আবদুস সালাম আজাদ, অমলেন্দু দাস অপু, দেবাশীষ রায় মধু, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে উপজেলার সভাপতি প্রকৌশলী মমিনুল হক ও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার সভাপতি কামাক্ষা চন্দ্র দাস উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ