মঙ্গলবার ৩০ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

পুরোনো দিনের দূষিত বাতাসে ফিরছে রাজধানী ঢাকা

মুহাম্মদ নূরে আলম : রাজধানী ঢাকার বায়ু দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে অবস্থান করছে গত ক’বছর যাবৎ। বিশ্বে শীর্ষ দূষিত কয়েকটি শহরের অন্যতম ঢাকার মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সর্বাধিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মানুষের গড় আয়ু কমছে দীর্ঘমেয়াদি বায়ু দূষণের কারণে। করোনার প্রভাবে সারা দেশে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ থাকায় নির্মল বায়ু পাওয়া সম্ভব হয়েছিল সে সময়। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই আবার পুরোনো ধারায় ফিরতে শুরু করেছে ঢাকার বায়ুর মান। এগিয়ে যাচ্ছে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকার উপরের দিকে। গত কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণে এমনটাই দেখা গেছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ু দূষণের কারণে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। ঢাকায় কমেছে সাত বছর সাত মাস। আর সারা দেশের মানুষের কমেছে পাঁচ বছর চার মাস। গত কয়েক বছরে সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় প্রথম বা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা অনেকটা ঘুরে দাঁড়ায় চলতি বছরে। এ বছরের জুলাইয়ে নির্মল বায়ুর শহরে নাম লিখিয়েছিল রাজধানী শহর ঢাকা। ওই মাসে ঢাকায় বায়ুর মানের সূচক ৫০ এর নিচে নামে; বেশিরভাগ সময়ে যা ২০০ এর বেশি থাকে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে ঢাকা দূষিত নগরীর তালিকায় ২৩তম স্থানে ছিল, বর্তমানে উঠে এসেছে অষ্টম স্থানে। ১৪ অক্টোবর এই চিত্র দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুর মান যাচাই বিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার-এ। অর্থাৎ এ দিনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার চেয়ে বেশি দূষিত বাতাস রয়েছে বিশ্বের মাত্র সাতটি শহরে। আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসের ৫ তারিখ থেকে ১৪ তারিখ এই ১০ দিনে ঢাকা শহরে গড়ে বায়ুর মানমাত্রা ছিল ১৬২.৮ মাইক্রো গ্রাম; যা মানমাত্রার নির্দেশনা মতে অস্বাস্থ্যকর বলে গণ্য করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুর মান সূচকে শূন্য থেকে ৫০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত ভালো। ৫১ থেকে ১০০ হলো পরিমিত, ১০১ থেকে ১৫০ সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১ থেকে ২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০০ থেকে ৩০০ খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়ে গেলে সেটা বিপজ্জনক বলে গণ্য করা হয়। বায়ুদূষণের শিকার শহরগুলোর তালিকায় ঘুরেফিরে প্রথম স্থান দখল করছে রাজধানী ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত চার কারণে এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন রাজধানীবাসী। প্রথমত, পুরনো যানবাহনের আধিক্য। দ্বিতীয়ত, অপরিকল্পিতভাবে শহরের যেখানে সেখানে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও উন্নয়নকাজ। তৃতীয়ত, শহরের আশপাশের ইটভাটা ও শিল্প-কলকারখানার দূষণ। চতুর্থত, শহরের ভেতরে যে ময়লা আবর্জনা জমে সেগুলো পোড়ানোর ধোঁয়া। সরকার কঠোর না হওয়ায় এ পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটছে না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
গত বছর দেশীয় উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ঢাকার বাতাসে বায়ুদূষণ বেড়েছে ১০ শতাংশ। গবেষকরা ঢাকা শহরের ৭০টি স্থানের বায়ুদূষণের এ সমীক্ষা চালিয়েছেন। সমীক্ষায় দেখা যায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার আশপাশের এলাকায় দূষণ সবচেয়ে বেশি। আবাসিক এলাকার মধ্যে ধানমন্ডি, গুলশান, বাড্ডা ও বনানীতে দূষণের মাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ২০২০ সালে ঢাকা শহরের ৭০টি স্থানের গড় ‘বস্তুকণা ২.৫’ ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৩৩৫ দশমিক ৪ মাইক্রোগ্রাম। ভূমি ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ২০২০ সালে পাঁচটি এলাকার ‘বস্তুকণা ২.৫’-এর গড় মান ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৩৩৫ দশমিক ৪ মাইক্রোগ্রাম, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ১০ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ‘বস্তুকণা ২.৫’-এর গড় মান পাওয়া যায় প্রতি ঘনমিটারে ৩০৪ দশমিক ৩২ মাইক্রোগ্রাম।
বায়ুদূষণ বাড়ার জন্য যে কারণগুলোকে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করছেন তার মধ্যে রয়েছে, প্রাকৃতিক কিছু বিষয় (আবহাওয়া ও জলবায়ু), নগর পরিকল্পনার ঘাটতি, আইনের দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা, আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা, ভৌগোলিক কারণ এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব। আর বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে তারা চিহ্নিত করছেন, সমন্বয়হীন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তায় চলাচলরত গাড়ির কালো ধোঁয়া, ব্ল্যাক কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, ইটের ভাটা ও শিল্প কারখানা, উন্মুক্তভাবে আবর্জনা পোড়ানো, বস্তি এলাকায় বর্জ্য পোড়ানো এবং আন্তঃদেশীয় বায়ুদূষণ।
এ দফায় ঢাকার বায়ুর মান কমার বিষয়ে জানতে চাইলে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, সাধারণত কিছু ইভেন্টের আগে বায়ুদূষণ বেড়ে যায়। যেমন ঈদ-পূজা। এছাড়া অন্যান্য উৎসবের সময় মানুষের চলাচল বেড়ে যায়। আর বর্তমানে খুব গরম পড়েছে। প্রচণ্ড রোদের কারণে সবকিছু শুকিয়ে গেছে। যার ফলে বাতাসে ধুলোবালি বেশি উড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। যার ফলে মানুষের চলাচল বেড়েছে। অন্যদিকে ঢাকামুখী মানুষের যে চাপ আগে ছিল, সেটা আবারও ফিরে এসেছে। এজন্য বায়ুর মান খারাপ হতে পারে।  তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কনস্ট্রাকশনের কাজ পুরোদমে চলছে। বর্ষাকালে যে কাজগুলো মোটামুটি বন্ধ থাকে, তার সবই এখন শুরু হয়েছে। এখান থেকে ধূলো বাতাসে ওড়ে। এছাড়া অক্টোবর থেকে ইট উৎপাদন শুরু হয়। সেখানে প্রচুর ধোঁয়া তৈরি হয়। এটিও বায়ূদূষণের অন্যতম কারণ।
শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সর্বশেষ এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স এর গবেষণায় আরও দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় গত ১০ বছরে বায়ু দূষণ বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বায়ু দূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু দুই থেকে ৯ বছর পর্যন্ত কমছে। এছাড়াও এর ফলে নানা ধরনের কঠিন অসুখের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করাই বায়ু দূষণের সবচেয়ে বড় শিকার। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার ভারতের রাজধানী দিল্লীবাসী। প্রায় ৪০ শতাংশ ভারতীয়দের আয়ু ৯ বছর পর্যন্ত কমাচ্ছে সে দেশের বায়ু দূষণ। নির্মল বায়ুর জন্য স্থায়ী কোনো নীতি যেটি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারে, সেটা গড় আয়ু বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ুর ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করেন। তারা এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে চীনকে উল্লেখ করে বলেছে, ২০১১ সালের তারা যে নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে তাদের গড় আয়ু বেড়েছে ২.৬ বছর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর ছয় মাস। লাইফ ইনডেক্সের গবেষণা মতে, ১৯৯৮ সালে বায়ু দূষণের কারণে গড় আয়ু কমেছিল প্রায় দুই বছর আট মাস, ২০১৯ সালে সেটি পাঁচ বছর চার মাসে দাঁড়িয়েছে। গবেষণা বলছে, সারা দেশের ৬৪টি জেলার প্রত্যেকটিতেই বায়ু দূষণের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত তিন গুণ বেশি। দূষিত বাতাসে কঠিন ও তরল পদার্থ উড়ে বেড়ায়, যার মধ্যে রয়েছে কাঁচ, ধোঁয়া বা ধুলা, যেগুলোকে বস্তুকণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব বস্তুকণার মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতি বলা হয়, সূক্ষাতিসূক্ষ বস্তুকণা ২.৫। যেটি মানুষের চুলের ব্যাসের মাত্র তিন শতাংশ, যেটি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ঢুকে যায়। এই দূষণ সবচেয়ে বেশি হয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে যা মূলত গাড়ির ইঞ্জিন বা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন হয়।
গত মার্চে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাতাসে এই বস্তুকণা ২.৫ এর পরিমাণ ৭৭.১ মাইক্রাগ্রাম পার কিউবিক মিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়ে সাত গুণ বেশি। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ বায়ু দূষণে বিশ্বে শীর্ষস্থানে ছিল এবং রাজধানী হিসেবে ঢাকা ছিল দ্বিতীয় স্থানে।
সদ্য প্রকাশিত লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী, দেশের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে অবস্থিত। আর বাস্তুকণা ২.৫ বেশি রয়েছে যথাক্রমে নারায়ণগঞ্জ, যশোর, রাজশাহী, খুলনা, পাবনা, ঢাকা ও গাজীপুরে। লাইফ ইনডেক্সের তথ্য মতে, বায়ুদূষণের কারণে সারা বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু কমেছে ২.২ বছর। স্থায়ীভাবে দূষণ বন্ধ করা গেলে বিশ্বের মানুষের গড় আয়ু ৭২ থেকে ৭৪ বছর হতো, যা সার্বিক হিসাবে ১৭ বিলিয়ন জীবন-বর্ষ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, বায়ু দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি হয় শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এর মধ্যে হাঁপানি, ফুসফুসের কাশি ছাড়াও লাং ক্যানসার, স্ট্রোক ও কিডনির সমস্যা হয়। এ জন্য বায়ুদূষণের সঙ্গে মানুষের গড় আয়ুর বিষয়টি জড়িত। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে কিন্তু সেটা কতটা মানসম্মত সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত। আমাদের জীবদ্দশায় কতটা সময় হাসপাতালে কাটাতে হয়, সেটাও হিসাব করা উচিত, বলেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ু দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি হয় শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এর মধ্যে হাঁপানি, ফুসফুসের কাশি ছাড়াও লাং ক্যান্সার, স্ট্রোক ও কিডনির সমস্যা হয়। তারা বলেন, এসব কারণে বায়ুদূষণের সঙ্গে মানুষের গড় আয়ুর বিষয়টি জড়িত।
এ ব্যাপারে বায়ুদূষণ গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুস সালাম গণমাধ্যমকে জানান, সাধারণ ধুলোবালুর সাথে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কথা নয়। তবে করোনায় আক্রান্ত রোগী যদি বাইরে এসে থুথুু বা কফ কোনো ধুলার মধ্যে ফেলে, আর ওই ধুলা কারো হাত লাগে এবং ওই হাত সে যদি মুখে দেয়, এভাবে ধুলার মাধ্যমে জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে সরকারের উচিত হলে দ্রুত রাজধানীর ধুলাদূষণ রোধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া। ড. আবদুস সালাম আরও বলেন, অন্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে দূষণ বেশি। কারণ আমাদের অ্যাক্টিভিটি বেশি। কনস্ট্রাকশন বেশি, আর নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থাও নেই। দিল্লি বা কাঠমান্ডুতেও দূষণ হচ্ছে। তারাও মাঝে মধ্যে দূষণের শীর্ষে চলে আসে। কিন্তু ঢাকার মতো ধারাবাহিকভাবে প্রথম হয়নি। এ ছাড়া এসব দেশ বায়ুদূষণ রোধে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমরা সে তুলনায় কিছুই করছি না।
যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ারের গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুদূষণের দিক থেকে গত বছরের মতো এবারো বিশ্বের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকাও বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে গতবারের মতোই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, ঢাকার বায়ুদূষণের বড় কারণ, পুরোনো গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি বৃদ্ধি, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার ভাগাড়, রাস্তার ধুলা, খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণকাজ, কালো ধোঁয়া এবং নির্মাণসামগ্রী রাস্তায় ফেলে রাখা ও খোলা অবস্থায় পরিবহন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ময়লা পোড়ানো। ঢাকা জেলাসহ সারা দেশে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ইটভাটা। ছাড়পত্রহীন এসব ইটভাটা মানছে না আবাসিক এলাকা, মানছে না কৃষি জমি। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ইটভাটাগুলোতে বে আইনিভাবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, দূষিত হচ্ছে বায়ু। একটি গবেষণা বলছে, ঢাকা শহরে বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা দায়ী ৫৮ শতাংশ, রোড ডাস্ট ও সয়েল ডাস্ট ১৮ শতাংশ, যানবাহন ১০ শতাংশ, বায়োমাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস ৬ শতাংশ দায়ী।
পরিবেশ অধিদফতর সূত্র বলছে, বায়ুদূষণ রোধে ২০১৫-২০১৯ পর্যন্ত ৬৬৩টি মোবাইল কোর্ট এবং ১২৬১টি মামলা দায়ের করে ১২,৮৯,৬২,৯০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে সারা দেশে ৩৪৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৯,৯৫,৬৭,৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং ১৬৩টি ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ১২০টি ইটভাটা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সনাতন প্রযুক্তির বায়ুদূষণকারী ইটভাটার কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে বন্ধ করে মাটির বিকল্প উপাদানে তৈরি বিভিন্ন উৎপাদন ও ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে সরকার উচ্চ পর্যায়ে নীতিগত অনুমোদন প্রাপ্তির লক্ষ্যে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। সার্বিক বায়ুদূষণকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাসের লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন নির্মল বায়ু আইন, ২০১৯ খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। খসড়া আইনের ওপর ইতিমধ্যে সবার মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ওপর আগামী ১৮ই ডিসেম্বর তারিখে অন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করা হয়েছে। এছাড়াও খসড়া ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১৯’ অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বায়ুদূষণের কারণে ঢাকা শহরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, বাতাসে ভারী ধাতু ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা বেড়ে গেলে ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, স্নায়ুজনিত সমস্যা বেড়ে যায়, বুদ্ধিমত্তা কমে যায়। দেশের বায়ুদূষণের অবস্থা একদিকে দিন দিন খারাপ হচ্ছে, অন্যদিকে বায়ুদূষণের উৎস দিন দিন বাড়ছে। বায়ুদূষণ রোধের মূল দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। দূষণ ঠেকাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে অধিদপ্তর; কিন্তু তা দূষণ কমাতে খুব বেশি কার্যকর হচ্ছে না। যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে জানান পরিবেশকর্মীরা। আর দূষণের অন্যতম উৎস নির্মাণকাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগও তেমন নেই।
স্ট্যামফোর্ডের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণের বড় কারণ রাস্তার ধুলা, খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণকাজ, কালো ধোঁয়া এবং নির্মাণসামগ্রী রাস্তায় ফেলে রাখা ও খোলা অবস্থায় পরিবহন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ময়লা পোড়ানো। পাড়া-মহল্লায় বায়ুদূষণের এটি অন্যতম কারণ। দুই সিটি করপোরেশনের হিসাবে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর একটি অংশ সড়কে জমা হওয়া। বড় সড়কগুলোতে ঝাড়ু দিয়ে ময়লা বিভিন্ন জায়গায় জমা করে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। কাজটি চলে রাত ৯টা থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত। অভিযোগ, সড়কে ঝাড়ু দিয়ে জমা করা ময়লার একটা অংশ গভীর রাতে ফুটপাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ডা. আসিফ মুজতবা মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ময়লা পোড়ানোর ধোঁয়ায় শরীরের তেজস্ক্রিয়া বেড়ে হৃৎপিণ্ড ও স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে ধোঁয়ার ক্ষতিকর উপাদান। দীর্ঘ মেয়াদে এই ধোঁয়া ফুসফুসে ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ